দূর থেকে দেখলে মনে হয়, একদল নারী ড্রেনের কালো ময়লা পানির ভেতরে কিছু খুঁজছেন কিংবা মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। কারও হাতে লম্বা লাঠি, কেউ আবার বুকসম পানিতে ডুবে আছেন। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, তারা আসলে খুঁজছেন নিজেদের জীবন ও জীবিকা।
এই দৃশ্য দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পাশের একটি ড্রেনের, যেখানে খনির বর্জ্য পানির সঙ্গে ভেসে আসা কয়লার ডাস্ট সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন অন্তত ১২০ জন অতিদরিদ্র নারী।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত একটি ড্রেন দিয়ে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত কয়লা শোধনের পর ময়লা পানি নিষ্কাশন করা হয়। সেই পানির সঙ্গে ভেসে আসে কয়লার গুঁড়া (ডাস্ট), যা সংগ্রহ করেই সংসার চালান এসব নারী।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের নারীরা সমবায়ভিত্তিকভাবে এই কাজ করছেন। তারা ৮টি দলে বিভক্ত হয়ে পালাক্রমে ড্রেনে নেমে কয়লা সংগ্রহ করেন।
চৌহাটি গ্রামের কুলসুম বেগম বলেন, “নেট পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখি। পানির সঙ্গে কয়লার ডাস্ট ভেসে এলে নেটে আটকে যায়। আবার বাঁশের মাথায় লোহার যন্ত্র দিয়েও ময়লা কাটি।”
একই গ্রামের রাজিয়া খাতুন জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে এই কাজই বেছে নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “মানুষের বাড়িতে কাজ করেছি, এখন কয়লা তুলেই সংসার চালাই।”
আরেক নারী কায়ফা বানু বলেন, “কষ্ট আছে, কিন্তু জীবন আরও বড় কষ্টের। তাই এই কাজেই জীবিকা খুঁজে পেয়েছি।”
রিনা রানী রায় জানান, মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়ে দিতে পারলেই তিনি এই কাজ ছেড়ে দেবেন। তার মতো অনেক নারীই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এই কষ্ট সহ্য করছেন।
দীর্ঘ সময় দূষিত ও উষ্ণ পানিতে কাজ করার কারণে নারীরা চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। কিন্তু নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা বা শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
গীতা রানী রবিদাশ বলেন, “পায়ে ক্ষত হয়েছে, তবুও কাজ ছাড়তে পারি না।”
সংগৃহীত কয়লা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কিনে শুকিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করেন। ব্যবসায়ী ইমরান আলী জানান, নারীদের কাছ থেকে নেওয়া কয়লা শুকানোর পর পরিমাণ কমে যায়, তবে ইটভাটায় চাহিদা থাকায় তা বিক্রি করা হয়।
প্রতিদিন একজন নারী গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন বলে জানা গেছে।
বড়পুকুরিয়ার এই ড্রেন এখন শুধু পানি নিষ্কাশনের জায়গা নয়, বরং শতাধিক নারীর জীবনযুদ্ধের প্রতীক। কালো পানির ভেতর দাঁড়িয়ে তারা প্রতিদিন যে লড়াই করছেন, তা দারিদ্র্য ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের নির্মম বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
শু/সবা
রংপুর ব্যুরো: 


















