উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ২৫/৩০টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রাম সদর,নাগেশ্বরী,ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর,চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর,ফুলবাড়ি এবং রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির ফলে গত তিনদিন ধরে ঘরের ভিতর মাচা ও চৌকি উঁচু করে আশ্রয় নিয়েছে বানভাসি মানুষ। চৌকিতে রান্না-বান্না, চৌকিতেই রাত কাটছে তাদের। বাড়ির চারপাশে থৈথৈ পানিতে অসহায় দিন কাটছে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়,বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে হাতিয়া পয়েন্টে-৪২সে:মি: নুন খাওয়া পয়েন্টে-৩২সে:মি: এবং চিলমারী নৌবন্দর পয়েন্টে-৩৪ সেন্টিমিটার। উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বালাডোবা গ্রামের আসমত ও নুরবানু জানান, গত তিনদিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় আছি। ছেলে মেয়েকে উঁচু জায়গায় রেখে গরু-ছাগল পাহারা দিচ্ছি। এখনো কেউ খোঁজ খবর নিতে আসেনি। একই ইউনিয়নের ফকিরের চর গ্রামের রমিচন জানান, ঘরে পানি। রান্না করতে সমস্যা হচ্ছে। গরুকেও কিছু খাইতে দিতে পারছি না। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে।
একই গ্রামের ফরিদা জানান,চারটে ভাত ফুটাচ্ছি। তরকারি নাই। লবন দিয়া খাইতে হইবো। পাঁচগাছি ইউনিয়নের শুলকুর বাজার কাচিচর গ্রামের অসুস্থ মমেনা বেগম বলেন, এক সপ্তাহ ধরে ঘরবাড়ি তলিয়ে আছে। কেউ খোঁজ খবর নেয়নি। মেম্বার চেয়ারম্যানও আসেনি দেখতে। আজকে বুধবার সকালে তরকারি দূরের কথা পান্তা ভাত খাইছি লবণ ছাড়া। গবাদিপশুর খাবার নেই। বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর জানান, আমার ইউনিয়নে ১৫শ’মানুষের বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। এছাড়াও ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল হামিদ শেখ জানান, আমার ওয়ার্ডে দেড়শ ঘরে পানি উঠেছে। এছাড়াও এই ইউনিয়নে প্রায় ৮শ’ পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় আছে।

ফকিরের চরে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৮০টি পরিবার আশ্রয় নিলেও তারা বিশুদ্ধ পানি ও ল্যাটিন সমস্যায় ভুগছেন। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার প্রায় ৩০টি পয়েন্টে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙ্গন চলছে। পানি আরও ৭২ ঘন্টা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে জেলার প্রধান নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে স্বল্প মেয়াদি বন্যা বিরাজ করবে। একাধিক সূত্রে ভাঙ্গন কবলিত এলাকা গুলো হলো সারডোব,জগমহনেরচর, সিতাইঝাড়,ছিনাই কালুয়া,যাত্রাপুর, সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ,ঠুটাপাইকর, ঘড়িয়ালডাঙ্গা, বিদ্যানন্দ, চরবলদিয়া, পাইকডাঙ্গা,ছিটপাইকের ছড়া, ধলডাঙ্গা,বালারহাট,চর ব্যাপারি গ্রাম, মাঝিপাড়া,বল্লভেরখাস,কড়াই বরিশাল, শাখাহাতি, মনতলা,সোনাপুর,চরগেন্দার আলগা, কুঠির চর খানপাড়া, ঝাউবাড়ি, চরসাজাই,নাওছালা, কোদালকাটি বাজার, শিকারপুর,কীর্তন তরিসহ বিভিন্ন স্থান।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ জানান, বন্যা কবলিত কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী, উলিপুর ও নাগেশ্বরী,ভূরুঙ্গামারী,রৌমারী, রাজীবপুর,রাজারহাট উপজেলায় খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হয়েছে।বুধবার এক হাজার ২শত পরিবারকে ১০কেজি করে চাল সহ অন্যান্য সামগ্রি বিতরণ করা হয়। এরমধ্যে উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নে ১০০ জনের মাঝে ১০কেজি করে চাল দেয়া হয়। চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল, নয়ারহাট,চিলমারী ইউনিয়নে প্রত্যেকটি পয়েন্টে ১০কেজি করে ০৬ মেট্রিক টন চাল ৬শতাধিক উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বিকালে চরভগবতীপুর,খেয়ার আলগা,কালীর আলগা,পোড়ার চরে ১৫০ প্যাকেট ১০কেজি করে চাল, ডাল ও তেল দেয় হয়। নাগেশ্বরী উপজেলার গরু ভাসার চর,ফকিরগঞ্জ, নুনখাওয়ার চরকাপনা ও নুনখাওয়া পয়েন্টে দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে পরিবার প্রতি ১০কেজি করে চাল, এক কেজি ডাল, এক লিটার তেল ও এক কেজি লবণ বিতরণ হয়। এছাড়াও ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটায় ১৫০ জন পরিবারকে ১০কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়।























