খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় এক আদিবাসী কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে এবং ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ (বুধবার) রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের (এইচডব্লিউএফ) যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি সকাল ১১টায় শহরের কুমার সমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে শুরু হয়। মিছিলটি জিমনেসিয়াম থেকে শুরু হয়ে ডিসি অফিস হয়ে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। বক্তৃতায় উঠে আসে, ভাইবোনছড়ায় নিজ বাড়িতে ছয়জন সেটেলার বাঙালির দ্বারা কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয় এবং পরবর্তীতে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মেয়েটি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। চারজন ধর্ষক গ্রেফতার হলেও বাকি দুইজন এখনো পলাতক।
সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক অন্তর চাকমা বলেন, “গ্রেফতার হওয়া ধর্ষকদের মুখে কোনো অপরাধবোধ ছিল না—তাদের হাসি বিচারহীনতারই প্রতিচ্ছবি।” তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বারবার আদিবাসী নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা চালানো হলেও কোনো ঘটনারই সুবিচার হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং প্রশাসন অনেকক্ষেত্রে অপরাধীদের রক্ষা করে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “গতকাল খাগড়াছড়িতে ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আটক ও মারধর করেছে। আমরা এই বর্বর আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।”
সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা বলেন, “এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নীতিরই অংশ।” তিনি বলেন, বান্দরবানে ম্রো শিশুদের ধর্মান্তরের চেষ্টা, কেএনএফ অভিযানের নামে নিরীহ গ্রামবাসীদের নিপীড়ন, এবং ভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত জাতিসত্তা ধ্বংসের চক্রান্ত।
তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, “যদি সরকার ধর্ষকদের বিচার না করে এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ না করে, তাহলে জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজ আর চুপ থাকবে না। প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত।”
এইচডব্লিউএফ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলছে। আজ আদিবাসী নারী-পুরুষ কেউই নিরাপদ নয়। আমাদের অস্তিত্ব আজ চরম সংকটে।”
তিনি বলেন, “জুম্ম জনগণকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন আরও সুসংগঠিত করতে হবে। ন্যায়বিচার ও মর্যাদার জন্য আমাদের লড়াই চলবেই।”
সমাবেশে বিএমএসসি রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ক্যচিংনু মারমা বলেন, “ভাইবোনছড়ার ঘটনাটিও হয়তো অন্যান্য ঘটনার মতোই বিচারহীনতায় হারিয়ে যাবে। অথচ ছাত্ররা যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে নামে, তখন সেনাবাহিনী তাদের লাঠিচার্জ করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কারা এসব অপরাধের পৃষ্ঠপোষক।”
তিনি বলেন, “এইসব অপরাধের বিচার করুন, নচেত পাহাড়ের ছাত্র সমাজ কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।”
সমাবেশের সঞ্চালনায় ছিলেন পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক মিলন চাকমা। সভাপতিত্ব করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ) রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক কবিতা চাকমা।
বক্তারা অবিলম্বে ধর্ষকদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান।























