কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভসহ আশপাশের দুর্গম পাহাড় ও গভীর সাগরপথে মানবপাচার অব্যাহত রয়েছে। মিথ্যা আশ্বাস ও নানা প্রলোভন দিয়ে সংঘবদ্ধ পাচারচক্র দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষদের হাত থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদের গহীন পাহাড়ি অরণ্য ও সাগরপথে নিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে নারী-পুরুষসহ ২৯ জনকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। এ সময় পাচারকারী তিন সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই মাসে ২৩৬ জনকে উদ্ধার ও ৩৭ পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসএম দেলোয়ার হোসেনের প্রতিবেদনে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলার সীমান্তবর্তী রাজারছড়া, কচ্ছপিয়া ও বড়ইতলী এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অরণ্যে মানবপাচার ও ডাকাত চক্রের গোপন আস্তানা রয়েছে। এসব চক্র দীর্ঘদিন ধরে দালাল ও মানবপাচার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গিয়ে আটক রেখে মুক্তিপণ আদায় করছে। মুক্তিপণ না দিলে জোরপূর্বক নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং সাগরপথে পাচারের হুমকি দেয়া হয়।

পাচার চক্রগুলো ৪টি প্রধান সিন্ডিকেটে বিভক্ত – কচ্ছপিয়া সিন্ডিকেট (মালয়েশিয়া সংযোগ), কচ্ছপিয়া স্থানীয় সহযোগী, বড়ইতলী সিন্ডিকেট (রোহিঙ্গা ও বহিরাগত সংযোগ) ও রাজারছড়া পাহাড় গ্রুপ (সশস্ত্র রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট)। এদের হাতে রয়েছে একে-৪৭সহ ভারী অস্ত্র।
বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আশিকুর রহমান জানান, “অপরাধ চক্রগুলো পাহাড় এবং সমুদ্র সৈকত ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিম্মি করে সাগরপথে মানবপাচার করছে। সীমান্তের অপরাধ দমনসহ এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে পাহাড় ও সাগরে বিজিবির অভিযান জোরদার করা হয়েছে।”
গত ১৯ অক্টোবর টেকনাফের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ের গহীন অরণ্যে অভিযান চালিয়ে বিজিবি এক সদস্যকে আটক করে। এছাড়া কক্সবাজার টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়া পাচারকালে নারী-পুরুষসহ ২৯ জনকে উদ্ধার করে তিন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তাররা হলেন—মো. সেলিম (৩৫), মো. নুরুল আবছার (১৯) ও মনসুর আলম (২২)। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে অধিকাংশই রোহিঙ্গা ও স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ।
মানবপাচার ও অপহরণকারী চক্রগুলো দালালদের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হতদরিদ্র কৃষক, দিনমজুরসহ নানা পেশার মানুষকে টার্গেট করছে। দালালদের হাতে পড়া মানুষগুলোকে গহীন পাহাড়ের গোপন আস্তানায় আটকে রেখে তাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক সাগরপথে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়াসহ বিদেশে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা জানান, পাচারকারীদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মুক্তিপণ পরিশোধ করেছে, কেউ কেউ নির্যাতন সহ্য করে সাগরপথে পাচার হয়েছে। বিজিবির তৎপরতায় গত দুই মাসে ২৩৬ জন উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৯৬ জন রোহিঙ্গা এবং ৪০ জন স্থানীয় বাসিন্দা। এছাড়া ৩৭ পাচারকারী গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ১৫ জন রোহিঙ্গা।
বিজিবি’র ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, “আমরা দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। মানবপাচার চক্রগুলো পাহাড় ও সমুদ্র সৈকত ব্যবহার করে জিম্মি করে পাচার করছে। এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই অনেককে উদ্ধার করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মানবপাচার ও অপরাধ দমন কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা সীমান্তের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কাজ করছি। এই ধরনের অপরাধ রোধে জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখতে পেলে দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।”
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, পাচারকারীরা বেশির ভাগ সময় পাহাড়ি এলাকায় গোপন আস্তানায় সক্রিয় থাকে এবং মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের জন্য ট্রলারযোগে সাগরপথে লোকজন পাচার করে। পাচারকারীরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে নানা ধরনের ভুয়া পরিচয়পত্র ও সিম কার্ড ব্যবহার করে।
এদিকে, গত মঙ্গলবার রাতে মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে পাচারকালে উদ্ধার ২৯ জনের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে। উদ্ধার অভিযান চালিয়ে পাচারকারীদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, একটি চাকু ও একটি ইঞ্জিনচালিত সাম্পান জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবি সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরদার অভিযান ও যৌথ উদ্যোগে মানবপাচার চক্রকে দমন করে এই ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। তবে পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য কমেনি বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এবং আরও কঠোরভাবে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন।
সাগরপথে মানবপাচার রোধে প্রশাসন ও সমাজের প্রতি সচেতনতা ও সহযোগিতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মানবাধিকার রক্ষায় এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কাজ করে যেতে হবে সকলের।
এমআর/সবা

























