বিদায় নিয়েছে ২০২৩। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে একটি বছর কিন্তু তারই পরতে পরতে জমে আছে অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন আর স্মৃতির অমূল্য ভাণ্ডার। শুরু হলো নতুন একটি বছর ২০২৫। নতুন ভোরের আলোয় জেগে উঠেছে নতুন সম্ভাবনা, নতুন প্রত্যাশা। প্রতিটি নতুন বছর যেন এক অনন্ত সম্ভাবনার ক্যানভাস, যেখানে আঁকা হয় স্বপ্নের ছবি।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের মাঝেও নতুন বছরের আগমনে দেখা দিয়েছে ক্যাম্পাস নিয়ে নতুন স্বপ্ন আর পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি। শিক্ষার্থীরা এই নতুন বছরে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য পূরণে নতুন পরিকল্পনা আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। ক্যাম্পাস নিয়ে কী ভাবছেন তারা? কী তাদের প্রত্যাশা? তাদের এই প্রত্যাশা গুলো তুলে ধরেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আলফি সানি ।
প্রতি বছর একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক মেলার আয়োজন করতে হবে ।
২০২৫ সালের নতুন ভোরে আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের, যা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে, শিক্ষার মান উন্নত করে এবং একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলে এটি হয়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণের সর্বোচ্চ ক্ষেত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারকে আরও সমৃদ্ধ করতে দেশি-বিদেশি লেখকদের উন্নতমানের বই সংগ্রহ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আরামদায়ক পাঠের জন্য রিডিংরুমের পরিসর বৃদ্ধি এবং পরিবেশ উন্নয়ন আবশ্যক। প্রতিবছর একটি বইমেলার আয়োজন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা এবং সৃজনশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ওপর একটি মেলার আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি, সরকারি-বেসরকারি এবং দেশি-বিদেশি সংস্থার সহায়তায় কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং জ্ঞান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত শ্রেণিকক্ষগুলোকে কার্যকর করা, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং ক্লাস পরিচালনায় নিয়মিততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে, গবেষণার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তাধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
পরিবহন সংকট মোকাবিলায় বাসের সংখ্যা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক শিক্ষার্থী এখনো দাঁড়িয়ে ক্লাসে যেতে বাধ্য হন। পাশাপাশি, ক্যাম্পাসে আবাসিক ব্যবস্থার অভাব শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এ সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান উন্নয়নও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের উৎসবগুলো শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে।
২০২৫ সাল হোক নতুন সম্ভাবনার সূচনা। জ্ঞানের আলোড়ন, সৃজনশীল পরিবেশ এবং উন্নত শিক্ষার মানের মধ্য দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
মিঠুন আলি
ইংরেজি বিভাগ
সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস চাই
সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। এটি শুধুই দৃষ্টিনন্দন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি, শারীরিক সুস্থতা এবং শিক্ষার উৎকর্ষতায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। একটি পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য এক স্বপ্নময় স্থান হয়ে ওঠে, যেখানে তারা জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারে।
পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়। সবুজ গাছপালা এবং পরিচ্ছন্নতার সৌন্দর্য শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করে তোলে, যা তাদের পড়াশোনায় আরও গভীর মনোযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। একইসঙ্গে, এমন পরিবেশ মানসিক চাপ কমিয়ে সৃজনশীলতাকে উজ্জীবিত করে। এক টুকরো সবুজ মাঠ, ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণ, কিংবা সুশৃঙ্খল পথ শিক্ষার্থীদের মনে শান্তি এনে দেয় এবং তাদের নতুন ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতা রোগবালাই দূর করে এবং সুস্থ পরিবেশে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করে। সবুজ গাছের ছায়ায় ক্লান্তি দূর হয়, পাখির কূজন কিংবা ফুলের সৌরভ শিক্ষার্থীদের কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে তোলে। এসব প্রাকৃতিক উপাদান শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
তবে একটি সুন্দর ক্যাম্পাস গড়ে তোলা কেবল স্বপ্ন নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ক্যাম্পাসজুড়ে গাছপালা রোপণ এবং সেগুলোর যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধু পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই নয়, ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ এমনভাবে সাজাতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে।
তাহমিদুর রহমান
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
আধুনিক ক্লাসরুম ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি চাই
ভালো শিক্ষার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্সগুলো সময়োপযোগী হওয়া আবশ্যক। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা প্রদান করতে হবে যা তাদের শুধু বইয়ের জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য করে তুলবে। এর জন্য কোর্স কারিকুলাম নিয়মিত আপডেট করা, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণার পরিবেশ উন্নত করতে প্রয়োজন আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং প্রযুক্তি, যা শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও অবকাঠামোর উন্নয়ন শিক্ষার মান উন্নয়নে অপরিহার্য। আধুনিক ক্লাসরুম, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং প্রযুক্তি নির্ভর ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রেরণাদায়ী পরিবেশ তৈরি করে। লাইব্রেরিতে আন্তর্জাতিক মানের বই এবং ডিজিটাল রিসোর্স যুক্ত করা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করবে। একইসঙ্গে, হোস্টেলের সংখ্যা বাড়ানো, স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন খাবার নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলবে।
একটি সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, খেলাধুলা, এবং বিভিন্ন ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা এবং দক্ষতা বিকাশের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের কেবল বিনোদন দেয় না, বরং তাদের নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজের দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানোও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের একটি বড় ধাপ। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পার্টনারশিপ, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে। এই ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সাহায্য করে এবং তাদের আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করে।
অবশেষে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে ক্যারিয়ার সহায়তা প্রদান অপরিহার্য। প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করলে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ারের জন্য আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। এসব উদ্যোগ তাদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করবে।
সৈমিক সরকার শ্রাবণ
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ নেয়া উচিত
নতুন বছরে একজন পাবিপ্রবিয়ান হিসেবে আমার স্বপ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে উঠুক এমন একটি স্থান যেখানে জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং মানসিক প্রশান্তির সমন্বয় থাকবে। আমি চাই শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হোক, যেখানে ক্লাস এবং গবেষণার পাশাপাশি নতুন নতুন ধারণা তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো হোক আরও আধুনিক, যেখানে গ্রন্থাগার হবে ডিজিটাল রিসোর্স সমৃদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী হোস্টেল ও ক্যান্টিনের মতো মৌলিক সুবিধা আরও উন্নত হবে। নতুন হোস্টেল ও একাডেমিক ভবনের কাজ দ্রুত শেষ করা হোক।ক্যাম্পাসে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হোক।
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ক্যারিয়ার সেন্টারের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হতে পারে। ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্যারিয়ার ফেস্ট, উদ্যোক্তা মেলা এবং প্রযুক্তি বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করা হোক। পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া এবং সৃজনশীল চিন্তাধারার প্রসার ঘটানো দরকার।
সবশেষে, আমার স্বপ্ন একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাসের। যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হবে, এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। নতুন বছরে পাবিপ্রবি এমন একটি স্থান হোক, যা শুধু জ্ঞানার্জনের নয়, বরং স্মৃতিময় এবং গর্বের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে আমাদের জীবনে।
মঞ্জুরুল ইসলাম
বাংলা বিভাগ






















