০১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাঁচ বছরে আগুনে কাড়ল ৭২০ প্রাণ

  • সারা দেশে সংঘটিত হয়েছে ছোট-বড় দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ড
  • গড়ে প্রতিদিন আগুন লেগেছে ৭০-৭৫টি, উদ্দেশ্যমূলক সহস্রাধিক

‘জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা’
– ইশফাক এলাহি চৌধুরী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক

‘কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে, অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা’
– লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার, পরিচালক, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এতে একদিকে যেমন হতাহতের ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতিও। আগুনের লেলিহান শিখায় নিঃস্ব হচ্ছেন কেউ কেউ। আগুনের ক্ষত দাগ বয়ে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন। আগুনের ভয়াল থাবায় ধ্বংস হচ্ছে বসতঘর, শিল্প প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে সহস্রাধিক। গেল ৫ বছরে বিভিন্ন স্থাপনায় গড়ে প্রতিদিন আগুন লেগেছে ৭০ থেকে ৭৫টি। এতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার ফাইটারসহ নানা শ্রেণি-পেশার অন্তত ৭২০ জন মানুষ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক এলাহি চৌধুরীর মতে, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলছেন, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে, অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা। তবে পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আগুনের ঘটনা গভীরভাবে মনিটরিং করছেন। তবে,এ নিয়ে বাড়তি সতর্কতার কিছু নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকার শিয়ালবাড়িতে পোশাককারখানা ও কসমিক ফার্মা নামের রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। আগুনের
লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ওই ভবনসহ আশপাশের এলাকায়। খবর পেয়ে বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে একে একে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট। এরপর আগুন নেভানোর চেষ্টা চালায় ফায়ার ফাইটাররা। ওইদিন রাতে পোশাক কারখানার দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ভবনের নিচতলায় আগুনের তীব্রতা থাকায় এবং ছাদে ওঠার দরজা দুটি তালা দিয়ে বন্ধ থাকায় অনেকেই ভবন থেকে বের হতে পারেননি। ফলে ওই ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আটকে আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন তারা। এ ঘটনার কয়েকদিন পর সেখানের ধ্বংসস্তুপ থেকে আরও একজনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সবমিলিয়ে ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ১৭ জন।
পরদিন ১৫ অক্টোবর বিকেলে আগুন নির্বাপনে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। এর রেশ না কাটতেই গত ১৬ অক্টোবর
দুপুর আড়াইটার দিকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকার ৫ নম্বরের ‘অ্যাডামস ক্যাপ’ নামে একটি কারখানায় কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট ও নৌ এবং বিমানবাহিনীর ফায়ার ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ চেষ্টা চালিয়ে একদিন পর ১৭ অক্টোবর দুপুরে আগুন নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া না গেলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবনের ৯, ৮ ও ৭ তলার ছাদ ধসে পড়েছে। এরপর ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এর রেশ না কাটতেই গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের কার্গো ভিলেজের আমদানি শাখায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। ঘটনার পরপরই এভিয়েশনের ফায়ার ফাইটার, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ফায়ার ইউনিটসহ একে একে ফায়ার সার্ভিসের ২৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। এসময় বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে। আগুন লাগার পরপরই বেবিচক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক-অভ্যন্তরীণ রুটের সব ধরনের বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। বিমানগুলো ভারত, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারে পাঠিয়ে অবতরণ করা হয়। ঢাকায় অপেক্ষমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানগুলো আটকে গেলে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। তবে ঘটনার প্রায় ২৭ ঘন্টা পর গত ১৯ অক্টোবর রাতে অগ্নিনির্বাপনে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। এ আগুন নেভাতে গিয়ে আনসারের ২৫ জন, ৮ জন ফায়ার ফাইটার, ও সেনা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। তাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় রাশিয়া থেকে আমদানি করা রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের ১৮ টন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ২০০ কোটি টাকার ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, ১০ হাজার হাজার কোটি টাকার গার্মেন্টস পণ্যসহ বিপুল অংকের মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পুরো কার্গো ভিলেজ ধ্বংসস্তুপে রূপ নেয়।
এরপর গত ২৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের কালশী সড়কে বিউটি ফ্যাশন নামে একটি ছয়তলা ভবনের ওপরের তলায় পোশাক কারখানায় আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কারখানার মালিক বিউটি বেগম ও বায়ার সোমা দাবি করেছেন, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। কারখানার ভেতরে কোনও কাজ চলছিল না, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কোনও সমস্যা ছিল না, তাই আগুন লাগার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। টানা ৬ দিনের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের ধরণ ও কারণ নিয়ে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান মতে, গেল ৫ বছরে দেশে আগুনের ঘটনা ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজারের বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৭২ থেকে ৭৫টি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তেও উঠে এসেছে, সহস্রাধিক আগুন লাগানো হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। এর ফলে গত ৫ বছরে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার ফাইটারসহ ৭২০ জন মানুষ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক এলাহি চৌধুরী বলেন, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা।
তবে পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আগুনের ঘটনা গভীরভাবে মনিটরিং করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে, এ নিয়ে বাড়তি সতর্কতার কিছু নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

মা নিজেই নদীতে ফেলার ঘটনা স্বীকার, শিশু জীবিত উদ্ধার

পাঁচ বছরে আগুনে কাড়ল ৭২০ প্রাণ

আপডেট সময় : ০৭:৩৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
  • সারা দেশে সংঘটিত হয়েছে ছোট-বড় দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ড
  • গড়ে প্রতিদিন আগুন লেগেছে ৭০-৭৫টি, উদ্দেশ্যমূলক সহস্রাধিক

‘জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা’
– ইশফাক এলাহি চৌধুরী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক

‘কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে, অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা’
– লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার, পরিচালক, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এতে একদিকে যেমন হতাহতের ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতিও। আগুনের লেলিহান শিখায় নিঃস্ব হচ্ছেন কেউ কেউ। আগুনের ক্ষত দাগ বয়ে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন। আগুনের ভয়াল থাবায় ধ্বংস হচ্ছে বসতঘর, শিল্প প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে সহস্রাধিক। গেল ৫ বছরে বিভিন্ন স্থাপনায় গড়ে প্রতিদিন আগুন লেগেছে ৭০ থেকে ৭৫টি। এতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার ফাইটারসহ নানা শ্রেণি-পেশার অন্তত ৭২০ জন মানুষ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক এলাহি চৌধুরীর মতে, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলছেন, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে, অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা। তবে পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আগুনের ঘটনা গভীরভাবে মনিটরিং করছেন। তবে,এ নিয়ে বাড়তি সতর্কতার কিছু নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকার শিয়ালবাড়িতে পোশাককারখানা ও কসমিক ফার্মা নামের রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। আগুনের
লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ওই ভবনসহ আশপাশের এলাকায়। খবর পেয়ে বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে একে একে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট। এরপর আগুন নেভানোর চেষ্টা চালায় ফায়ার ফাইটাররা। ওইদিন রাতে পোশাক কারখানার দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ভবনের নিচতলায় আগুনের তীব্রতা থাকায় এবং ছাদে ওঠার দরজা দুটি তালা দিয়ে বন্ধ থাকায় অনেকেই ভবন থেকে বের হতে পারেননি। ফলে ওই ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আটকে আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন তারা। এ ঘটনার কয়েকদিন পর সেখানের ধ্বংসস্তুপ থেকে আরও একজনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সবমিলিয়ে ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ১৭ জন।
পরদিন ১৫ অক্টোবর বিকেলে আগুন নির্বাপনে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। এর রেশ না কাটতেই গত ১৬ অক্টোবর
দুপুর আড়াইটার দিকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এলাকার ৫ নম্বরের ‘অ্যাডামস ক্যাপ’ নামে একটি কারখানায় কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। পরে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট ও নৌ এবং বিমানবাহিনীর ফায়ার ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ চেষ্টা চালিয়ে একদিন পর ১৭ অক্টোবর দুপুরে আগুন নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া না গেলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভবনের ৯, ৮ ও ৭ তলার ছাদ ধসে পড়েছে। এরপর ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এর রেশ না কাটতেই গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের কার্গো ভিলেজের আমদানি শাখায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। ঘটনার পরপরই এভিয়েশনের ফায়ার ফাইটার, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ফায়ার ইউনিটসহ একে একে ফায়ার সার্ভিসের ২৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। এসময় বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে। আগুন লাগার পরপরই বেবিচক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক-অভ্যন্তরীণ রুটের সব ধরনের বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। বিমানগুলো ভারত, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারে পাঠিয়ে অবতরণ করা হয়। ঢাকায় অপেক্ষমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানগুলো আটকে গেলে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। তবে ঘটনার প্রায় ২৭ ঘন্টা পর গত ১৯ অক্টোবর রাতে অগ্নিনির্বাপনে সক্ষম হয় ফায়ার ফাইটাররা। এ আগুন নেভাতে গিয়ে আনসারের ২৫ জন, ৮ জন ফায়ার ফাইটার, ও সেনা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। তাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় রাশিয়া থেকে আমদানি করা রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের ১৮ টন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ২০০ কোটি টাকার ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, ১০ হাজার হাজার কোটি টাকার গার্মেন্টস পণ্যসহ বিপুল অংকের মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পুরো কার্গো ভিলেজ ধ্বংসস্তুপে রূপ নেয়।
এরপর গত ২৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের কালশী সড়কে বিউটি ফ্যাশন নামে একটি ছয়তলা ভবনের ওপরের তলায় পোশাক কারখানায় আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কারখানার মালিক বিউটি বেগম ও বায়ার সোমা দাবি করেছেন, এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। কারখানার ভেতরে কোনও কাজ চলছিল না, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কোনও সমস্যা ছিল না, তাই আগুন লাগার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। টানা ৬ দিনের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের ধরণ ও কারণ নিয়ে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান মতে, গেল ৫ বছরে দেশে আগুনের ঘটনা ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজারের বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৭২ থেকে ৭৫টি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তেও উঠে এসেছে, সহস্রাধিক আগুন লাগানো হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। এর ফলে গত ৫ বছরে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার ফাইটারসহ ৭২০ জন মানুষ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক এলাহি চৌধুরী বলেন, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে জনসচেতনতা বেশ জরুরি, শুধু কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেই হবে না। ল ইনফোর্সমেন্ট খুব স্ট্রং হতে হবে। মূলত, জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় না আনায় বাড়ছে আগুনের ঘটনা।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে এটা করতে পারে। অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক বিরোধ, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও অগ্নিসংযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অগ্নিনির্বাপনে তৎপর রয়েছে ফায়ার ফাইটাররা।
তবে পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আগুনের ঘটনা গভীরভাবে মনিটরিং করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে, এ নিয়ে বাড়তি সতর্কতার কিছু নেই।