একসময় শান্ত, নিরিবিলি ও বসবাসের জন্য আরামদায়ক নগরী হিসেবে পরিচিত রংপুর এখন বিকট শব্দের দৌরাত্ম্যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নগরজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী মোটরসাইকেল ও মডিফাইড গাড়ির চলাচল। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হর্ন, অবৈধভাবে পরিবর্তিত সাইলেন্সার (হলার) এবং ইঞ্জিন মডিফিকেশনের কারণে সৃষ্ট তীব্র শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন নগরবাসী।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও আবাসিক এলাকায় বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী মোটরসাইকেল ও স্পোর্টস কারের বিকট শব্দে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা। চিকিৎসকদের মতে, শব্দদূষণ শুধু বিরক্তির কারণ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রংপুরে সাম্প্রতিক সময়ে দামি স্পোর্টস বাইক ও আধুনিক ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। এসব যানবাহনের একটি অংশকে অবৈধভাবে পরিবর্তন করে উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী সাইলেন্সার, হাইড্রোলিক হর্ন, অতিরিক্ত এলইডি লাইটসহ নানা যান্ত্রিক পরিবর্তন করা হচ্ছে। ফলে যানবাহনগুলো কার্যত শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব মোটরসাইকেলের অধিকাংশ চালকের বয়স ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অনেকেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রধান সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও অপেক্ষাকৃত ফাঁকা সড়কে তারা বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে শব্দদূষণ সৃষ্টি করছে।
রংপুর নগরীর সিও বাজার, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, পাকেরমাথা, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, ঘাঘট, কাচারিবাজার, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, প্রেসক্লাব এলাকা, গুপ্তপাড়া, কামারপাড়া, শাপলা চত্বর, রেলওয়ে স্টেশন, সাতমাথা, মডার্ন মোড়, খামার মোড় এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিনিয়ত এ ধরনের যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল দেখা যাচ্ছে। একই সমস্যা জেলার বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, পীরগাছা, কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া ও সদর উপজেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, এসব মোটরসাইকেলের চালকদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। তাদের হাতে দামি মোটরসাইকেল তুলে দিয়ে অনেক অভিভাবক দায়িত্ব শেষ মনে করেন। কিন্তু তারা কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছে এবং সমাজে কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে, সেটিও অভিভাবকদের দেখা উচিত। প্রয়োজন হলে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দে অবস্থান করলে কানের সূক্ষ্ম স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একসময় স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত শব্দের কারণে অনিদ্রা, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, মানসিক অস্থিরতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও হৃদরোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ খুবই সীমিত। তারা অবৈধ সাইলেন্সার ও হাইড্রোলিক হর্ন বিক্রি ও সংযোজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, নম্বরবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং স্টান্টবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
রংপুরবাসীর প্রত্যাশা, উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই নগরী আবারও শান্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরে পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রশাসনের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমেই শব্দ সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যথায় বিকট শব্দের দৌরাত্ম্য ভবিষ্যতে রংপুরের অন্যতম বড় নাগরিক সমস্যায় পরিণত হবে।
রংপুর ব্যুরো: 






















