১১:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশে ক্রমেই বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন

প্রতীকি ছবি

  • চলতি বছরে নারী-কন্যা শিশুসহ নির্যাতনের শিকার ১৫৫৫ জন
  • চলতি বছরের ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ৪৮১ নারী
  • হত্যাকাণ্ডের শিকার ৩২০ জন

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ক্রমেই বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। নানা ইস্যুতে নারীর প্রতি সংহিংসতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। নির্যাতিত অনেকেই মান লজ্জা আর অব্যাহত হুমকি-ধামকিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আবার অনেকে মামলা করলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা আসামিদের চাপে মামলা পরিচালনা থেকেও সরে আসছেন। নারী বিষয়ক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ৭৩৬ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১৫৫৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪৫ জন শিশুসহ ৪৮১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৬২ জন শিশুসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০৬ জন নারী এবং ১০ জন শিশুসহ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জন নারীকে। এছাড়া গত ৬ মাসে ৩৫ জন শিশুসহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫১ জন নারী। ২৫ জন শিশুসহ উত্ত্যক্ত করণের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন নারী। ৬১ জন শিশুসহ হত্যার শিকার হয়েছে ৩২০ জন নারী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর মতে, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনার রাজনীতিকরণ বন্ধ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি প্রয়োজন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলছেন, চলমান এ সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর, কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি মহামারির মতো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটা চলছে। এর কারণ রাজনীতি, মাদক, মোবাইল ও পর্ণগ্রাফি। এগুলো বন্ধে নতুন আইন করার চিন্তা আছে সরকারের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৬ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের বাহেরচর পাঁচকিত্তা গ্রামে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সংখ্যালঘু এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। পরে তাকে নির্যাতন করা হয়। ঘটনার পরদিন গত ২৯ জুন প্রতিবেশী ফজর আলীকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মুরাদনগর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ওই নারী। এই ঘটনার ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও গত ২৮ জুন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ভিডিওতে দেখা যায়, ১০-১২ জন যুবক ওই নারীকে মারধর করছে। এ সময় ওই নারী বাঁচার আর্তনাদে চিৎকার করছেন। এ ঘটনার পর সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনা তদন্তে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা।
পুলিশ বলছে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগে ওই নারীকে নির্যাতনের বিষয়টি ভুক্তভোগী ওই নারীসহ অন্য কেউ পুলিশকে জানায়নি।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ঘটনার রাতে তার বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। ওই সময় প্রতিবেশী ফজর আলী বাড়িতে এসে ঘরের দরজা খুলতে বলেন। রাজী না হলে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে ফজর আলীকে আটক করে মারধর এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। পরে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয়। ভুক্তভোগী ওই নারী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত ফজর আলী বাহেরচর পাঁচকিত্তা গ্রামের শহীদ মিয়ার ছেলে।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অভিযুক্তদেরকে পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান জানিয়েছেন, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মূলহোতা শাহ পরানকে গতকাল ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এছাড়া মুরাদনগরে মা ও ছেলে-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮ জনকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তদন্তে প্রমাণ পেলে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন জেলা পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা।
এদিকে ভুক্তভোগী ওই নারী ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আসামিদের চাপের মুখে তিনি মামলা তুলে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুধু ওই সংখ্যালঘু নারীই নয়, কন্যাশিশুসহ অনেকেই দেশের কোথাও না কোথাও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অনেকেই মানলজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে নারীর প্রতি সংহিসংতার ঘটনা বেড়েই চলছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টরা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নির্যাতন বিষয়ক এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ৭৩৬ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১৫৫৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪৫ জন শিশুসহ ৪৮১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৬২ জন শিশুসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০৬ জন নারী এবং ১০ জন শিশুসহ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জন নারীকে। এছাড়া গত ৬ মাসে ৩৫ জন শিশুসহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫১ জন নারী। ২৫ জন শিশুসহ উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন নারী। ৬১ জন শিশুসহ হত্যার শিকার হয়েছে ৩২০ জন নারী।
ওই প্রতিবেদনে জুন মাসের নারী ও কন্যা নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরা হয়। মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিমাসে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে ৮৭ জন কন্যাশিশু এবং ১১৬ জন নারী (মোট- ২০৩ জন) নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৩ জন শিশুসহ ৬৫ জন নারী। তার মধ্যে ৫ জন শিশুসহ ৮ জন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২ জন শিশুসহ ৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ৭ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুন মাসে উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ৫ জন নারী। তার মধ্যে ২ জন উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। বিভিন্ন কারণে ১৩ জন শিশুসহ ৬৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ২ জন শিশুসহ ১১ জন নারীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ১ জন নারী। ৩ জন নারী অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছেন, তারমধ্যে ২ জনের অগ্নিদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া গত মাসে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতায় ৬ জন নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬ জন শিশুসহ ২২ জন নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২ জন শিশু অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। ১ জন সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছে। বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে ২টি। এছাড়া ৭ জন শিশুসহ ৯ জন নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, মুরাদনগরে নারী ধর্ষণের ঘটনার পরবর্তীতে অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও নির্যাতনের শিকার নারী মামলা তুলে নিতে চচ্ছেন- যা সহিংসতার শিকার নারীকে চাপের মুখে, ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনার রাজনীতিকরণ বন্ধ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে নারী ও কন্যার প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ক্ষেত্র বিশেষে সহিংসতার চিত্রও বদলেছে। নারীর প্রতি সমাজের বিদ্বেষকে বর্তমানে নানাভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে। নারীর মানবাধিকার রক্ষায় আইন থাকলেও আমরা জানি বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটুকু। এই পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে নারী আন্দোলন আরও বেশি সংগঠিত করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামে প্রকাশ্যে মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনির সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড শুধু আইনের শাসনের পরিপন্থি নয়, এটি নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, চলমান এ সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর, কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে গত ৩ জুলাই সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ জানিয়েছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি মহামারির মতো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটা চলছে। এর কারণ রাজনীতি, মাদক, মোবাইল ও পর্ণগ্রাফি। এগুলো বন্ধে নতুন আইন করার চিন্তা আছে সরকারের। গত ২০ থেকে ২৯ জুনের তথ্য অনুযায়ী গত ৯ দিনে সারা দেশে ২৪ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একজন ষাট বছরের বৃদ্ধ একজন শিশুকে ধর্ষণ করেছে। আমরা তো ধর্মভীরু, ধর্মবিরোধী না, এটা কীভাবে সম্ভব?
তিনি বলেন, দেশের মাদ্রাসাগুলোতেও শিশুদের যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মাদ্রাসাগুলো চোখের আড়ালে থাকে। তাই যথাসময়ে তথ্য পাই না। সেখানে অনেক শিশুরা নানা ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এর ফলে তাদের বিকাশ হচ্ছে না। এ খবর অভিভাবক ও বড়রা রাখে না। তারা (মাদ্রাসা) স্বীকার করলো কিনা জানি না, ঘটনা তো সামনে আসছে। এসব বন্ধে স্কুল-মাদ্রাসায় মন্ত্রণালয়ের লোকজন সরাসরি যাবে। তাদের জবাবদিহি করতে হবে, এটা আমার দাবি।
নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ে ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৫টি নির্যাতনের অভিযোগ জমা হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নেই যে, সব অভিযোগের সমাধান করা সম্ভব। তবে যেগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক সেগুলোর সমাধান করা হয়। শতাধিক নারীকে কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিওতে রংপুরের দারুণ জয়

দেশে ক্রমেই বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন

আপডেট সময় : ০৭:৫০:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
  • চলতি বছরে নারী-কন্যা শিশুসহ নির্যাতনের শিকার ১৫৫৫ জন
  • চলতি বছরের ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ৪৮১ নারী
  • হত্যাকাণ্ডের শিকার ৩২০ জন

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ক্রমেই বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। নানা ইস্যুতে নারীর প্রতি সংহিংসতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। নির্যাতিত অনেকেই মান লজ্জা আর অব্যাহত হুমকি-ধামকিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আবার অনেকে মামলা করলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা আসামিদের চাপে মামলা পরিচালনা থেকেও সরে আসছেন। নারী বিষয়ক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ৭৩৬ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১৫৫৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪৫ জন শিশুসহ ৪৮১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৬২ জন শিশুসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০৬ জন নারী এবং ১০ জন শিশুসহ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জন নারীকে। এছাড়া গত ৬ মাসে ৩৫ জন শিশুসহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫১ জন নারী। ২৫ জন শিশুসহ উত্ত্যক্ত করণের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন নারী। ৬১ জন শিশুসহ হত্যার শিকার হয়েছে ৩২০ জন নারী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর মতে, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনার রাজনীতিকরণ বন্ধ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি প্রয়োজন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলছেন, চলমান এ সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর, কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি মহামারির মতো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটা চলছে। এর কারণ রাজনীতি, মাদক, মোবাইল ও পর্ণগ্রাফি। এগুলো বন্ধে নতুন আইন করার চিন্তা আছে সরকারের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৬ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের বাহেরচর পাঁচকিত্তা গ্রামে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সংখ্যালঘু এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। পরে তাকে নির্যাতন করা হয়। ঘটনার পরদিন গত ২৯ জুন প্রতিবেশী ফজর আলীকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মুরাদনগর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ওই নারী। এই ঘটনার ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও গত ২৮ জুন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ভিডিওতে দেখা যায়, ১০-১২ জন যুবক ওই নারীকে মারধর করছে। এ সময় ওই নারী বাঁচার আর্তনাদে চিৎকার করছেন। এ ঘটনার পর সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনা তদন্তে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা।
পুলিশ বলছে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগে ওই নারীকে নির্যাতনের বিষয়টি ভুক্তভোগী ওই নারীসহ অন্য কেউ পুলিশকে জানায়নি।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ঘটনার রাতে তার বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। ওই সময় প্রতিবেশী ফজর আলী বাড়িতে এসে ঘরের দরজা খুলতে বলেন। রাজী না হলে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে ফজর আলীকে আটক করে মারধর এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। পরে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয়। ভুক্তভোগী ওই নারী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত ফজর আলী বাহেরচর পাঁচকিত্তা গ্রামের শহীদ মিয়ার ছেলে।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অভিযুক্তদেরকে পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান জানিয়েছেন, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মূলহোতা শাহ পরানকে গতকাল ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এছাড়া মুরাদনগরে মা ও ছেলে-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮ জনকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তদন্তে প্রমাণ পেলে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন জেলা পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা।
এদিকে ভুক্তভোগী ওই নারী ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আসামিদের চাপের মুখে তিনি মামলা তুলে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুধু ওই সংখ্যালঘু নারীই নয়, কন্যাশিশুসহ অনেকেই দেশের কোথাও না কোথাও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অনেকেই মানলজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে নারীর প্রতি সংহিসংতার ঘটনা বেড়েই চলছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টরা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নির্যাতন বিষয়ক এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ৭৩৬ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১৫৫৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারমধ্যে ৩৪৫ জন শিশুসহ ৪৮১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ৬২ জন শিশুসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০৬ জন নারী এবং ১০ জন শিশুসহ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জন নারীকে। এছাড়া গত ৬ মাসে ৩৫ জন শিশুসহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫১ জন নারী। ২৫ জন শিশুসহ উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন নারী। ৬১ জন শিশুসহ হত্যার শিকার হয়েছে ৩২০ জন নারী।
ওই প্রতিবেদনে জুন মাসের নারী ও কন্যা নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরা হয়। মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিমাসে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে ৮৭ জন কন্যাশিশু এবং ১১৬ জন নারী (মোট- ২০৩ জন) নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৩ জন শিশুসহ ৬৫ জন নারী। তার মধ্যে ৫ জন শিশুসহ ৮ জন নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২ জন শিশুসহ ৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ৭ জন শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুন মাসে উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ৫ জন নারী। তার মধ্যে ২ জন উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। বিভিন্ন কারণে ১৩ জন শিশুসহ ৬৮ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ২ জন শিশুসহ ১১ জন নারীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ১ জন নারী। ৩ জন নারী অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছেন, তারমধ্যে ২ জনের অগ্নিদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া গত মাসে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতায় ৬ জন নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬ জন শিশুসহ ২২ জন নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২ জন শিশু অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। ১ জন সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছে। বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে ২টি। এছাড়া ৭ জন শিশুসহ ৯ জন নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, মুরাদনগরে নারী ধর্ষণের ঘটনার পরবর্তীতে অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও নির্যাতনের শিকার নারী মামলা তুলে নিতে চচ্ছেন- যা সহিংসতার শিকার নারীকে চাপের মুখে, ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনার রাজনীতিকরণ বন্ধ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে নারী ও কন্যার প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ক্ষেত্র বিশেষে সহিংসতার চিত্রও বদলেছে। নারীর প্রতি সমাজের বিদ্বেষকে বর্তমানে নানাভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে। নারীর মানবাধিকার রক্ষায় আইন থাকলেও আমরা জানি বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটুকু। এই পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে নারী আন্দোলন আরও বেশি সংগঠিত করতে হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামে প্রকাশ্যে মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনির সহিংসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড শুধু আইনের শাসনের পরিপন্থি নয়, এটি নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, চলমান এ সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে এখনই কার্যকর, কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে গত ৩ জুলাই সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ জানিয়েছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি মহামারির মতো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটা চলছে। এর কারণ রাজনীতি, মাদক, মোবাইল ও পর্ণগ্রাফি। এগুলো বন্ধে নতুন আইন করার চিন্তা আছে সরকারের। গত ২০ থেকে ২৯ জুনের তথ্য অনুযায়ী গত ৯ দিনে সারা দেশে ২৪ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একজন ষাট বছরের বৃদ্ধ একজন শিশুকে ধর্ষণ করেছে। আমরা তো ধর্মভীরু, ধর্মবিরোধী না, এটা কীভাবে সম্ভব?
তিনি বলেন, দেশের মাদ্রাসাগুলোতেও শিশুদের যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মাদ্রাসাগুলো চোখের আড়ালে থাকে। তাই যথাসময়ে তথ্য পাই না। সেখানে অনেক শিশুরা নানা ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এর ফলে তাদের বিকাশ হচ্ছে না। এ খবর অভিভাবক ও বড়রা রাখে না। তারা (মাদ্রাসা) স্বীকার করলো কিনা জানি না, ঘটনা তো সামনে আসছে। এসব বন্ধে স্কুল-মাদ্রাসায় মন্ত্রণালয়ের লোকজন সরাসরি যাবে। তাদের জবাবদিহি করতে হবে, এটা আমার দাবি।
নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ে ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৫টি নির্যাতনের অভিযোগ জমা হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নেই যে, সব অভিযোগের সমাধান করা সম্ভব। তবে যেগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক সেগুলোর সমাধান করা হয়। শতাধিক নারীকে কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।