◉ এবছর ভাতা পাবেন ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২৮০ জন
◉ ‘উপকারভোগী নির্বাচনের সময় অর্থাৎ জুলাই মাসে উপকারভোগীকে অবশ্যই গর্ভবতী থাকতে হবে’ : মহিলা অধিদফতর
► সীমিত আয়ের মধ্যে সরকার এই ভাতা দিচ্ছে এটি ভালো উদ্যোগ : ডা. ফওজিয়া মোসলেম
► ভাতা গ্রহিতার সংখ্যা কমিয়ে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হোক : এএইচএম নোমান
সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতায় সরকার মাতৃত্বকালীন ভাতার ব্যবস্থা রেখেছে। এর আওতায় গর্ভকালীন মা ও গর্ভের শিশুর পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানে এটা কাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মা ও শিশু ভাতা উপকারভোগীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২৮০ জনে উন্নীত করেছে সরকার। এই অর্থবছরে এই মায়েরা ভাতা পাবেন যা তার এবং গর্ভের সন্তানের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে। দুর্মুল্যের বাজারে এই ভাতার পরিমাণ নিতান্তই কম। আবার, গর্ভবতী মায়েদের এই ভাতা কার্যক্রম দেশের সার্বজনীন সকল মায়ের জন্য না শুধু হতদরিদ্র মায়ের জন্য নির্ধারিত। সেই মাকেও বেশকিছু শর্ত মেনে এই ভাতার আওতায় আসতে হবে। কোন শর্ত পূরণ না হলে সেই মায়ের পক্ষে ভাতার আওতায় আসা কঠিন। তাই, এই ভাতা কার্যক্রম আরও সহজ করা প্রয়োজন এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি ডরপের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান বলছেন, ভাতা গ্রহিতার সংখ্যা কমিয়ে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হোক।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৭-৮ সালে গ্রামাঞ্চলে এবং ২০১০-১১ তে শহরাঞ্চলে মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মা ও শিশু ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪ হাজার ৮০০ জন। যা এবছর বেড়েছে। ‘দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা’ এবং ‘শহর অঞ্চলের ল্যাকটেটিং ভাতা’ উন্নত সংস্করণ ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের আওতায় ০ থেকে ৪ বছরের শিশুর পুষ্টিমান উন্নয়ন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য এই কর্মসূচি পরিকল্পনা করা হয়েছে। কর্মসূচিটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্দেশ্য এবং শিশুদের প্রথম ১০০০ দিনের পুষ্টির গুরুত্ব সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হয়।
রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা শাহিনা আক্তার শিখা (৪০) বলেন, আমি উচ্চশিক্ষিত কিন্তু আমার স্বামী আমাকে কোনো অর্থ উপার্জনের কাজ করতে দেয় না। আমি মাতৃত্বকালীন ভাতা সম্পর্কে পত্রিকায় পড়েছি। যখন আমি গর্ভধারণ করি তখন আমি অনলাইনে গিয়ে অনেক খুঁজে এটার ফরম পাই। সেখানে দেখি শুধু হতদরিদ্রদের জন্য সরকার এই ভাতা দিচ্ছে। অথচ আমার মতো বেকার মায়েদের জন্যও এই ভাতাটা জরুরি। সরকার এটা কেন বুঝল না, জানি না। ডরপের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান বলেন, এই ভাতার কার্যক্রম গত ১৬-১৭ বছর ধরে চলে আসছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যই তো জানে কারা এই ভাতার আওতায় আসছে। ভাতার উপযুক্ত এই দরিদ্র মায়েদের জন্য দরখাস্ত করাটা তো বাড়তি ঝামেলা। গরিব মানুষ অনলাইন সুবিধা পাবে কোথা থেকে? এই ঝামেলা থেকে তাদেরকে বাঁচাতে আগে যে নিয়ম ছিল সরাসরি ভাতার ব্যবস্থা করার সেটা ঠিক আছে। টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাবে সেটা ঠিক আছে। এটার দরকার আছে। এটা প্রমাণিত এবং এই টাকাটা পায়। এখন এত অসচেতন নয় মানুষ। দুই এক সময় একেবারেই নিভৃত গ্রামের যারা তাদের টাকা এলোমেলো হয়ত হয়। কিন্তু সেটা কমই হয়। তাছাড়া মানুষ টাকাটা পায় এখন। এই সিস্টেম ভালো। বিকাশের মাধ্যমে বা ব্যাংকের মাধ্যমে তারা টাকাটা পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে অনলাইনে দরখাস্ত করা এটা কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত না। কারণ তাদের হাতে অনলাইন সুবিধা নাই। এটা বাড়তি ঝামেলা। এটাকে বাদ দেয়া উচিত।
তিনি বলেন, আমি বহুদিন থেকে বলে আসছি এই ভাতাটা বাড়ানো দরকার। গার্মেন্ট শ্রমিকদের যে সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকা, সেই টাকাটা নির্ধারণ করে দিক। আর সংখ্যা না বাড়িয়ে সংখ্যা অনুপাতে ভাতার পরিমাণ বাড়াক। সংখ্যা বাড়ানোর দরকার নেই। এখন ১৬ লাখকে যে দিচ্ছে, এতে দেখা যাচ্ছে আর্থিকভাবে সচ্ছল নারী বা ২/৩ বাচ্চার মা এই টাকা পাচ্ছে। এখানে যদি এমন করা হয় যে, এক বাচ্চার জন্য ভাতাটা দেয়া হবে, যদি বাচ্চা বেশি হয় তাহলে সে এই ভাতা পাবে না। এখন সংখ্যাটা বাড়িয়ে দেয়ার কারণে সবগুলো শর্ত পূরণ হয় না। শর্তগুলো পূরণ করার জন্য তখন অন্য মায়েদেরও এই ভাতা দেয়া হচ্ছে। তাই আমি বলব, ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হোক। আর সংখ্যা আমরা বলছি যে, সাত থেকে আট লাখের মধ্যে রাখা হোক। আর সেটা না হয়ে যদি ১০ লাখ করে তা করুক। এর বেশি হতে পারে না। এর বেশি হলে এটা অন্যদের হাতে চলে যাবে। তাই আমি বলব, সংখ্যা কমিয়ে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হোক। গার্মেন্ট কর্মীদের সমপরিমাণ ভাতা দেয়া হোক। সংখ্যা বাড়ালে এটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু প্রতিটা ইউনিয়নে গড়ে ৭০-৮০ জন মা প্রেগন্যান্ট হয় না। সুতরাং যদি ধরেই নিই ১০০ মা প্রেগন্যান্ট হয়। বাকি মা আসবে কোত্থেকে। তাই, সংখ্যা কমিয়ে ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বলছি।
মহিলা বিষয়ক অধিদফতর সূত্র জানায়, ভাতা প্রদানের পাশাপাশি গর্ভবতী মা ও শিশুর পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব ও গর্ভবতী মা এবং তার পরিবারের সদস্যদের (শাশুড়ি বা স্বামী বা মা বা ননদ) পুষ্টি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ পরিবর্তনের আনয়নের জন্য উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন (বিসিসি) প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে এবং এই প্রশিক্ষণটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। গর্ভকালীন সময় থেকে শিশুর ৪ বছর পর্যন্ত শিশুর যত্ন গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভকালীন সময়ে পুষ্টির জন্য অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে প্রতিমাসে মায়ের অ্যাকাউন্টে ভাতার অর্থ হস্তান্তর করা হয়। প্রতি মাসে ভাতার অর্থ প্রদানের ফলে পরিবারগুলো তাদের পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ নিশ্চিত হবে। পুষ্টি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ পরিবর্তনের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সারাদেশে কৃশকায় ও খর্বকায় শিশুর জন্মের হার হ্রাস করার দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে প্রসবপূর্ব যত্ন এবং মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করে।
রাজধানীর হোসেনীদালান এলাকার বাসিন্দা মাহফুজা খাতুন বলেন, আমার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময় স্বামী চাকরি হারায়। তখন আমি কিভাবে এই ভাতা পেতে পারি তা নিয়ে খোঁজ করি। তখন জানতে পারি এটা শুধু হতদরিদ্র নারীর জন্য আমার জন্য না। মাহফুজা বলেন, আমার বাসায় যে মেয়েটা কাজ করত সে এই ভাতা পেয়েছে কিন্তু আমি সচ্ছল তাই পাইনি। এটা আমার জন্য খুব কষ্টের ব্যাপার ছিল। রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের বাসিন্দা জোহরা (৩০) বলেন, আমি যে স্যারের বাড়িতে কাজ করি সে এই টাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এর জন্য কোন টাকা দিতে হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একাউন্টে টাকাটা পাই আর কিভাবে কি করতে হয়েছে, কিছুই জানি না।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যে সাহায্য করতে চেষ্টা করছে এই উদ্যোগটা ভালো। আমরা সবসময় বলে আসছি যে, জেন্ডার বাজেটে এই নিরাপত্তা খাতের বাজেটটাকে যুক্ত করা। যেন মাতৃত্বকালীন ভাতাটা ঠিক মানুষটাই পায়। এটা ঘোষণায় থাকল আর বাস্তবে হলো না। হয়ত অনেকেই ভাতা পাচ্ছে। আমরা তো এটাও জানি যে বিতরণের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকছে। আরও ভেতরে গেলে আরও অনেক ধরণের কথাবার্তা বেরুবে। সেই কারণে যদি একটা তথ্য উপাত্ত’র ভিত্তিতে হয়, আমাদের মাতৃত্বের রেট এটা। প্রেগন্যান্সির রেট এটা। এটার মাধ্যমে এতজনকে আমি দিব। উনারা যদি সিলেকশন করে থাকেন যে হতদরিদ্রদের দিবেন বা যারা চাকরি করেন সেই মায়েদের দেয়ার দরকার নেই। যদিও চাকরি যারা করে তারা কিন্তু মাতৃত্বকালীন ভাতা পায় না। তারা ছুটি পায় আর ঐ সময় বেতনটা পায়। কাজেই একটা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে একটা ক্রাইটেরিয়া করা দরকার যে কি কি ভিত্তিতে তারা দিচ্ছেন এবং সেই ক্রাইটেরিয়া যদি সকলের সাথে আলাপ করে সিভিল সোসাইটির সাথে আলাপ করেন, যারা সমাজকল্যাণমূলক কাজ করেন তাদের সাথে আলাপ করে একটা জিনিস করতে পারেন তাহলে এটা আরও হেল্পফুল হওয়ার সম্ভাবনাটা আরও বেড়ে যায়। কাজেই উনারা যতটুকু দিচ্ছেন ততটুকুর জন্য আমরা তাদেরকে সাধুবাদ জানাই কিন্তু এই সেফটি নেটওয়ার্কের আওতাটা জেন্ডার বাজেটের প্রেক্ষিতে আমরা বলছি যে, সেফটি নেটওয়ার্কের এই এলাকাটাকে বাড়ানো এবং এটার ডিস্ট্রিবিউশনটা কিভাবে হচ্ছে তার একটা তথ্য উপাত্ত থাক, ক্রাইটেরিয়া থাক। এটা বিতরণ কিভাবে হচ্ছে তারও একটা ক্রাইটেরিয়া থাক। অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল পত্রের দ্বিতীয় ধাপ (২০২১-২০২৬) এর কর্ম পরিকল্পনা অনুসারে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ৬ মিলিয়ন বা ৬০ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। একজন মা ৩৬ মাস ৮০০ টাকা করে ভাতা পেয়ে থাকেন। সর্বমোট ২৮৮০০ টাকা ভাতা প্রদান করা হয়।
সূত্র জানায়, গর্ভবতী মহিলা নিজে ইউনিয়ন বা পৌর ডিজিটাল সেন্টারে নির্ধারিত ৪০ টাকা ফি প্রদানের বিনিময়ে অথবা উপজেলা তথ্য আপা বা তথ্য সেবাসহকারীর নিকট বিনামূল্যে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করার সময় আবেদনকারীর ০৪ বা ০৬ মাসের গর্ভাবস্থায় থাকবেন। প্রতিমাসের ইউনিয়ন পর্যায়ে আবেদন গ্রহন অবশ্যই প্রতিমাসের ১-২০ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
আবেদনকারীকে অবশ্যই ২০-৩৫ বছর বয়স হতে হবে এবং প্রথম অথবা দ্বিতীয় গর্ভাবস্থা হতে হবে। গর্ভবতীর মোট মাসিক আয় দুই হাজার টাকার নিচে হতে হবে। দরিদ্র প্রতিবন্ধী মা অগ্রাধিকার পাবেন। এমন মা যার কেবল বসতবাড়ী রয়েছে বা অন্যের জায়গায় বাস করে। নিজের বা পরিবারের কোন কৃষি জমি, মৎস্য চাষের জন্য পুকুর নেই। উপকারভোগী নির্বাচনের সময় অর্থাৎ জুলাই মাসে উপকারভোগীকে অবশ্যই গর্ভবতী থাকতে হবে। অনলাইনে বা ইউপিতে গিয়ে আবেদন করা যাবে। তবে অনলাইন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে অনুমোদনের কাজ করে থাকে। তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌর সভার পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে তথ্য ভেরিফাই করা হয়।
























