০৯:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা ও সেটেলার আগ্রাসন পাহাড়ি আদিবাসীদের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে

বান্দরবানের আলীকদমে ম্রো জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং খাগড়াছড়িতে তিনজন পাহাড়ি আদিবাসীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আয়োজিত এ সমাবেশে বিভিন্ন আদিবাসী ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কুর্নিকোভা চাকমা। তিনি বলেন, “গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ বান্দরবানের আলীকদমে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের দুই দফা হামলায় ১৮ জনের বেশি ম্রো আদিবাসী গুরুতর আহত হন। একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ হামলা সংঘটিত হলেও ঘটনার আগে ও পরে পুলিশ প্রশাসনের বিভ্রান্তিকর ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।”

তিনি আরও বলেন, “একইভাবে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ খাগড়াছড়ির কমলছড়ি এলাকায় সেটেলারদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি আদিবাসী আহত হন, যাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এসব ঘটনা পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমি সংকট, সেটেলার আগ্রাসন, বিচারহীনতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ।”

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগরের সভাপতি কনেজ চাকমা বলেন, “বাংলাদেশে কার্যকর বিচার ব্যবস্থা না থাকার কারণে পাহাড় ও সমতলে আদিবাসীদের ওপর বারবার হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে নানা কৌশলে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আলীকদমে হামলার সঙ্গে জড়িত জাফর নামের ব্যক্তি বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ছাড় পেয়ে যাওয়ায় এমন হামলার সাহস পাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও বর্তমানে তারা মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।” এ সময় তিনি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্রো জনগোষ্ঠীর ছবি দিয়ে গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেও আজ সেই ম্রো জনগোষ্ঠী হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অথচ হামলাকারীদের বিচারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “খাগড়াছড়িতে দিনদুপুরে কুপিয়ে আহত করা হলেও ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।”

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জুলাইয়ের আন্দোলনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের কাছ থেকে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি দাবি করেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই আদিবাসীদের ওপর সবচেয়ে বেশি হামলা, উচ্ছেদ ও জমি দখলের ঘটনা ঘটছে।” রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখন স্থানীয় মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে উত্থাপিত দাবিসমূহ:

১. বান্দরবানের আলীকদম ও খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে সংঘটিত পৃথক দুটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
২. হামলার সঙ্গে জড়িত সেটেলার ও রোহিঙ্গাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পাহাড়ি আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের ভূমি অধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে।
৪. পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করতে হবে।

সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল (হাসুক), গারো স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন (গাসো), বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আদিবাসী যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অনন্ত তঞ্চঙ্গ্যা। বক্তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।

শু/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গা ও সেটেলার আগ্রাসন পাহাড়ি আদিবাসীদের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে

আপডেট সময় : ০৭:৫১:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

বান্দরবানের আলীকদমে ম্রো জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং খাগড়াছড়িতে তিনজন পাহাড়ি আদিবাসীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আয়োজিত এ সমাবেশে বিভিন্ন আদিবাসী ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

সমাবেশে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কুর্নিকোভা চাকমা। তিনি বলেন, “গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ বান্দরবানের আলীকদমে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের দুই দফা হামলায় ১৮ জনের বেশি ম্রো আদিবাসী গুরুতর আহত হন। একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ হামলা সংঘটিত হলেও ঘটনার আগে ও পরে পুলিশ প্রশাসনের বিভ্রান্তিকর ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।”

তিনি আরও বলেন, “একইভাবে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ খাগড়াছড়ির কমলছড়ি এলাকায় সেটেলারদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি আদিবাসী আহত হন, যাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এসব ঘটনা পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমি সংকট, সেটেলার আগ্রাসন, বিচারহীনতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ।”

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগরের সভাপতি কনেজ চাকমা বলেন, “বাংলাদেশে কার্যকর বিচার ব্যবস্থা না থাকার কারণে পাহাড় ও সমতলে আদিবাসীদের ওপর বারবার হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে নানা কৌশলে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আলীকদমে হামলার সঙ্গে জড়িত জাফর নামের ব্যক্তি বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ছাড় পেয়ে যাওয়ায় এমন হামলার সাহস পাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও বর্তমানে তারা মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।” এ সময় তিনি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্রো জনগোষ্ঠীর ছবি দিয়ে গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেও আজ সেই ম্রো জনগোষ্ঠী হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অথচ হামলাকারীদের বিচারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “খাগড়াছড়িতে দিনদুপুরে কুপিয়ে আহত করা হলেও ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিন্তু অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।”

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জুলাইয়ের আন্দোলনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের কাছ থেকে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি দাবি করেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই আদিবাসীদের ওপর সবচেয়ে বেশি হামলা, উচ্ছেদ ও জমি দখলের ঘটনা ঘটছে।” রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখন স্থানীয় মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে উত্থাপিত দাবিসমূহ:

১. বান্দরবানের আলীকদম ও খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে সংঘটিত পৃথক দুটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
২. হামলার সঙ্গে জড়িত সেটেলার ও রোহিঙ্গাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পাহাড়ি আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের ভূমি অধিকার অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে।
৪. পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করতে হবে।

সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল (হাসুক), গারো স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন (গাসো), বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আদিবাসী যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অনন্ত তঞ্চঙ্গ্যা। বক্তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।

শু/সবা