মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় জমে উঠেছে ২০০ বছরের পুরনো নৌকার হাট। বর্ষা মৌসুমে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা আর চলাচল করার একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা।
সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যা, সপ্তাহখানেক ধরে অবিরাম বর্ষণ এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে মানুষ নৌকা কেনার জন্য ভিড় করছেন ঘিওর হাটে।
বুধবার উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহের মাঠে নৌকার হাটে গিয়ে দেখা যায়, জায়গা না হওয়ায় পাশের ডিএন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো রয়েছে হাজারো নৌকা। ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম পুরো এলাকা। এখানে সাধ্যের মধ্যে সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য রয়েছে নানা ধরনের নৌকা। পদ্মা-যমুনা, কালীগঙ্গা, ইছামতি ও ধলেশ্বরীসহ ছোট বড় বেশ কয়েকটি নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জ জেলা।
ইতিমধ্যে বর্ষার পানি প্রবেশ করছে এ এলাকার নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরপুর। বিশেষ করে ঘিওর, হরিরামপুর, শিবালয়, ও দৌলতপুর উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা নিচু। পদ্মা-যমুনার সঙ্গে এই চারটি উপজেলার সরাসরি সম্পর্ক থাকায় সাধারণ বর্ষাতেই নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এই সব অঞ্চলের মানুষ বন্যার পানি আসার আগে থেকেই নৌকা প্রস্তুত করে রাখেন। এসব এলাকায় বর্ষা মৌসুমে একমাত্র ভরসা হলো নৌকা। জেলা ও জেলার বাইরের মানুষ এ হাটে এসে নৌকা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। হাটে প্রতিদিন লাখ টাকার নৌকা বেচাকেনা হয়। তবে সাপ্তাহিক হাট বুধবারে সবচেয়ে বেশি নৌকা বেচাকেনা হয়ে থাকে। প্রতি হাটে ৩০০ থেকে ৪০০ নৌকা বেচাকেনা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরইসলাম বলেন,এবার আষাঢ় মাসে দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে এবং উজান থেকে পানি আসায় বন্যা হয়ে গেছে ।তাই ঘিওর নৌকার হাটে এতো ভিড় । নৌকা তৈরির কারিগররাও দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ঘিওর বাজারের কাঠমিস্ত্রি কৃষ্ণ চন্দ্র ও সুবল দাস বলেন, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমের অপেক্ষায় থাকি। সপ্তাহে আমাদের কারখানা থেকে কমপক্ষে ২০-২২টি নৌকা হাটে নেওয়া হয়। বর্তমানে কাঠ, লোহা ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির দাম বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরিতে খরচ বেড়েছে। আমরা সাধারণত রেইনট্রি, আম, কদম, শিমুল, বৈন্যা, ডোমরা ইত্যাদি কাঠ দিয়ে ডিঙ্গি, কোশা ও স্টিল বডির নৌকা তৈরি করছি।
হাটে নৌকা কিনতে আসা জিয়ানপুর গ্রামের তালেব মিয়া বলেন,যমুনা নদীর পাড়ে আমাদের এই গ্রামটি খুবই নিচু। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। বর্ষার সময় একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। পানি বেড়ে রাস্তায় উঠেছে। নৌকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই ঘিওর হাট থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি বড় ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে নিলাম কিছু করার নেই চলাচল তো করতে হবে ।
ঘিওর হাট বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন মুসা বলেন মানিকগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে বর্ষার শুরুতেই পানি আসে। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হয় নৌকার। আর এসব প্রয়োজন মেটাতে ঘিওরে দুইশত বছর ধরে চলে আসছে নৌকার হাট।
ঘিওর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জনি বলেন, এই নৌকার হাটটি আমাদের জেলা ও উপজেলার ঐতিহ্যে। আমার জন্মের পর থেকে এই নৌকার হাটটি দেখে আসছি। এই হাটের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ নৌকা কিনতে আসেন এই ঘিওর হাটে ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিনুর রহমান বলেন, ঘিওর হাটে বর্ষা মৌসুমে সবচাইতে বেশি বেচাকেনা হয় নৌকার। ঘিওর উপজেলাসহ আশপাশের অনেক জেলার মানুষ এই হাট থেকে নৌকা কিনে নেয়। সরকারিভাবে নৌকার কারিগররা যদি স্বল্প সুদে ঋণ পায় তাহলে ঘিওর হাটে নৌকার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে।























