ফাগুনের হাওয়া ও বসন্তের মনোরম সময়েও স্বস্তির বদলে শ্যামাসুন্দরী খাল ও কেডি খালকেন্দ্রিক মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে রংপুর নগরীর মানুষ। দ্রুত কার্যকর মশা নিধন কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
নগরবাসীর অভিযোগ, নগরীর প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত শ্যামাসুন্দরী খাল ও কেডি খালকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি মশার বংশবিস্তার ঘটছে। খাল দুটি যেন মশা উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
রংপুর শহরের মানুষকে মশার কবল থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে ১৮৯০ সালে রাজা জানকীবল্লভ সেন ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, প্রায় ১০০ ফুট প্রস্থ ও ৪০ ফুট গভীর একটি খাল খনন করেন। রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকার ঘাঘট নদীর উৎসমুখ থেকে শুরু হয়ে খালটি খোখসা ঘাঘটের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ খালটি রংপুরের ‘ফুসফুস’ বলেও পরিচিত।
বর্তমানে অবৈধ দখল ও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে খালটির পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনায় পরিণত হয়ে এটি দিন দিন সরু ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলের মহারাজা জানকী জানকীবল্লভ সেনের মাতা শ্রীমতি শ্যামাসুন্দরী সেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখা এবং ম্যালেরিয়া দূর করার উদ্দেশ্যে জানকীবল্লভ সেন রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকা থেকে মাহিগঞ্জ পর্যন্ত খাল খনন করেন। তাঁর মায়ের নামানুসারেই খালটির নাম রাখা হয় ‘শ্যামাসুন্দরী খাল’।
তৎকালীন সময়ে খালটির প্রস্থ ছিল ৪০ থেকে ৯০ ফুটেরও বেশি, যা বর্তমানে সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও মাত্র ৬ থেকে ৮ ফুটে নেমে এসেছে। নির্মাণকাজ শেষে নগরীর কাচারীবাজার এলাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন নামফলক স্থাপন করা হয়। সেখানে লেখা ছিল—
“পীড়ার আঁকড় ভূমি প্রণালি কাটিয়া তা করিবার দূর,
মাতা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে জানকীবল্লভ সুত এই কীর্তি করিল।”
দীর্ঘদিন ধরে শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল পরিষ্কার না করায় পানিপ্রবাহ সচল নেই, যা মশা উৎপাদনের আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিকাল গড়ালেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ঘরে ঢুকে পড়ছে। অনেক এলাকায় স্প্রে ও কয়েল ব্যবহার করেও মশার উৎপাত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
প্রবীণ নাগরিক আব্দুর রহমান বলেন, এক সময় শ্যামাসুন্দরী খালটি কেল্লাবন্দরের ঘাঘট নদী থেকে শুরু হয়ে ধাপ, পাশারীপাড়া, কেরানীপাড়া, মুন্সিপাড়া, ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর ও বৈরাগীপাড়া হয়ে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু সংস্কারের অভাবে খালটি নাব্যতা হারিয়ে এখন মশার বংশবিস্তারের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
কেডি খালসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, শ্যামাসুন্দরী খালের চেয়েও কেডি খালে বেশি মশা জন্মাচ্ছে। খাল, ড্রেন ও জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার না করায় নগরীতে মশার বিস্তার ঘটছে। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
মশার উপদ্রবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে মশারি টাঙিয়ে পড়াশোনা করছে। নগরীর গুড়াতিপাড়ার বাসিন্দা ইয়াছিন আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রংপুরে বসবাস করছি, কিন্তু এমন ভয়াবহ মশার উপদ্রব আগে কখনও দেখিনি। বিকালের পর জানালা খোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
একই অভিযোগ করে মুন্সীপাড়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, মশার কারণে শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। সারাক্ষণ কয়েল জ্বালাতে হয়, যা শিশুদের শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
ধাপ এলাকার নজরুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনে মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় কার্যকর কোনো তদারকি নেই। শেষ কবে এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম হয়েছে, তা মনে নেই। শ্যামাসুন্দরী খাল পরিষ্কার থাকলে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না।
শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, অতিরিক্ত কয়েল ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক এবং এটি শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। তারা মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি ও আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান মিজানুর রহমান মিজু বলেন, এবার মশার উপদ্রব কিছুটা বেশি হওয়ায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১০ হাজার লিটার ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮০টি নতুন ফগার মেশিন ও ৬৬টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে। রমজানের কারণে পূর্ণমাত্রায় অভিযান শুরু করা না গেলেও পর্যায়ক্রমে নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডেই মশা নিধন কার্যক্রম চালানো হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যথায় রংপুরবাসীর জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগে পরিণত হবে।
শু/সবা


























