বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ বিভাগের আয়োজনে ১৫ দিনব্যাপী প্রযোজনা কেন্দ্রিক নাট্যকর্মশালার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা শিল্পকলা একাডেমি ব্যবস্থাপনায় ১০ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬ টায় ”মোধই” নাটকটি প্রদর্শিত হবে খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে অডিটোরিয়ামে।
নাটকে দেখা যাবে, রাজত্ব থেকে নির্বাসনের পর তৈশার (মিলানের) অধিপতি তংগ্রির (প্রসপারোর) শিশুকন্যা লাব্রে (মিরান্দ)সহ সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ভাসতে ভাসতে বহুদূরে এক দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নেয় তারা। দেখতে দেখতে কেটে যায় দীর্ঘ ১৫ বছর। হঠাৎ একদিন মাঝসমুদ্রে দুর্নিবার মোধই (ঘূর্ণিঝড়) এর কবলে পড়ে তংগ্রি শত্রুপক্ষের জাহাজ। ভাগ্যের পরিহাসে জাহাজডুবি হয়ে তারা এসে পৌঁছায় সেই একই দ্বীপে। নির্বাসন, প্রতিশোধ, ক্ষমা ও প্রায়শ্চিত্তের সঙ্গে নাটকের উপাদানে যোগ হয় মায়াবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তি।
নাট্যকর্মশালার প্রশিক্ষক ও নাটকটির নির্দেশক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরাফাতুল আলম বলেন, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য টেমপেস্ট’ অবলম্বনে নির্মিত ‘মোধই’ নাটকটি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জনপদের এক অসামান্য চিত্রায়ন। মারমা ভাষায় ‘মোধই’ অর্থ ঘূর্ণিঝড়; যা কেবল প্রাকৃতিক প্রলয় নয়, এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও প্রতীক। নাটকটিতে সচেতনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে আন্তঃসাংস্কৃতিক পরিবেশনার মেলবন্ধন। শেক্সপিয়রের মূল নাটকের বিষয়বস্তু অক্ষুণ্ণ রেখে, খাগড়াছড়ির স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের মিথস্ক্রিয়ায় সৃজিত হয়েছে এই অনুপম নাট্যভাষা। নাটকটি যেন এক বহুস্বরিক সমাজের প্রতিচ্ছবি যা একই সাথে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক। উপনিবেশবাদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধস্পৃহা ও ক্ষমার চিরায়ত আখ্যানের সাথে এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, ভূমি ও সম্পদের উপর অধিকারের লড়াই এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংকটের এক সমান্তরাল সন্ধি ঘটেছে এই নাটকে।
তিনি বলেন, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও চাক জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে, পশ্চিমা নাট্য আঙ্গিকের সাথে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সুর, তাল, নৃত্য ও অভিনয়শৈলীর মিশেলে ‘মোধই’ হয়ত লাভ করবে এক অনুপম নান্দনিক বিভা।
তিনি আরো বলেন, খাগড়াছড়িতে নবীন নাট্যকর্মীদের নিয়ে এরূপ নাট্য প্রযোজনা করা একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জের অন্যদিকে বিশাল সুযোগেরও। আশা করছি থিয়েটার সম্পর্কে স্থানীয় দর্শকদের মাঝে একটি ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারবে। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী নাট্যকর্মীরাও একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করবে।
খাগড়াছড়ি শিল্পকলা একাডেমি কালচারাল অফিসার নাহিদ নাজিয়া বলেন, মুনীর চৌধুরী জাতীয় নাট্যোৎসব দেশব্যাপী প্রযোজনা কেন্দ্রিক নাট্যকর্মশালার অংশ হিসেবে বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়রের “দ্য টেম্পেস্ট” অবলম্বনে “মোধই” প্রদর্শিত হবে। আমরা খাগড়াছড়ি শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করে যাচ্ছি। আশাকরি খাগড়াছড়ির স্থানীয় অনভিজ্ঞ ও একেবারে নতুন নাট্যকর্মীরা নির্দেশকের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটা পরিবেশনা উপহার দিতে পারবে ।
নাট্য শিল্পী চনিতা ত্রিপুরা বলেছেন, বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়রের লেখা নাটকে কখনো অভিনয় করা হয়নি। এই প্রথম “মোধই” নাটকের মধ্যে দিয়ে অভিনয়ের হাতেকড়ি। নাটকে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে ডাইনি, পরী, জন্তু, রাজাসহ সবকিছু মিলে খুবই চমৎকার। অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। নাটকটি মঞ্চস্থ হলে মানুষের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারবো। আমি চাই খাগড়াছড়ি দর্শকরা যাতে নাটকটি দেখতে আসে। আশা করি তারা নাটকটি উপভোগ করবে।
নাট্যকর্মী নেনেছেন চাক বলেছেন, আমি আগে কখনো মঞ্চনাটক করিনি। এই প্রথমবার নাটক শেখার বা করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাচ্ছি । কিন্তু খুবই ভালো লাগছে নাটকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে। যিনি প্রশিক্ষক আছেন, তিনি খুব ভালো করে আমাদের শিখাচ্ছেন। তাই আমাদের ইচ্ছে, আমাদের শিল্পকলা একাডেমি যাতে খাগড়াছড়িসহ আরো বিভিন্ন জায়গায় এই নাটকের প্রদর্শনী করার ব্যবস্থা করে ।
ক্ষুদে নাট্যশিল্পী ম্রাবাই মারমা বলেছেন, অদৃশ্য পরীর চরিত্রে অভিনয় করছি। এই চরিত্রে অভিনয় আমি খুব উপভোগ করছি। আমি এই ধরনের কোন নাটকে অভিনয় করিনি। আমার অভিনয় করতে ভালো লাগছে।
নাট্যকর্মী মনোতোষ ত্রিপুরা বলেন, উইলিয়াম শেক্সপীয়রের দি টেম্পেস্ট অবলম্বনে মোধই নাটকের রাজকুমার চরিত্রে অভিনয় করছি। ১৫ দিনের কর্মশালায় নতুন নতুন অনেক কিছু শিখেছি। যা ভবিষ্যতে নাটকের কাজে খুবই উপকারে আসবে। আমারা এরূপ আরো নতুন নতুন নাট্যকর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে চাই।






















