০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জনবহুল আকাশে ফাইটার জেট নিয়ে প্রশ্ন

  • ঢাকায় যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণ, শঙ্কিত নগরবাসী
  • আইকাও’র নির্দেশনা মানছে না কর্তৃপক্ষ
  • পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড পড়ে আছে অযত্নে

‘স্বাধীনতার পর গত ৫৪-৫৫ বছরে আমাদের দেশে কোনো নতুন বিমানবন্দর হয়নি। যেগুলো ছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেত।’ – কাজী ওয়াহিদুল আলম, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ

ঢাকার আকাশে নিয়মিত গর্জন তুলে উড়ে চলে যুদ্ধবিমান। মিরপুর, তেজগাঁও, উত্তরা কিংবা আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ বলতে গেলে এই জনবহুল আকাশই যেন একমাত্র ভরসা। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে একাধিক পরিত্যক্ত ও অপ্রচলিত এয়ারফিল্ড যেগুলো সামান্য সংস্কারে হয়ে উঠতে পারে আধুনিক প্রশিক্ষণের উপযুক্ত স্থান। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে কেন ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ প্রশিক্ষণ এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ফাইটার জেট বা প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ব্যবহার করে। একই রানওয়ে দিয়ে বাণিজ্যিক বিমানও ওঠানামা করে। এমন ব্যবস্থার নজির পৃথিবীর কোথাও নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও)-এর অ্যানেক্স-১৪ পরিশিষ্টে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জনবহুল এলাকা নয় বরং জনবিরল ও গ্রামীণ অঞ্চল উপযুক্ত। শব্দদূষণ, দুর্ঘটনা বা নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় ধরনের প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকায় এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নীতিমালাতেও একই সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিহত হয়। দগ্ধ ও আহত হয় আরও অনেকে। এই করুণ ঘটনার পর ঢাকায় প্রশিক্ষণ পরিচালনা নিয়ে শুরু হয় দেশজুড়ে সমালোচনা। ঘটনার পরপরই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থী ও স্বজনরা। তারা বলেন, পৃথিবীর কোথাও এত জনবহুল এলাকায় বিমান প্রশিক্ষণ হয় না। আমাদের প্রাণ দিতে হবে কেন? এ ঘটনায় নিহত বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম শেষ মুহূর্তে বিমানটিকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। তার এই আত্মত্যাগ বহু প্রাণ বাঁচালেও, প্রশ্ন রয়ে যায় এই প্রশিক্ষণ কি ঢাকার বাইরে দেওয়া যেত না?
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ছয়টি পুরোনো এবং পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ বা এয়ারফিল্ড রয়েছে, যেখানে নিয়মিত কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক কার্যক্রম নেই। অথচ অল্প মেরামতেই সেগুলো প্রশিক্ষণ উপযোগী করা যেত বলে মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। এগুলোর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ঈশ্বরদী এয়ারফিল্ড। পাবনা-নাটোর সীমান্তে অবস্থিত এই বিমানবন্দর থেকে একসময় বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করত। তবে ২০১৪ সালে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটিকে সীমিতভাবে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। এর ৪ হাজার ৭০০ ফুটের রানওয়ে থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ১৯৪০ সালের ঠাকুরগাঁও এয়ারফিল্ডটি আজ থেকে ৪৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এই এয়ারফিল্ডে রানওয়ে ছিল, গ্রাস স্ট্রিপ ও প্লেন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও ছিল। তবে ১৯৭১ সালে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আর সংস্কার করা হয়নি। এরপর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। এটিও সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের জন্য উপযোগী করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশিক্ষণের জন্য কুমিল্লা এয়ারস্ট্রিপও অন্যতম একটি জায়গা হতে পারে বলে মত তাদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত হয় এই এয়ারস্ট্রিপ। এর মাধ্যমে জাপানি বিমান পাহারা দেওয়ার জন্য আমেরিকার কিছু যুদ্ধবিমান ওঠানামা করত। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইট চালু হলে কুমিল্লা বিমানবন্দর দিয়ে অনেক যাত্রী ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর কুমিল্লা বিমানবন্দর থেকে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই এই এয়ারস্ট্রিপ শুধু ইতিহাসে এবং সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্তে পাওয়া যায়। পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা আরেক এয়ারফিল্ড লালমনিরহাট বিমানবন্দর। একসময় এটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানঘাঁটি ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ অ্যারোস্পেস অ্যান্ড অ্যাভিয়েশন ইউনিভার্সিটি এখানে সীমিতভাবে কার্যক্রম চালালেও ফাইটার বা প্রশিক্ষণ বিমান চালানো হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি এই বিমানবন্দরটি ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনীর বেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফেনী এয়ারফিল্ড। এয়ারফিল্ডের ৪৮ একর জায়গার ওপর একটি রানওয়ে হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ২০০৬ সালে ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করা হয়। বাকি অংশ এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।
এদিকে, বিমান প্রশিক্ষণ কোথায় হবে তা নতুন করে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করেন নৌপরিবহন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য সব সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলব, এ ধরনের ট্রেনিং কোথায়, কী করলে, কোন চ্যানেলে করতে হবে সেটা নতুন করে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা শহর ঘনবসতিপূর্ণ। যেকোনো কিছুতে একটা ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে। বিমান নানা কারণে বিধ্বস্ত হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কারণ টেকনিক্যাল এরর ও পাইলট এরর। যদিও উড়োজাহাজগুলো পুরোনো। এগুলো ট্রেনিং জেট। আমার জানামতে এগুলো পুরোনো হলেও ভেতরের অ্যাম্বিয়েন্ট ও কম্পোনেন্ট আপডেট করা হয়। এখন এটার ব্ল্যাকবক্স অ্যানালাইসিস না করা পর্যন্ত বোঝা যাবে না এটা কি টেকনিক্যাল এরর নাকি পাইলট এরর।
প্রশিক্ষণ এলাকা নির্বাচন নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ঢাকার বাইরে বিমানবন্দর নির্মাণ করা খুবই প্রয়োজন। ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণে বিমান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিধ্বস্ত হলে হতাহতের সংখ্যা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, যার প্রমাণ উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রশিক্ষণের বিমান বিধ্বস্ত হওয়া। নানা মহল থেকে এসব প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে করার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে উদ্যোগ নেওয়া। স্বাধীনতার পর গত ৫৪-৫৫ বছরে আমাদের দেশে কোনো নতুন বিমানবন্দর হয়নি। যেগুলো ছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেত।

জনপ্রিয় সংবাদ

জনবহুল আকাশে ফাইটার জেট নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৭:২৫:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫
  • ঢাকায় যুদ্ধবিমানের প্রশিক্ষণ, শঙ্কিত নগরবাসী
  • আইকাও’র নির্দেশনা মানছে না কর্তৃপক্ষ
  • পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড পড়ে আছে অযত্নে

‘স্বাধীনতার পর গত ৫৪-৫৫ বছরে আমাদের দেশে কোনো নতুন বিমানবন্দর হয়নি। যেগুলো ছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেত।’ – কাজী ওয়াহিদুল আলম, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ

ঢাকার আকাশে নিয়মিত গর্জন তুলে উড়ে চলে যুদ্ধবিমান। মিরপুর, তেজগাঁও, উত্তরা কিংবা আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ বলতে গেলে এই জনবহুল আকাশই যেন একমাত্র ভরসা। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে একাধিক পরিত্যক্ত ও অপ্রচলিত এয়ারফিল্ড যেগুলো সামান্য সংস্কারে হয়ে উঠতে পারে আধুনিক প্রশিক্ষণের উপযুক্ত স্থান। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে কেন ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ প্রশিক্ষণ এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ফাইটার জেট বা প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ব্যবহার করে। একই রানওয়ে দিয়ে বাণিজ্যিক বিমানও ওঠানামা করে। এমন ব্যবস্থার নজির পৃথিবীর কোথাও নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও)-এর অ্যানেক্স-১৪ পরিশিষ্টে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জনবহুল এলাকা নয় বরং জনবিরল ও গ্রামীণ অঞ্চল উপযুক্ত। শব্দদূষণ, দুর্ঘটনা বা নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় ধরনের প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকায় এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নীতিমালাতেও একই সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিহত হয়। দগ্ধ ও আহত হয় আরও অনেকে। এই করুণ ঘটনার পর ঢাকায় প্রশিক্ষণ পরিচালনা নিয়ে শুরু হয় দেশজুড়ে সমালোচনা। ঘটনার পরপরই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থী ও স্বজনরা। তারা বলেন, পৃথিবীর কোথাও এত জনবহুল এলাকায় বিমান প্রশিক্ষণ হয় না। আমাদের প্রাণ দিতে হবে কেন? এ ঘটনায় নিহত বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম শেষ মুহূর্তে বিমানটিকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। তার এই আত্মত্যাগ বহু প্রাণ বাঁচালেও, প্রশ্ন রয়ে যায় এই প্রশিক্ষণ কি ঢাকার বাইরে দেওয়া যেত না?
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ছয়টি পুরোনো এবং পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ বা এয়ারফিল্ড রয়েছে, যেখানে নিয়মিত কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক কার্যক্রম নেই। অথচ অল্প মেরামতেই সেগুলো প্রশিক্ষণ উপযোগী করা যেত বলে মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। এগুলোর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে ঈশ্বরদী এয়ারফিল্ড। পাবনা-নাটোর সীমান্তে অবস্থিত এই বিমানবন্দর থেকে একসময় বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করত। তবে ২০১৪ সালে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটিকে সীমিতভাবে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। এর ৪ হাজার ৭০০ ফুটের রানওয়ে থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ১৯৪০ সালের ঠাকুরগাঁও এয়ারফিল্ডটি আজ থেকে ৪৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এই এয়ারফিল্ডে রানওয়ে ছিল, গ্রাস স্ট্রিপ ও প্লেন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও ছিল। তবে ১৯৭১ সালে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আর সংস্কার করা হয়নি। এরপর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। এটিও সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের জন্য উপযোগী করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশিক্ষণের জন্য কুমিল্লা এয়ারস্ট্রিপও অন্যতম একটি জায়গা হতে পারে বলে মত তাদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত হয় এই এয়ারস্ট্রিপ। এর মাধ্যমে জাপানি বিমান পাহারা দেওয়ার জন্য আমেরিকার কিছু যুদ্ধবিমান ওঠানামা করত। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইট চালু হলে কুমিল্লা বিমানবন্দর দিয়ে অনেক যাত্রী ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর কুমিল্লা বিমানবন্দর থেকে সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই এই এয়ারস্ট্রিপ শুধু ইতিহাসে এবং সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্তে পাওয়া যায়। পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা আরেক এয়ারফিল্ড লালমনিরহাট বিমানবন্দর। একসময় এটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানঘাঁটি ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ অ্যারোস্পেস অ্যান্ড অ্যাভিয়েশন ইউনিভার্সিটি এখানে সীমিতভাবে কার্যক্রম চালালেও ফাইটার বা প্রশিক্ষণ বিমান চালানো হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি এই বিমানবন্দরটি ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনীর বেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফেনী এয়ারফিল্ড। এয়ারফিল্ডের ৪৮ একর জায়গার ওপর একটি রানওয়ে হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ২০০৬ সালে ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করা হয়। বাকি অংশ এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।
এদিকে, বিমান প্রশিক্ষণ কোথায় হবে তা নতুন করে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করেন নৌপরিবহন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য সব সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলব, এ ধরনের ট্রেনিং কোথায়, কী করলে, কোন চ্যানেলে করতে হবে সেটা নতুন করে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা শহর ঘনবসতিপূর্ণ। যেকোনো কিছুতে একটা ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে। বিমান নানা কারণে বিধ্বস্ত হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কারণ টেকনিক্যাল এরর ও পাইলট এরর। যদিও উড়োজাহাজগুলো পুরোনো। এগুলো ট্রেনিং জেট। আমার জানামতে এগুলো পুরোনো হলেও ভেতরের অ্যাম্বিয়েন্ট ও কম্পোনেন্ট আপডেট করা হয়। এখন এটার ব্ল্যাকবক্স অ্যানালাইসিস না করা পর্যন্ত বোঝা যাবে না এটা কি টেকনিক্যাল এরর নাকি পাইলট এরর।
প্রশিক্ষণ এলাকা নির্বাচন নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ঢাকার বাইরে বিমানবন্দর নির্মাণ করা খুবই প্রয়োজন। ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণে বিমান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিধ্বস্ত হলে হতাহতের সংখ্যা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, যার প্রমাণ উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রশিক্ষণের বিমান বিধ্বস্ত হওয়া। নানা মহল থেকে এসব প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে করার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে উদ্যোগ নেওয়া। স্বাধীনতার পর গত ৫৪-৫৫ বছরে আমাদের দেশে কোনো নতুন বিমানবন্দর হয়নি। যেগুলো ছিল সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেত।