পাহাড়ি জনপদ রাজস্থলীর বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ধুলিয়া মুসলিম পাড়ার মানুষের জীবন যেন থমকে আছে একটি রাস্তার দুঃস্বপ্নে। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি কাদা আর পানি মিলে রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় মরণফাঁদে। যেখানে গর্ত, খানাখন্দ আর পিচ্ছিল কাদার মধ্যে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার চেষ্টায় পড়ে থাকা শিশুর কান্না, অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা ভ্যানগাড়ির যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে যেন এক নীরব চিৎকার।
এই একটি রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করেন। এটি একদিকে বাজার, স্কুল, কলেজ ও স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানোর একমাত্র সংযোগ—অন্যদিকে মানুষের জীবিকার পথও। ধুলিয়া পাড়ার কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে প্রতিদিন এই রাস্তায় পাড়ি জমান বাঙ্গালহালিয়া বাজারসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়। কিন্তু রাস্তার বেহাল দশায় ফসল পৌঁছাতে দেরি হয়, নষ্ট হয় পণ্যের গুণগত মান, ভেঙে পড়ে জনজীবন ও অর্থনীতি।
বৃষ্টিতে রাস্তায় হাঁটু সমান পানি, পায়ে হেঁটে চলাও দুঃসাধ্য
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তায় জমে ওঠে হাঁটুপানি। পায়ে হেঁটে চলাও হয়ে পড়ে দুঃসাধ্য। খানাখন্দে পড়ে গিয়ে আহত হন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশুরা, গর্ভবতী নারী কিংবা রোগীবাহী যানবাহনের চালকরা। কাদার ভেতর থেকে ধ্বসে পড়ে রাস্তার প্রান্ত, কোথাও কোথাও ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় বড় গর্ত—যা অনেক সময় প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জায়গায় কাদার স্তর উঠে রাস্তার আসল মাটি বেরিয়ে পড়েছে। কোথাও পাথর নেই, কোথাও নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। জল জমে থেকে নষ্ট হয় রাস্তার অবকাঠামো।
অর্ধেক রাস্তা হয়েছে, বাকিটা ‘বছরের পর বছর’ পড়ে আছে অবহেলায়
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে কয়েক বছর আগে রাস্তাটির অর্ধেক অংশে উন্নয়নকাজ হলেও বাকি অংশে আর কোনো কাজ হয়নি। সেই সময় থেকে বছরের পর বছর কেটে গেলেও রাস্তাটি আর সংস্কার হয়নি। অথচ এলাকার চাহিদা ও ভোগান্তি দিনের পর দিন বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি—এই রাস্তাটিকে পরিণত করেছে দুর্ভোগের প্রতীকে।
শিক্ষার্থীরা বলছে—প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছাতে কাপড় ভিজে যায়, বই নষ্ট হয়
এই রাস্তা দিয়েই চলাচল করে ধুলিয়া পাড়ার শত শত শিক্ষার্থী। বৃষ্টি হলে তারা হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায়, জামাকাপড় ও বইপত্র কাদা পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তাদের ক্লাসে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে। অভিভাবকেরা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু করণীয় কিছুই নেই।
রোগী আনা-নেওয়া সবচেয়ে বড় সংকটে
ধুলিয়া পাড়ার কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন রোগী আসেন। কিন্তু অনেক সময় সিএনজি, ভ্যান বা মোটরসাইকেলে করে রোগী আনতে গিয়ে কাদার কারণে রাস্তায় আটকে পড়ে যান। স্থানীয়রা বলছেন, একজন প্রসূতি নারীকে ভ্যানে করে আনার সময় কাদায় আটকে গিয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
চেয়ারম্যানের প্রতিশ্রুতি, এলাকাবাসীর হতাশা
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আদোমং মারমা বলেন,
“বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বৃষ্টি কমলে দ্রুত সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হবে।”
তবে এলাকাবাসী এই বক্তব্যে খুব বেশি আশ্বস্ত নন। তাদের বক্তব্য, “বছরের পর বছর ধরে আমরা শুনছি কাজ হবে, কিন্তু হচ্ছে না। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি যেভাবে ভয়ংকর হয়ে যায়, তাতে প্রতিদিন আমরা জীবন নিয়ে চলাচল করছি।”
জেলা পরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা
এলাকাবাসীর দাবি, রাস্তাটির নিম্নমানের নির্মাণ, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব মিলিয়ে এটি চলাচলের একেবারে অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এখনই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি ভবিষ্যতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তারা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যেন এই রাস্তাটি সংস্কার করে অন্তত এই একটি মৌলিক যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হয়।
এমআর/সবা




















