দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা চরম আকার ধারণ করেছে। পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও মৃদু শৈত্যপ্রবাহে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলায় ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের ও শ্রমজীবী মানুষ।
শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকায় উত্তরের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ভোর ও রাতের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে, কমেছে দৈনিক আয়ও। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখছেন। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে ক্রেতার ভিড় বেড়েছে। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা, হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতজুড়ে নতুন ও পুরনো শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক কিনতে পুরনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায়ী দোকানগুলোতে ভিড় করছেন।
জাহাজ কোম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্ত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শীতবস্ত্র বিক্রি চলছে। ভ্যানচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, “দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্টকর। শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। পুরনো একটি জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা।”
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, “চলতি বছর পুরনো কাপড়ের দাম বেশি। আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে, যার চাপ পড়ছে গরিব মানুষের ওপর।”
শীতের তীব্রতায় অনেক মানুষ খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানো এখন নিত্যদিনের চিত্র।
শৈত্যপ্রবাহের কারণে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে টানা আট দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। জানুয়ারিতেও পাঁচ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। তিনি জানান, জানুয়ারি মাসে আরও দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে এবং পরিস্থিতি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৭ শতাংশ। বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা কয়েকদিন সূর্যের দেখা না পাওয়ায় শীতের তীব্রতা সেখানে আরও বেড়েছে।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, শীত মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমান শীতের তীব্রতার তুলনায় সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। শীতে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের মানুষ এখন প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
শু/সবা






















