- মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বিতর্কিত জামায়াতে ইসলামী
- পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল দলটি
- অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতির ভিন্ন ছবি
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বিতর্কিত জামায়াতে ইসলামী। দলটি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে নির্বাচনের মৌসুমে জনসমর্থন সৃষ্টির প্রচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাদের অতীতের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ বা কোনো কোনো গোষ্ঠীকে ইদানীং বলতে শুনছি, “অমুককে দেখলাম, তমুককে দেখলাম, এবার তমুককে দেখুন”। তাদের তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে।’
তফসিল ঘনিয়ে আসায় প্রকাশ্যে-নেপথ্যে চলছে দলগুলোর জোটের তৎপরতা। ক্রমেই জমে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। দলগুলোর নেতারা দেশজুড়ে সফর করছেন, জনসভায় অংশ নিচ্ছেন। এই প্রচারে নিজেদের কৃতিত্ব আর অঙ্গীকারের বয়ানের পাশাপাশি দলগুলো পরস্পরের দোষ চিহ্নিত করে সমালোচনার তির ছুড়ছে। চেষ্টা করছে জনসমর্থন নিজের পক্ষে টানতে। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সব ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই ঘোষণা করা হবে নির্বাচনের তফসিল, অর্থাৎ বিশদ সময়সূচি। টেলিভিশনের জন্য বুধবার তফসিলের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণ রেকর্ড করা হবে বলে গত সোমবার জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃপক্ষ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে দিয়েছে। পাল্টে যাওয়া দৃশ্যপটের একটি চিত্র দীর্ঘদিনের বন্ধু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এখনকার দুই মেরুতে অবস্থান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগবিহীন ভোটের মাঠে দল দুটি এখন একে অপরের মূল প্রতিপক্ষ। নির্বাচনে জয়ের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো জোরেশোরে সামনে আনছে তারা। এরই অংশ হিসেবে দুই পক্ষের জমে ওঠা কথার যুদ্ধে স্থান পেয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া বিএনপি-জামায়াতের কথার যুদ্ধ তারেক রহমানের এ তির্যক মন্তব্যের মধ্য দিয়ে অনেকটাই তুঙ্গে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। অভ্যুত্থানের কিছুদিন পর থেকে আন্দোলনকালীন ঘনিষ্ঠতা বা সৌজন্য অনেকটাই পেছনে সরিয়ে রেখে বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে আক্রমণ করে কথা বলে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং তাদের ছোট-বড় নেতাদের নির্বিচার পলায়নের পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে মাঠ ফাঁকা পেয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের দখল, চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। তুলনামূলকভাবে জামায়াত বা অন্য দলের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠে বেশ কম। বিএনপি পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়। বিএনপির বিরুদ্ধে অতীতের আওয়ামী লীগের মতোই দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগকে জামায়াত তাদের প্রচারের প্রধান অস্ত্র করে তোলে। জামায়াতের নেতারা জনসভা, সেমিনার, টক শো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বিএনপিকে ঘায়েলের তৎপরতা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপিও বসে নেই। জামায়াতের নেতা-কর্মীদের অন্যায়-অপকর্মের ঘটনা দেখলে সেগুলো সামনে আনছে তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ভোটের মাঠে জামায়াতকে কাবু করতে নির্বাচনী প্রচারে দলটির মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকাকে এবার জোরেশোরে সামনে এনেছে বিএনপি।
শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে একাত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে জাতিকে অনুপ্রাণিত করা বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান পরবর্তীকালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপি বরাবর দলের প্রতিষ্ঠাতাকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া’ হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বা ছিলেন আরও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া খোদ আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও ‘রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে’ জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বস্তুত বিএনপি-জামায়াত মিত্রতা অনেক বেশি সময়ের। জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে ২০০১ সালে জোট সরকার পর্যন্ত গঠন করেছিল বিএনপি। তবে রাজনৈতিক আবহের পরিবর্তনে সেই চিত্র আপাতত একেবারেই পাল্টে গেছে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের অভিযোগ, ভোটের মাঠে দলটিকে পরাজিত করতে জামায়াতের দিক থেকে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ভোটার আকর্ষণ করতে ধর্মকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জামায়াত একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে পুরোনো, বিভেদ সৃষ্টিকারী বিষয় বলে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। স্পষ্টতই জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একটি দল ধর্মের নামে ট্যাবলেট বিক্রি করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করার পরিকল্পনা করছে। তাদেরকে জনগণ এরই মধ্যে চিনেছে। তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে।’ সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তারা (জামায়াতে ইসলামী) কেবলই বলছে যে এখানে একটু মার্কাতে ভোট দিলে তরতরাইয়া জান্নাতে যাবে। তার আগে ইহকালে কীভাবে চলব, এর কোনো বক্তব্য নাই।’ নির্বাচন মৌসুমে একাত্তরকে সামনে নিয়ে আসায় বিব্রত জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না দলটির নেতারা। জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা বলেছেন, এত বড় দলের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন ‘দায়িত্বহীন বক্তব্য’ প্রত্যাশিত নয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় বলে জনগণ মনে করে না। জনগণ মনে করে না, এটা সমীচীন কোনো বক্তব্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতের বিতর্কিত অবস্থানের বিষয়টি ভোট এগিয়ে এলে প্রচারণার মাঠে আরও বেশি করে আলোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলের অবস্থান কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সময় কথা বলবে। আমরা সেই সময়ের অপেক্ষা করি। তখন সামাল দেওয়ার বিষয়টি সবাই দেখবে। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ‘১৯৪৭ থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ এখন পর্যন্ত’ করা যেকোনো অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বিজয় দিবস সামনে রেখে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি ক্ষমা চাইবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে দলের পক্ষ থেকে একাধিকবার অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। সর্বশেষ আমাদের আমির বলেছিলেন, শুধু একাত্তর না, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি কেউ আমাদের দ্বারা কষ্ট পেয়ে থাকলে, ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে আমরা ক্ষমা চেয়েছি, ক্ষমা চাইতেই থাকব। আমরা মনে করি, বিষয়টি জাতির কাছে স্পষ্ট হয়েছে।’
আগামী নির্বাচনে একাত্তরের বিষয়টি সামনে এনে প্রতিপক্ষ খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে মনে করছেন জামায়াতের নেতারা। ভোটে এ নিয়ে জামায়াত কতটুকু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ফ্যাসিস্টদের মুখেও এ নিয়ে ফেনা উঠেছিল। জাতি তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিজস্ব ভোটব্যাংক প্রতিটি দলেরই আছে। এর বাইরে বড় সংখ্যার দোদুল্যমান ভোটার রয়েছেন, যাঁরা সিদ্ধান্তহীনতায় থাকেন। এমন ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে দলগুলোর কথার যুদ্ধ স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। নির্বাচন মৌসুমে দলগুলোর বাগ্যুদ্ধে দোদুল্যমান ভোটারদের একটা বড় অংশ প্রভাবিত হয়। কিছুটা এরই অংশ হিসেবে ভোটের মাঠে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকাকে সামনে এনেছে বিএনপি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া রাজনীতির ময়দানে জামায়াত এখন বড় ফ্যাক্টর। জামায়াত যেহেতু বিপক্ষে চলে গেছে, সংগত কারণেই একাত্তর দিয়ে জামায়াতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে বিএনপি। এটা খুবই স্বাভাবিক।…অন্যদিকে একাত্তরের বিষয়ে জামায়াত সংযত না হয়ে উল্টো আরও ১০ ডিগ্রি ওপর দিয়ে কথা বলছে। একাত্তরকে অস্বীকার করা, একে-ওকে বিশ্বাসঘাতক বলা-এগুলো জামায়াতের জন্য খুবই নেতিবাচক হবে। মানুষ এগুলো ভালোভাবে নেবে না।’

























