9:33 pm, Sunday, 21 June 2026

তিস্তায় পানির সঙ্গে বাড়ছে বিপদ, রংপুর অঞ্চলে বন্যার আভাস

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩২:০১ pm, Sunday, ২১ জুন ২০২৬
  • 1 Time View

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণের কারণে রংপুর অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে, যা রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রংপুরে ১৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে নির্মিত ৯০০ মিটার দীর্ঘ রক্ষা বাঁধের ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ভেঙে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর ভাঙন ঠেকাতে এলজিইডি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং স্থাপন করলেও সেটিও এবার ভেঙে গেছে। এতে সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন।

ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রোববার সকাল ৯টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। দুপুরে পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে রাখা হয়েছে।

তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ফসলি জমি ও বীজতলা ডুবে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, উজানের পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। অন্যদিকে চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা বাদামের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী অভিযোগ করে বলেন, গত বছর ব্লক দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের পরামর্শ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে বাঁশের পাইলিং স্থাপন করা হয়েছিল। এবার সেটিও ভেঙে গেছে। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর বিভিন্ন চরাঞ্চলেও পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। হাতীবান্ধার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, শনিবার ভোর থেকেই তিস্তার পানি তাদের এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারীর কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের অনেক এলাকা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হতে পারে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারাজের সবগুলো জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, তিস্তার পাশাপাশি ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর, জিঞ্জিরাম ও ঘাঘট নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

শু/সবা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

15 + six =

About Author Information

তিস্তায় পানির সঙ্গে বাড়ছে বিপদ, রংপুর অঞ্চলে বন্যার আভাস

তিস্তায় পানির সঙ্গে বাড়ছে বিপদ, রংপুর অঞ্চলে বন্যার আভাস

Update Time : ০৯:৩২:০১ pm, Sunday, ২১ জুন ২০২৬

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণের কারণে রংপুর অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে, যা রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রংপুরে ১৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে নির্মিত ৯০০ মিটার দীর্ঘ রক্ষা বাঁধের ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ভেঙে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর ভাঙন ঠেকাতে এলজিইডি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং স্থাপন করলেও সেটিও এবার ভেঙে গেছে। এতে সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন।

ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রোববার সকাল ৯টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। দুপুরে পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে রাখা হয়েছে।

তিস্তার পানি বৃদ্ধির কারণে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ফসলি জমি ও বীজতলা ডুবে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, উজানের পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। অন্যদিকে চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা বাদামের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী অভিযোগ করে বলেন, গত বছর ব্লক দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের পরামর্শ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে বাঁশের পাইলিং স্থাপন করা হয়েছিল। এবার সেটিও ভেঙে গেছে। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর বিভিন্ন চরাঞ্চলেও পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। হাতীবান্ধার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, শনিবার ভোর থেকেই তিস্তার পানি তাদের এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারীর কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের অনেক এলাকা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হতে পারে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারাজের সবগুলো জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, তিস্তার পাশাপাশি ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর, জিঞ্জিরাম ও ঘাঘট নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

শু/সবা