১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

১৬ জুলাইয়ের বিভীষিকায় শহীদ ওয়াসিম-শান্ত-ফারুকের রক্তে রাঙলো চট্টগ্রামের রাজপথ

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। এ দিন ঘাতকের বুলেটের আঘাতে চট্টগ্রামের রাজপথ শিক্ষার্থীদের রক্তে প্রথমবারের মত রঞ্জিত হয়। ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ)-যুবলীগের সশস্ত্র হামলায় শহীদ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও দোকান কর্মচারী ফারুক। এই তিন প্রাণের বিনিময়ে সেদিন থেকে চট্টগ্রামে আন্দোলন চূড়ান্ত রুপ নেয়।
এক বছর আগের এই দিন বিকেল ৩টায় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নগরের ষোলশহর রেলস্টেশনে বিক্ষোভ সমাবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু সকাল থেকেই নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে কয়েকশ ছাত্রলীগকর্মী রেলস্টেশনে অবস্থান নেন। এসময় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের হুমকি ধামকি দিতে থাকেন।
ফলে শিক্ষার্থীরা ওইদিন অবস্থান পরিবর্তন করে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। বিকেল তিনটার কিছু পর হটাৎ করেই নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে স্টেশন এলাকা থেকে মুরাদপুরের দিকে যেতে থাকে। সেই মিছিল থেকে সাড়ে তিনটা নাগাদ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পাথর নিক্ষেপ, গুলি এবং ককটেল বিস্ফোরণ। বিকেল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন  ঘণ্টা চলে এ সংঘর্ষ। পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
সেই কথা স্মরণ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রামের তৎকালী সমন্বয়কদের অন্যতম মশিউর রহমান বলেন, ‘১৫ তারিখে প্রথম প্রতিরোধের পর নুরুল আজিম রনিসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে ‘মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’–এ ধরনের পোস্ট দিতে শুরু করে।’
‘ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রের ছবি তুলে আমাদের ইনবক্সে পাঠাতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আমরা যাতে ভয় পেয়ে ষোলশহরে আর না যাই। কিন্তু আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ছাত্রলীগ হামলা করতে এলে জোরালোভাবে প্রতিরোধ করা হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, ‌‌‘শিক্ষার্থীরা শান্তিপুর্ণভাবেই মুরাদপুর মোড় ও রেলগেট এলাকায় অবস্থান করছিলো। বিনা উস্কানিতেই ছাত্রলীগ আমাদের ওপর অস্ত্রসহ হামলা চালায়। জবাবে শিক্ষার্থীরাও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।’
প্রথম হামলাতে শিক্ষার্থীরা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁরা গুছিয়ে উঠে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেন। কিন্তু সেই সময় গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনা স্থালে হাজির হয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। এসময় তাদের গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী ওয়াসিম, শান্ত ও দোকান কর্মচারী ফারুক। রক্তে লেখা হয় নতুন ইতিহাস।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, সেদিনের ছবি ও ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর প্রকাশ্যে পিস্তল হাতে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর।
বাবরের সঙ্গে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, যুবলীগ নেতা মেজবাহ উদ্দিন নোবেলের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি গ্রুপ হামলায় অংশ নেয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র হাতে গুলি ছুঁড়েন অন্তত ১০ জন। তাদের অন্যতম হলো- যুবলীগের কর্মী মো. ফিরোজ, মোহাম্মদ জাফর, এইচ এম মিঠু, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মো. দেলোয়ার, ছাত্রলীগ নেতা আহনাফ।ফিরোজ রিভলবার নিয়ে এবং দেলোয়ার ও আহনাফ শটগান দিয়ে এবং মিঠু, জাফরসহ বাকিরা পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়েন।
হামলা চলাকালে সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ আলী।
তিনি বলেন, “আমরা শুরু থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলাম। একাংশ মুরাদপুর মোড়ে আরেকাংশ রেললাইনের দিকে। হামলার শুরুতে মুরাদপুরের অংশ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করতে করতে বহদ্দারহাটের দুই ফ্লাইওভারের মাঝখানে অবস্থান নেই। আরেক অংশ রেললাইন থেকে এসে হামলা প্রতিহত করে, সেখানেই শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত যুবলীগ ক্যাডারদের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।”
“অপরদিকে আমরা বহদ্দারহাটের দুই ফ্লাইওভারের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ চালাতে থাকি।  এসময় শিবিরের মহনগর উত্তররে তৎকালীন সেক্রেটারি তানজিল জুয়েল ভাইয়ের নেতৃত্ব একটা গ্রুপ আমাদের সাথে যুক্ত হন, এরপর মুরাদপুরও দখলে নেয় ছাত্র জনতা,” যোগ করেন।
কিন্তু এর আগেই শাহাদাত বরণ করেন আরও দুই জন, ওয়াসিম ও ফারুক। সন্তান হারানোর এক বছর আজ ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুকের পরিবারের।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আকরাম (২৪)। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আকস্মিক সন্তান হারানোর আঘাত সইতে না পেরে শোকস্তব্ধ ওয়াসিমের মা হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, একবছর ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী তিনি।
সৌদি আরবের কর্মস্থল থেকে দেশে এসে আর ফিরতে পারেননি ওয়াসিমের বাবা শফি আলম। আর ছোট দুই বোনের স্মৃতিতে ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ভেসে উঠলে এখনো চোখের জল সংবরণ করতে পারেন না।
ওয়াসিমের বাবা শফি আলম বলেন, ‌‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, সেটা যে সন্তান হারিয়েছে শুধু সে-ই বুঝবে। মা হারিয়েছি, দুই মাস পর ছেলেকেও হারিয়েছি। আমি ওয়াসিম সহ সকল হত্যার বিচার চাই।’
‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ভাই হারানোর যন্ত্রণা আমার অন্য সন্তানদের মধ্যে। কেউ আমাকে ছাড়তে চায় না। বাকি জীবনটা তাদের বুকে আগলে রেখেই কাটিয়ে দিতে চাই,’ তিনি বলেন।
সেদিনের আরেক শহীদ শিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা আছে- ‘যে হৃদয় শাহাদাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করে, সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না।’ শান্ত নেই, কিন্তু সেই লেখা এখনো রয়ে গেছে।
শহীদ শান্ত’র মা কোহিনূর বেগম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘আমার ছেলে আমার বুকের ধন ছিল। আমার ছেলের কষ্ট হবে, এজন্য আমি শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাকে কোনো কাজে হাত দিতে দিতাম না।’
‘ছেলেটাকে ছেড়ে আমাকে একটা বছর কাটাতে হচ্ছে, সারাজীবন কাটাতে হবে, এ দুঃখ আমি কীভাবে সইব!,’ তিনি বলেন।
শান্তকে নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণের কথাও বললেন তিনি। ‘১৬ জুলাই ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম, ফারুক এই তিনজনই শহিদ হন। উনাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যিনি মেয়র হয়েছেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শাহাদাত সাহেব, তিনি সবসময় ওয়াসিমের কথা বলেন শুধু, বাকি দুজনের কথা বলেনই না। আমি মনে করি, এটা একটা বৈষম্য!’
সেদিন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলায় শহীদ হন দোকান কর্মচারী ফারুক (৩২)। মুরাদপুরে কর্মস্থলে ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
তাঁর স্ত্রী সীমা আক্তার স্বামীর মৃত্যুতে আজও শোকে স্তব্ধ। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী তো নেই এক বছর। এখনো মানুষের প্রাণ ঝরছে। আর কত নিরীহ মানুষের প্রাণ যাবে। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’
জনপ্রিয় সংবাদ

১৬ জুলাইয়ের বিভীষিকায় শহীদ ওয়াসিম-শান্ত-ফারুকের রক্তে রাঙলো চট্টগ্রামের রাজপথ

আপডেট সময় : ০৪:১৪:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। এ দিন ঘাতকের বুলেটের আঘাতে চট্টগ্রামের রাজপথ শিক্ষার্থীদের রক্তে প্রথমবারের মত রঞ্জিত হয়। ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ)-যুবলীগের সশস্ত্র হামলায় শহীদ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও দোকান কর্মচারী ফারুক। এই তিন প্রাণের বিনিময়ে সেদিন থেকে চট্টগ্রামে আন্দোলন চূড়ান্ত রুপ নেয়।
এক বছর আগের এই দিন বিকেল ৩টায় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নগরের ষোলশহর রেলস্টেশনে বিক্ষোভ সমাবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু সকাল থেকেই নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে কয়েকশ ছাত্রলীগকর্মী রেলস্টেশনে অবস্থান নেন। এসময় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের হুমকি ধামকি দিতে থাকেন।
ফলে শিক্ষার্থীরা ওইদিন অবস্থান পরিবর্তন করে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। বিকেল তিনটার কিছু পর হটাৎ করেই নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে স্টেশন এলাকা থেকে মুরাদপুরের দিকে যেতে থাকে। সেই মিছিল থেকে সাড়ে তিনটা নাগাদ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পাথর নিক্ষেপ, গুলি এবং ককটেল বিস্ফোরণ। বিকেল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন  ঘণ্টা চলে এ সংঘর্ষ। পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
সেই কথা স্মরণ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রামের তৎকালী সমন্বয়কদের অন্যতম মশিউর রহমান বলেন, ‘১৫ তারিখে প্রথম প্রতিরোধের পর নুরুল আজিম রনিসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে ‘মেরে ফেলব, কেটে ফেলব’–এ ধরনের পোস্ট দিতে শুরু করে।’
‘ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রের ছবি তুলে আমাদের ইনবক্সে পাঠাতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আমরা যাতে ভয় পেয়ে ষোলশহরে আর না যাই। কিন্তু আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ছাত্রলীগ হামলা করতে এলে জোরালোভাবে প্রতিরোধ করা হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, ‌‌‘শিক্ষার্থীরা শান্তিপুর্ণভাবেই মুরাদপুর মোড় ও রেলগেট এলাকায় অবস্থান করছিলো। বিনা উস্কানিতেই ছাত্রলীগ আমাদের ওপর অস্ত্রসহ হামলা চালায়। জবাবে শিক্ষার্থীরাও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।’
প্রথম হামলাতে শিক্ষার্থীরা কিছুটা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁরা গুছিয়ে উঠে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেন। কিন্তু সেই সময় গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনা স্থালে হাজির হয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। এসময় তাদের গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী ওয়াসিম, শান্ত ও দোকান কর্মচারী ফারুক। রক্তে লেখা হয় নতুন ইতিহাস।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, সেদিনের ছবি ও ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর প্রকাশ্যে পিস্তল হাতে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর।
বাবরের সঙ্গে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, যুবলীগ নেতা মেজবাহ উদ্দিন নোবেলের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি গ্রুপ হামলায় অংশ নেয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র হাতে গুলি ছুঁড়েন অন্তত ১০ জন। তাদের অন্যতম হলো- যুবলীগের কর্মী মো. ফিরোজ, মোহাম্মদ জাফর, এইচ এম মিঠু, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মো. দেলোয়ার, ছাত্রলীগ নেতা আহনাফ।ফিরোজ রিভলবার নিয়ে এবং দেলোয়ার ও আহনাফ শটগান দিয়ে এবং মিঠু, জাফরসহ বাকিরা পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়েন।
হামলা চলাকালে সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ আলী।
তিনি বলেন, “আমরা শুরু থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলাম। একাংশ মুরাদপুর মোড়ে আরেকাংশ রেললাইনের দিকে। হামলার শুরুতে মুরাদপুরের অংশ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করতে করতে বহদ্দারহাটের দুই ফ্লাইওভারের মাঝখানে অবস্থান নেই। আরেক অংশ রেললাইন থেকে এসে হামলা প্রতিহত করে, সেখানেই শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত যুবলীগ ক্যাডারদের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।”
“অপরদিকে আমরা বহদ্দারহাটের দুই ফ্লাইওভারের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ চালাতে থাকি।  এসময় শিবিরের মহনগর উত্তররে তৎকালীন সেক্রেটারি তানজিল জুয়েল ভাইয়ের নেতৃত্ব একটা গ্রুপ আমাদের সাথে যুক্ত হন, এরপর মুরাদপুরও দখলে নেয় ছাত্র জনতা,” যোগ করেন।
কিন্তু এর আগেই শাহাদাত বরণ করেন আরও দুই জন, ওয়াসিম ও ফারুক। সন্তান হারানোর এক বছর আজ ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুকের পরিবারের।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আকরাম (২৪)। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
আকস্মিক সন্তান হারানোর আঘাত সইতে না পেরে শোকস্তব্ধ ওয়াসিমের মা হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, একবছর ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী তিনি।
সৌদি আরবের কর্মস্থল থেকে দেশে এসে আর ফিরতে পারেননি ওয়াসিমের বাবা শফি আলম। আর ছোট দুই বোনের স্মৃতিতে ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ভেসে উঠলে এখনো চোখের জল সংবরণ করতে পারেন না।
ওয়াসিমের বাবা শফি আলম বলেন, ‌‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, সেটা যে সন্তান হারিয়েছে শুধু সে-ই বুঝবে। মা হারিয়েছি, দুই মাস পর ছেলেকেও হারিয়েছি। আমি ওয়াসিম সহ সকল হত্যার বিচার চাই।’
‘আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ভাই হারানোর যন্ত্রণা আমার অন্য সন্তানদের মধ্যে। কেউ আমাকে ছাড়তে চায় না। বাকি জীবনটা তাদের বুকে আগলে রেখেই কাটিয়ে দিতে চাই,’ তিনি বলেন।
সেদিনের আরেক শহীদ শিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা আছে- ‘যে হৃদয় শাহাদাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করে, সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না।’ শান্ত নেই, কিন্তু সেই লেখা এখনো রয়ে গেছে।
শহীদ শান্ত’র মা কোহিনূর বেগম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘আমার ছেলে আমার বুকের ধন ছিল। আমার ছেলের কষ্ট হবে, এজন্য আমি শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাকে কোনো কাজে হাত দিতে দিতাম না।’
‘ছেলেটাকে ছেড়ে আমাকে একটা বছর কাটাতে হচ্ছে, সারাজীবন কাটাতে হবে, এ দুঃখ আমি কীভাবে সইব!,’ তিনি বলেন।
শান্তকে নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণের কথাও বললেন তিনি। ‘১৬ জুলাই ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম, ফারুক এই তিনজনই শহিদ হন। উনাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যিনি মেয়র হয়েছেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শাহাদাত সাহেব, তিনি সবসময় ওয়াসিমের কথা বলেন শুধু, বাকি দুজনের কথা বলেনই না। আমি মনে করি, এটা একটা বৈষম্য!’
সেদিন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলায় শহীদ হন দোকান কর্মচারী ফারুক (৩২)। মুরাদপুরে কর্মস্থলে ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
তাঁর স্ত্রী সীমা আক্তার স্বামীর মৃত্যুতে আজও শোকে স্তব্ধ। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী তো নেই এক বছর। এখনো মানুষের প্রাণ ঝরছে। আর কত নিরীহ মানুষের প্রাণ যাবে। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’