* অপরাধ সংঘটনে রয়েছে সাতটি হটস্পট, অসহায় প্রশাসন
* মহাসড়কের অনেকাংশে নেই সড়ক বাতি, পর্যাপ্ত সিসিটিভি
* সন্ধ্যা নামতেই মানুষের জানমালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে অপরাধীরা
* যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যানজটেই ফায়দা লুটছে সংঘবদ্ধ চক্র
‘দীর্ঘ এ সড়কপথে যানজটের সুযোগেই অপরাধীরা এসব অপকর্ম করছে। এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই,আমরা সড়কজুড়ে নিয়মিত টহল দিচ্ছি’
– আব্দুল কাদের জিলানী, অফিসার ইনচার্জ (ওসি), কাঁচপুর হাইওয়ে থানা
‘আমরা ডাকাতি-ছিনতাই রোধে তৎপর রয়েছি। ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের দুটি টহল টিম নিয়মিত কাজ করছে’
– লে. কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন, অধিনায়ক (সিও), র্যাব-১১ নারায়ণগঞ্জ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় শরীক জোট সরকারের পতন ঘটে। এরপর ভেঙে পড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড। ওই বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুরু হয় সংস্কার কার্যক্রম। কিন্তু নানামুখী উদ্যোগেও পুলিশের মনোবল পুরোপুরি ফেরেনি। নানা ইস্যুতে দাবি-দাওয়া নিয়ে বছরজুড়ে চলতে থাকে বিক্ষোভ-সমাবেশ। সেই থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ছিনতাইকারী-ডাকাতদের দৌরাত্ম্য কয়েকগুণ বেড়েছে। মহাসড়কের দীর্ঘ ২১ কিলোমিটার পথের অধিকাংশ স্থানেই নেই সড়ক বাতি আর পর্যাপ্ত সিসিটিভি। সন্ধ্যা নামতেই মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনে হামলে পড়ছে অপরাধীরা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং আর দীর্ঘ যানজটের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধ সংঘটনের সাতটি হটস্পট তৈরি করেছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র। এই অপরাধীরা প্রতিনিয়ত মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষের সর্বস্ব লুট করতে তাদের আঘাতও করছে। যার বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে ভীতি তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় একের পর এক এসব ঘটনা সংঘটিত হলেও তারা পরিস্থিতি সামলাতে অসহায় হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাদের জিলানী বলছেন, দীর্ঘ এ সড়কপথে যানজটের সুযোগেই অপরাধীরা এসব অপকর্ম করছে। এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই,আমরা সড়কজুড়ে নিয়মিত টহল দিচ্ছি। এদিকে নারায়ণগঞ্জের র্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, আমরা ডাকাতি-ছিনতাই রোধে তৎপর রয়েছি। ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের দুটি টহল টিম নিয়মিত কাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন ও প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ জেলার সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোলপ্লাজার প্রায় ২১ কিলোমিটারে ছিনতাই-ডাকাতি নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলায় উজ্জ্বল আলোতে এই কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলেও সূর্যের আলো নামতেই সংঘবদ্ধ অপরাধীরা মানুষের জানমালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। মহাসড়কের এই অংশটুকু ছিনতাইকারী-ডাকাতদের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। আর এসব কার্যক্রমে সুবিধা করে দিচ্ছেন সড়কজুড়ে না থাকা আলোকবাতি এবং যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ে সৃষ্টি হওয়া যানজট।

সড়ক পরিদর্শন করে দেখা গেছে, মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশে সড়কবাতি নেই। যার ফলে দিনের বেলায় ঠিকঠাক থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে চলাচলকারী পরিবহনের আলো ব্যতীত মহাসড়ক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আর আলো না থাকার এই সুযোগকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি তুলনামূলক সিসি ক্যামেরারও ঘাটতি রয়েছে। অপরদিকে বিভিন্ন মিল-ইন্ডাস্ট্রির মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত বড়বড় কন্টেইনারও মহাসড়কে থামিয়ে রাখার কারণে প্রায় সময়ই যানজট সৃষ্টি হয়ে গাড়ি আটকে থাকে। গাড়ি আটকে থাকার সময়টাতে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা মানুষকে হামলা করে সর্বস্ব লুটে নিয়ে যায়।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মহাসড়কের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ব্রিজ ও ব্রিজের নিচ, মদনপুর বাসস্ট্যান্ড, লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের আশপাশ, মোগরাপাড়া এবং মেঘনা টোলপ্লাজায় প্রতিনিয়ত ডাকাতি হচ্ছে। এতে নিঃস্ব হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। এদিকে ডকাত-ছিনতাইকারীদের এমন তাণ্ডব প্রশাসনের কার্যক্রমে ত্রুটির দায়ে ঘটছে বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে অপরাধীরা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যার ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসন আদৌ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
গেলো কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল ভিডিওগুলোর মধ্যকার কয়েকটির বিবরণ তুলে ধরা হলো-
গত ২৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন, নয়াগাঁও এবং আষাঢ়িয়ারচর এলাকায় তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সে রাতে তারেক রহমানের জন্য পূর্বাচলে আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দিতে যাওয়ার সময়ে পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় ডাকাতদের হামলার শিকার হন কুমিল্লার লালমাই থানার বিএনপি নেতা শহীদ, বাবুল মেম্বার, মনির হোসেনসহ কয়েকজন বিএনপি নেতা। তাদের গাড়ি ভাঙচুর করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দল। হামলায় আহত হন বিএনপির অন্তত পাঁচ নেতা। একই রাতে আষাঢ়িয়ারচর এলাকায় আরেকটি গাড়ি বহরে থাকা বিএনপি নেতাদের ওপর হামলা করে তাদের সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভোরে নয়াগাঁও এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাতদের হামলায় আহত হন কাতার প্রবাসী রিফাতুজ্জামান। গত ২ জানুয়ারি রাতে সাইনবোর্ড অংশে প্রকাশ্যে একদল ডাকাত ডাকাতি করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর একদিন পরই গত ৩ জানুয়ারি আবু আইয়ুব আনসারী নামক এক ইসলামী বক্তা মেঘনা ব্রিজের সামনে ঘটা ডাকাতির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি লেখেন, কাঁচপুর থেকে সোনারগাঁও মেঘনা ব্রিজের পুরো রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম ছিল। আর এই জ্যামের মধ্যেই একের পর এক বাস, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস ভাঙচুরসহ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এটা আসলে অত্যন্ত দুঃখজনক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো একটি জায়গায় কোনো প্রশাসন চোখে পড়েনি, এই হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার অবস্থা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাঁচপুর হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল কাদের জিলানী বলেন, আমরা সড়কজুড়ে নিয়মিত টহলে থাকি। আমি এখানে জয়েন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০ জনকে থানায় হস্তান্তর করেছি। মূলত এখানে মেঘনাসহ বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি থাকায় তাদের বড় বড় কন্টেইনার গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়। ফলে যানজট সৃষ্টি হয়, আর এই যানজটের সুযোগেই অপরাধীরা এসব কৃতকর্ম করছে। আমাদের কোনো গাফিলতি নেই।
সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মহিববুল্লাহ বলেন, মহাসড়ক হাইওয়ের থানার অধীনে থাকা সত্বেও আমরা উপজেলা ও মহাসড়কের জন্য প্রতিদিন ৫টি টহল টিম রেখেছি। অপরাধী নির্মূলে আমরা নিয়মিত অভিযানও দিচ্ছি।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল বারিক বলেন, আমি যোগদানের পর থেকে আমাদের থানা এরিয়ায় ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের মামলা হয়নি। ইতঃপূর্বে হলেও সেটা আমার দেখে বলা লাগবে।

এসব অপরাধের বিষয়ে র্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা ডাকাতি-ছিনতাই রোধে তৎপর রয়েছি। ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জে আমাদের দুটি টহল টিম নিয়মিত কাজ করছে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মুঠোফোনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) মোঃ ইমরান আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের কারও বক্তব্য মেলেনি।


























