০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক: প্রশ্নের মুখে সরকারের নিরপেক্ষতা

  • সংস্কার শর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে সরকারের নিরপেক্ষতা
  • মৌলিক ইস্যুতে এখনো অনৈক্য, ঝুলছে সনদ-সংস্কার
  • আলোচনায় ধীর গতি, তবুও আশাবাদী ঐকমত্য কমিশন

‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে যে প্রস্তাব এসেছে, এটা করতে পারলে ভালো। ক্ষমতাসীনরা এটা কখনও চাইবে না। কিন্তু এটাকে যদি নির্বাচনের ট্যাগ দেওয়া হয়, তা হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। বিষয়টি আলোচনার প্রস্তাবে রেখে অনড় অবস্থান বদলানো উচিত। – ড. সাব্বির আহমেদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘সাংবিধানিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়া অত্যন্ত দুরূহ, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ – ড. বদিউল আলম মজুমদার, সদস্য, ঐকমত্য কমিশন

 

রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠনের প্রয়াসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার বৈঠক চলছে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে। কমিশনের লক্ষ্য একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করা, যা হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিতর্কমুক্ত। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ মৌলিক অনেক বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কিছু বিষয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দল আপত্তি তুলেছে। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ একে ‘বাস্তবতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, সব বিষয়ে ঐকমত্য সম্ভব নয়, এটা কখনোই আমাদের লক্ষ্য ছিল না। আবার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সাংবিধানিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়া অত্যন্ত দুরূহ, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি জবাবদিহিমূলক ও সংস্কারভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। কিন্তু এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় শর্ত যুক্ত করার প্রবণতা রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগের কারণ হয়েছে। সরকার ও বিএনপির মধ্যে সম্প্রতি কিছু বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে নয় বরং শর্ত আরোপ করে কিছু আদায় করতে চাইলে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে যে প্রস্তাব এসেছে, এটা করতে পারলে ভালো। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্যবাদ দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই ক্ষমতাসীনরা এটা কখনও চাইবে না। কিন্তু এটাকে যদি নির্বাচনের ট্যাগ দেওয়া হয়, তা হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। বিষয়টি আলোচনার প্রস্তাবে রেখে অনড় অবস্থান বদলানো উচিত। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও মত দিয়েছেন, এই সংস্কারগুলো হওয়া উচিত হলেও এগুলো চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। বিএনপিসহ অনেক দলের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও আমরা চাই, সবকিছু আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হোক।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঘোষিত হয়, সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হতে পারে। তবে একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের মাধ্যমে এমন ঘোষণাকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এই আলোচনার পরও নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও পরিষ্কার কোনো রোডম্যাপ প্রকাশ না করায় নির্বাচনী অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঐ বৈঠকের এক মাস পার হলেও সরকারিভাবে নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ জানানো হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়নি।
এ অবস্থায় নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজের বৈঠকের পর। লন্ডন ঘোষণার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা কয়েকটি সংস্কারের বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। সেখানে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে কোনো দল চাইলেই যাতে সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলতে না পারে, সে ধরনের বিধান এবং নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। এসব সংস্কার নিশ্চিত করেই নির্বাচন করার পক্ষে মত দেন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের কয়েক দফা আলোচনা হলেও এ পর্যন্ত ঐকমত্য হয়নি। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের আপত্তি আছে। এটি নির্বাচন বিলম্বিত করার নতুন তত্ত্ব কিনা, এ নিয়েও বিতর্ক চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড় দিয়ে হলেও ঐকমত্যের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে পুরো আলোচনাকেই অর্থহীন করা হচ্ছে কিনা- এমন শঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।
নানা মতভেদ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় আন্তরিকতা দেখাচ্ছে, এমনটাই জানিয়েছেন কমিশনের নেতারা। অধ্যাপক আলী রীয়াজের ভাষায়, দলগুলো একে অপরের মতামত শুনছে, যুক্তি দিচ্ছে, আপোসের পথ খুঁজছে এটাই ইতিবাচক। আমরা আশা করি, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সনদে স্বাক্ষর সম্ভব হবে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সংস্কারের শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তা যেন নির্বাচনের বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। একে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা নির্বাচনের পূর্বশর্ত হতে পারে না। যথাসময়ে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া জরুরি। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ দফায় কমিশনের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে আসতে পেরেছে। এটা খুবই ইতিবাচক। তবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, সংবিধান যাতে কথায় কথায় পরিবর্তন করার সুযোগ না থাকে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। আসলে সাংবিধানিক মৌলিক বিষয়ের সংস্কারে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়া খুব দুরূহ ব্যাপার। তারপরও কমিশন দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গত বছরের অক্টোবর সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব কমিশনের মধ্যে জনপ্রশাসন ছাড়া বাকি পাঁচ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাদের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা।
সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই কমিশনের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ আগস্ট। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রথম ধাপের কার্যক্রম শুরু করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর কমিশনগুলোর ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চাওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৩৩টি দল কমিশনকে মতামত জানায়। গত ২৬ মে সংবাদ সম্মেলনে প্রথম ধাপের আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
তিনি জানান, প্রথম দফায় কমিশন ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি বৈঠক করেছে। আলোচনার সুবিধার্থে কয়েকটি দলের সঙ্গে একাধিক দিনও বৈঠক করেছে কমিশন। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অনেক বিষয়েই দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য ছিল। এরপর সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে গত ২ জুন রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে দ্বিতীয় ধাপের বৈঠকের উদ্বোধন করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ৩ জুন থেকে শুরু হয় বৈঠক।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক: প্রশ্নের মুখে সরকারের নিরপেক্ষতা

আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
  • সংস্কার শর্তে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে সরকারের নিরপেক্ষতা
  • মৌলিক ইস্যুতে এখনো অনৈক্য, ঝুলছে সনদ-সংস্কার
  • আলোচনায় ধীর গতি, তবুও আশাবাদী ঐকমত্য কমিশন

‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে যে প্রস্তাব এসেছে, এটা করতে পারলে ভালো। ক্ষমতাসীনরা এটা কখনও চাইবে না। কিন্তু এটাকে যদি নির্বাচনের ট্যাগ দেওয়া হয়, তা হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। বিষয়টি আলোচনার প্রস্তাবে রেখে অনড় অবস্থান বদলানো উচিত। – ড. সাব্বির আহমেদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘সাংবিধানিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়া অত্যন্ত দুরূহ, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ – ড. বদিউল আলম মজুমদার, সদস্য, ঐকমত্য কমিশন

 

রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠনের প্রয়াসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার বৈঠক চলছে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে। কমিশনের লক্ষ্য একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করা, যা হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিতর্কমুক্ত। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ মৌলিক অনেক বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কিছু বিষয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দল আপত্তি তুলেছে। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ একে ‘বাস্তবতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, সব বিষয়ে ঐকমত্য সম্ভব নয়, এটা কখনোই আমাদের লক্ষ্য ছিল না। আবার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সাংবিধানিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়া অত্যন্ত দুরূহ, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি জবাবদিহিমূলক ও সংস্কারভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। কিন্তু এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় শর্ত যুক্ত করার প্রবণতা রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগের কারণ হয়েছে। সরকার ও বিএনপির মধ্যে সম্প্রতি কিছু বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে নয় বরং শর্ত আরোপ করে কিছু আদায় করতে চাইলে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে যে প্রস্তাব এসেছে, এটা করতে পারলে ভালো। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্যবাদ দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই ক্ষমতাসীনরা এটা কখনও চাইবে না। কিন্তু এটাকে যদি নির্বাচনের ট্যাগ দেওয়া হয়, তা হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। বিষয়টি আলোচনার প্রস্তাবে রেখে অনড় অবস্থান বদলানো উচিত। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও মত দিয়েছেন, এই সংস্কারগুলো হওয়া উচিত হলেও এগুলো চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। বিএনপিসহ অনেক দলের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও আমরা চাই, সবকিছু আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হোক।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঘোষিত হয়, সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হলে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন হতে পারে। তবে একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের মাধ্যমে এমন ঘোষণাকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এই আলোচনার পরও নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও পরিষ্কার কোনো রোডম্যাপ প্রকাশ না করায় নির্বাচনী অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঐ বৈঠকের এক মাস পার হলেও সরকারিভাবে নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ জানানো হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়নি।
এ অবস্থায় নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজের বৈঠকের পর। লন্ডন ঘোষণার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা কয়েকটি সংস্কারের বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। সেখানে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে কোনো দল চাইলেই যাতে সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলতে না পারে, সে ধরনের বিধান এবং নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। এসব সংস্কার নিশ্চিত করেই নির্বাচন করার পক্ষে মত দেন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের কয়েক দফা আলোচনা হলেও এ পর্যন্ত ঐকমত্য হয়নি। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের আপত্তি আছে। এটি নির্বাচন বিলম্বিত করার নতুন তত্ত্ব কিনা, এ নিয়েও বিতর্ক চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড় দিয়ে হলেও ঐকমত্যের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে পুরো আলোচনাকেই অর্থহীন করা হচ্ছে কিনা- এমন শঙ্কাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।
নানা মতভেদ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় আন্তরিকতা দেখাচ্ছে, এমনটাই জানিয়েছেন কমিশনের নেতারা। অধ্যাপক আলী রীয়াজের ভাষায়, দলগুলো একে অপরের মতামত শুনছে, যুক্তি দিচ্ছে, আপোসের পথ খুঁজছে এটাই ইতিবাচক। আমরা আশা করি, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সনদে স্বাক্ষর সম্ভব হবে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সংস্কারের শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তা যেন নির্বাচনের বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। একে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা নির্বাচনের পূর্বশর্ত হতে পারে না। যথাসময়ে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া জরুরি। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ দফায় কমিশনের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে আসতে পেরেছে। এটা খুবই ইতিবাচক। তবে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, সংবিধান যাতে কথায় কথায় পরিবর্তন করার সুযোগ না থাকে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। আসলে সাংবিধানিক মৌলিক বিষয়ের সংস্কারে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়া খুব দুরূহ ব্যাপার। তারপরও কমিশন দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গত বছরের অক্টোবর সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব কমিশনের মধ্যে জনপ্রশাসন ছাড়া বাকি পাঁচ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাদের দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা।
সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই কমিশনের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ আগস্ট। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রথম ধাপের কার্যক্রম শুরু করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর কমিশনগুলোর ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চাওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৩৩টি দল কমিশনকে মতামত জানায়। গত ২৬ মে সংবাদ সম্মেলনে প্রথম ধাপের আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
তিনি জানান, প্রথম দফায় কমিশন ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি বৈঠক করেছে। আলোচনার সুবিধার্থে কয়েকটি দলের সঙ্গে একাধিক দিনও বৈঠক করেছে কমিশন। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অনেক বিষয়েই দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য ছিল। এরপর সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে গত ২ জুন রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে দ্বিতীয় ধাপের বৈঠকের উদ্বোধন করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ৩ জুন থেকে শুরু হয় বৈঠক।