চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) সংসদীয় আসন দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের মধ্যে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই আসনে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এবং ভোটব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা আগের নির্বাচনের চিত্র থেকে ভিন্ন।
বিএনপির পাশাপাশি এবার মাঠে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর সুন্নি জোট। ফলে ঐতিহাসিক এই আসনে ভোটের লড়াই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাস্তবে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর সুন্নি জোটের মধ্যেই। অন্যান্য দলের প্রার্থীদের প্রচারণা ও সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি তাদের ঐতিহাসিক ভোটব্যাংক অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে, নাকি ইসলামী দলগুলোর উত্থানে সেই ভোটব্যাংকে ভাগ বসবে। অন্যদিকে জামায়াত ও সুন্নি জোটের লক্ষ্য হলো বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।
প্রার্থীরা
এবার এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন— বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান চৌধুরী (দাঁড়িপাল্লা), বৃহত্তর সুন্নি জোটভুক্ত ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান (মোমবাতি), এনডিএমের মোহাম্মদ ইমরান (সিংহ), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মো. রেজাউল মোস্তফা (আপেল), জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী (লাঙ্গল) এবং গণঅধিকার পরিষদের মো. মুজিবুর রহমান (ট্রাক)।
উন্নয়ন ও রাজনীতি
স্থানীয় রাজনীতিতে আনোয়ারা–কর্ণফুলীর উন্নয়নের সূচনাবিন্দু হিসেবে এখনো আলোচিত হয় বিএনপি সরকারের সময় নির্মিত কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু। এই সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে দেয়। শিল্পকারখানা, বন্দরনির্ভর অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি এই আসনে শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির সংগঠনের ভেতরে একধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বিএনপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ইসলামী দলগুলোর তৎপরতা
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো ইসলামী দলগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা। জামায়াতে ইসলামী নিয়মিত গণসংযোগ, সভা ও তরুণকেন্দ্রিক প্রচারণার মাধ্যমে মাঠে নিজেদের অবস্থান জোরালো করছে। পাশাপাশি বৃহত্তর সুন্নি জোটও ধর্মভিত্তিক ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই শক্তির সক্রিয়তা বিএনপির ঐতিহাসিক ভোটব্যাংকে আংশিক হলেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মীয়ভাবে সচেতন ভোটারদের একটি অংশ ইসলামী দলগুলোর দিকে ঝুঁকলে ভোটের ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
ভোটারদের প্রত্যাশা
বর্তমানে আনোয়ারা–কর্ণফুলী দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর ভাঙন, পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার অভাব এবং উচ্চশিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকা ভোটারদের বড় উদ্বেগ।
যে প্রার্থী এসব মৌলিক সমস্যাকে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারবেন, তিনি বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। কেবল অতীত উন্নয়নের কথা নয়, ভবিষ্যৎ রূপরেখাই ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিএনপির প্রার্থীর বক্তব্য
বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “আমি তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য। আনোয়ারা–কর্ণফুলীর জনগণ বারবার আমার ওপর আস্থা রেখেছে। অতীতের মতো এবারও জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস করি। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সারা দেশে বিএনপির পক্ষে শক্তিশালী গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই গণজোয়ারেই বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হবে। আমরা আনোয়ারা–কর্ণফুলীকে শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছি। আবার ক্ষমতায় এলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এটিকে চট্টগ্রামের শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করব।”
জামায়াত প্রার্থীর বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী বলেন, “চারদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতীতে আনোয়ারা–কর্ণফুলীতে জোটগত নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে সারা দেশের মতো আনোয়ারা–কর্ণফুলীতেও বিএনপির ওপর জনগণ অসন্তুষ্ট। এ কারণে জনগণ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আমাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে—ইনশাআল্লাহ। জুলাই আন্দোলনে তরুণ-যুবকদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়েছি। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সেই জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে তরুণদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের অধিকার ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা হবে।”
ভোটার ও নির্বাচন তথ্য
চট্টগ্রাম–১৩ আসনে মোট ১৬টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারায় ১১টি এবং কর্ণফুলীতে ৫টি ইউনিয়ন। মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৭১৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৩২ জন। এ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১১৮টি এবং ভোটকক্ষ ৭৯০টি।
নির্বাচনী ইতিহাস
১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ ইদ্রিস বিকম। ১৯৭৯ সালে বিএনপির শাহাদাত হোসেন চৌধুরী নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু জয়ী হন। ১৯৮৮ সালে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী মোখতার আহমেদ জয় পান। ১৯৯১ সালে আবারও নির্বাচিত হন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম জয়ী হন এবং একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০০১ সালেও তিনি জয়ী হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বিজয়ী হন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ নির্বাচিত হন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী হন। তবে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি।
শু/সবা























