- নিজ দল ছেড়ে এমপি হওয়ার মরিয়া
- জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি ও এলডিপি
- এনসিপিতে ক্ষোভ। কয়েকজন নেতার পদত্যাগ
- একে একে নিজ দল ছেড়ে ভিড়ছেন অন্য দলে
- নারী নেত্রীদের পদত্যাগে টালমাটাল এনসিপি
বাংলাদেশের আগামী ফেব্রæয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দল বিলুপ্ত করে কিংবা নিজের দল ছেড়ে কিছু রাজনৈতিক নেতার বড় দলে সামিল হওয়ার প্রবণতা অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে। এসব নেতারা বড় একটি দলে যোগ দিয়েই নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়ন পাওয়ায়- অনেকেই একে ‘এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
নানা জল্পনাকল্পনা ও নাটকীয়তার পর অবশেষে চূড়ান্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী জোট। এনসিপির পাশাপাশি এই জোটে নতুন করে আরও যুক্ত হয়েছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। জোটের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনাও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কোন দল কত আসনে লড়বে, সে ঘোষণা আসতে পারে আজ-কালের মধ্যেই। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে দল যোগ দেওয়ায় এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কয়েকজন নেতা। দলের শীর্ষ নেতারা অবশ্য জোটের পক্ষে তাঁদের অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবে গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে জোটের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা ৮ দল অনেক দিন ধরে একসঙ্গে আন্দোলন করে আসছি। এখন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি।’ কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে নীতি ও আদর্শ একপাশে রেখে ‘যে কোনো মূল্যে এমপি হওয়ার’ প্রকাশ্য এই চেষ্টা কতটা নৈতিক সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের এমপি হওয়া মানে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মালিক হওয়া এবং সে কারণেই যে কোনো প্রকারে এমপি হওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায় বলে তারা মনে করেন।
তবে এমন কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী ও কয়েকটি দল বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ এটি সত্যি কিন্তু নির্বাচন কমিশন জোটবদ্ধ দলগুলোর জন্য নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা এটিকে ‘অনৈতিক’ না বলে একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছেন। প্রসঙ্গত, আগামী ১২ই ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে সামরিক সরকারগুলোর সময়ে প্রায়শই দলবদলের ঘটনা ঘটতো। পরে রাজনৈতিক বিভিন্ন সময়ে কৌশল হিসেবে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে অনেক দল। কিন্তু নির্বাচনের আগে নিজ দলই বিলুপ্ত করে বড় দলে যোগ দেওয়া- এবার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত অক্টোবরে সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ বা আরপিওতে সংশোধনী এনে নির্বাচনে নিবন্ধিত একাধিক দল জোটভুক্ত হলেও ভোট করতে হবে নিজ নিজ দলের প্রতীকে-এমন ধারাও যুক্ত করা হয়। মূলত এরপরেই বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পথ চলা কিছু ছোটো দলের নেতাদের মধ্যে দল ছেড়ে বিএনপিতে বিলীন হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়। বিএনপির অনেক দিনের মিত্র দল বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) এর চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম দল বিলুপ্ত করে দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গত ৮ই ডিসেম্বর বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এরপর তাকে ল²ীপুর-১ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয় দলটি। এরপর ২৪শে ডিসেম্বর এলডিপি (অলি) এর মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। তার দলের চেয়ারম্যান অলি আহমদ পরে জানান যে মি. আহমদ দলের নিজস্ব এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর তাকে কিছু না জানিয়েই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা-ও তার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কিশোরগঞ্জের একটি আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। এ ছাড়া নিজ দল ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ ও ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ আসন থেকে বিএনপির প্রতীকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিবেন বলে জানিয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। গতকাল সোমবার এনসিপির একাধিক নেতা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর বাংলামোটর এনসিপি কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে দলটি। দলের দপ্তর সম্পাদক সালেহ উদ্দিন সিফাত বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহŸায়ক নাহিদ ইসলাম উপস্থিত থাকবেন। জানা গেছে, সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদও উপস্থিত থাকবেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেবেন। এদিকে, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একে একে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে যাচ্ছেন দলের নারী নেত্রীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এই জনপ্রিয় নেত্রীরা পদত্যাগ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপির আহŸায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য ও বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে জামায়াতসহ সমমনা আট দলের সঙ্গে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এনসিপির এই সিদ্ধান্তে দলের অনেকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখার কথা বলেছেন, অনেকে ছাড়ছেন দল। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দলের সব নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহŸায়ক নুসরাত তাবাসসুম। তিনি বলেছেন, এই জোটবদ্ধ হওয়া তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক ধরনের ‘প্রবঞ্চনা’। তিনি বলেছেন, ‘এ সমস্ত ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আমি নুসরাত তাবাসসুম, (যুগ্ম আহŸায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি) প্রাথমিকভাবে নির্বাচনকালে নিজেকে পার্টির সব কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় করছি।’ এনসিপি জামায়াত জোটের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা ও তার স্বামী এনসিপির যুগ্ম আহŸায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘আমাদের আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত, কিছু আলোচনা বাকি আছে। সেগুলো আশা করি শিগগির শেষ হবে। এরপর আমরা ঘোষণা করব।’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে আগে থেকেই ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। দলগুলো একসঙ্গে মাঠে কর্মসূচিও পালন করেছে। রোববার সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির জানান, দুপুরে এনসিপির আহŸায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আট দলের শীর্ষ নেতারা। সেই বৈঠকে আট দলের জোটে এনসিপির অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এনসিপির সঙ্গে আমাদের আলোচনা আজকে সমাপ্ত হয়েছে। তারা আমাদের এই জোটে থাকছে।’ আসন সমঝোতার বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত। সামান্য যা বাকি আছে, তা আলোচনার ভিত্তিতে সুন্দরভাবে শেষ করতে পারব আশা করি।’ ১০ দলের মধ্যে আসন বণ্টন কীভাবে হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবার হাতে আসন তুলে দিব। যার যে যোগ্যতা, তার ভিত্তিতেই আসনগুলো তুলে দেব। শিগগির আসন ঘোষণাও হবে।’ এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন প্রায় ৩০০ আসনে এবং খেলাফত মজলিস ২৭৬ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিও ইতিমধ্যে ১২৫ আসনে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জোটের অন্য দলগুলো সর্বোচ্চ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলগুলোর নেতারা। দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, এখন দলগুলো নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করবে। কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হবে। তবে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের আসনে একধরনের সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে। একাধিক সূত্র বলছে, আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে বড় অংশ থাকবে জামায়াতের হাতে। বাকি আসনগুলো ৯ দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। জোটে আসনের দিক থেকে বড় ভাগ পাবে এসসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন এই জোটের আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সেই অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী ১৯০টি, এনসিপি ৩০টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩০-৩৫টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ৪-৫টি, খেলাফত মজলিস ৮টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ১৫টি আসনে প্রার্থী ছাড়ের আলোচনা চলছে। তবে জামায়াত বাদে অন্য দলগুলো আরও বেশি আসনে ছাড় পেতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা। জামায়াত ও সমমনা ৮ দলের সঙ্গে জোটে অন্তর্ভুক্তির আলোচনা শুরুর পর থেকেই গৃহদাহ শুরু হয়েছে এনসিপিতে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলের দুই যুগ্ম আহŸায়ক তানসিম জারা ও তাজনূভা জাবীন। এ ছাড়া ‘একক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত’ পরিবর্তন হওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন আরেক যুগ্ম আহŸায়ক মনিরা শারমিন। এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন না করার দাবি জানিয়ে আহŸায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, দলের নির্বাহী কমিটি ও তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তবে এর বিপরীতে নাহিদের প্রতি পূর্ণ আস্থা জানিয়ে আহŸায়ক বরাবর চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ১১৪ নেতা। তাঁরা চিঠিতে জানান, দলীয় ও জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে এনসিপি যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছায় কিংবা নতুন কোনো জোট গঠন করে, তবে তাতে তাঁদের পূর্ণ সমর্থন ও সম্মতি থাকবে।
























