- চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত অর্থাৎ ১৩ মাসে নিহত ২২০ জন
- মার্চ থেকে আগস্টে মব সহিংসতা ২৩০টি, নিহত ৭৯ জন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই- ড. তৌহিদুল হক, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা খারাপ হয়েছে- জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
মব সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনা ২৩০টি। আর গত ১৩ মাসে মব তৈরি করে হামলার ঘটনায় প্রাণ গেছে ২২০ জনের। সম্প্রতি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান না নিলে আস্থার সংকট দেখা দেবে, বলছেন বিশ্লেষক।
৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার দরবার শরীফে কয়েক দফা হামলা-ভাঙচুর করে একদল লোক। কবর থেকে মরদেহ তুলেও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত বছরের আগস্ট থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে মব সহিংসতায় দেশে অন্তত ২২০ জন নিহত হয়েছেন, জানায় আইন ও শালিস কেন্দ্র। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বলছে, এ বছর মার্চ থেকে আগস্ট এই ছয় মাসে মব সহিংসতা হয়েছে ২৩০টি। এতে নিহত হয়েছেন ৭৯ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ২৬৫ জন। ভয়েস ফর রিফর্ম এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সমীক্ষা বলছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও স্বীকার করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হয়েছে।
হাতেগোণা মামলা আর গুটিকয়েক গ্রেপ্তারে মব সহিংসতার বিচার নিয়ে জনমনে কাটছে না অনিশ্চয়তা। যদিও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইফুল হক সাইফ বলেন, ‘মব যদি দাঙ্গায় পরিণত হয়, তখন অবশ্যই আইনের প্রতিকার আছে। তবে মব সৃষ্টির মূল কারণ যদি খুঁজে বের করা যায় তাহলে মব থামানো সম্ভব। এ ছাড়া আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে মব সৃষ্টির প্রবণতা এমনিতেই কমে যাবে।’
২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেণু নামে এক নারী হত্যার ঘটনা নিশ্চয় মানুষ এখনো ভোলেনি। ২০১১ সালে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবে বরাতের রাতে ঢাকার অদূরে সাভারের আমিনবাজারে ওই ছয়জন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অথবা ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া এলাকায় ডাকাত সাজিয়ে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও মানুষকে এখনো নাড়া দেয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে জনতার হাতে এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই মিলনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনাগুলো আগের। কিন্তু সম্প্রতি ‘মব জাস্টিস’র নামে যা শুরু হয়েছে তা এরই মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সারাদেশে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মব জাস্টিসের নামে মারামারি, অত্যাচার কিংবা হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। মব জাস্টিস কিংবা গণপিটুনিতে মানুষকে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যেহেতু দেশে একটি বিদ্যমান সরকার আছে, সচেতন সমাজ আছে। যে কোনো কিছুতে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনের সহায়তায় সমস্যা সমাধান করা উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। কিন্তু যারা এসব কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন উদাহরণও দেখা যাচ্ছে না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনায় সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি, আইনের শাসনের প্রতি অনীহা এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরি করতে পারে। যে কোনো মূল্যে এসব ঘটনা ঠেকানো না গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। গণআন্দোলনে হাসিনা সরকার পতনের পর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় একদল মানুষের একজোট হয়ে বিচার করে ফেলার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, যা ‘মব জাস্টিস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলায় যাকে বলা হচ্ছে ‘উন্মত্ত জনতার বিচার’। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরদিন ৬ আগস্ট গভীর রাতে কুমিল্লার তিতাস থানা-পুলিশের দুই সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় উৎসুক জনতা তিতাস থানা ঘেরাও করতে গেলে থানা-পুলিশ আত্মরক্ষার্থে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে কমপক্ষে ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা থানায় পৌঁছে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করেন। পুলিশ সদস্যদের উদ্ধারের পর কিছু মানুষ তিতাস থানা এবং থানার পাশের মার্কেটে অগ্নিসংযোগ করে। থানা পাহারায় থাকা দুই পুলিশ সদস্য জীবন রক্ষার্থে থানার পেছনের ফটক খুলে পালানোর চেষ্টা করেন। লোকজন তাদের পিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন। ৩১ আগস্ট চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গণপিটুনিতে মো. রফিক নামে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়। জানা যায়, ডাকাত সন্দেহে স্থানীয় লোকজন বিএনপি নেতা ও তার সহযোগীদের আটক করে গণপিটুনি দেন। কিছু দিন আগে রাজধানীর শ্যামলীতে ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মী সন্দেহে কয়েকজন নারীকে মারধর করে এইচ এম রাসেল সুলতান নামে এক ব্যক্তি নিজের ফেসবুক আইডিতে ভিডিও প্রকাশ করে। তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার পর সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সংবাদ মেলেনি। কক্সবাজার সৈকতে এক নারীকে হেনস্তার ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

























