যুব সমাজের ধ্বংসের অন্যতম কারণ মাদক। মাদকদ্রব্য সেবনের কারণে মানুষের নৈতিকতা ক্ষুণ্ণ হয়, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং সমাজে অরাজকতা বিরাজ করে। এই মাদক দ্রব্য এখন উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় নিত্যনতুন কৌশলে প্রবেশ করছে।
মাদক ব্যবসায়ীরা দিনের বেলা কৃষিকাজ বা ঘাস কাটার ছদ্মবেশে সীমান্ত পারাপার করছেন। কেউ কেউ ঘাসের বস্তা বা বাঁশবাহী ট্রাকের ভেতরে বিশেষ কায়দায় মাদক লুকিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাচ্ছেন। অর্থের লোভে কোমলমতি শিশু ও অভাবী নারীদেরও এই কারবারে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে কখনও মাটির নিচে হাঁড়িতে, কখনও বাঁশভর্তি ট্রাকের ভিতরে কুঠুরি বানিয়ে এসকাফ, ফেন্সিডিল ও ইয়াবার বড় চালান পাচার করা হচ্ছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্ত ও তিস্তার চরাঞ্চল এখন মাদক কারবারের হটস্পট। গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে চর মর্ণেয়া এলাকা থেকে এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়। তার গোয়ালঘরের মাটির নিচে ১৪৭ বোতল এসকাফ সিরাপ লুকিয়ে রাখা ছিল। এর আগে মহিপুর এলাকায় পিকআপ ভ্যানসহ ১০ লক্ষ টাকার মাদক উদ্ধার করা হলেও কারবার থেমে নেই।
লালমনিরহাটের ২৮৪ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৫৪ কিলোমিটার অরক্ষিত। ১১টি রুট দিয়ে ভারত থেকে মাদক প্রবেশ করছে। বিশেষ করে আদিতমারীর বামনের বাসা, আমেনা বাজার, হাজীগঞ্জ, ভেলাবাড়ি, দুর্গাপুর ও পাটগ্রামের দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক তিস্তার চর পেরিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার দইখাওয়া সীমান্তে হুন্ডি মাইদুল ইসলাম, আমিনুর রহমান, রবিউল ইসলাম ওরফে রবি ও ছাদিকুল ইসলামের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। প্রায় ৪০ সদস্যের এই দল বাঁশের চরকি দিয়ে সীমান্ত পারাপার ও গরু ও মাদক চালান নিয়ন্ত্রণ করে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এলাকা ভিত্তিক লাইনম্যানদের নাম—সিঙ্গিমারীতে সেকেন্দার হোসেন, দইখাওয়ায় ভুট্টু ও মোতালেব, আমজোল এলাকায় আনিছুর ও মতিয়ার, ঠ্যাংঝাড়ায় নজরুল ইসলাম, ফকিরপাড়ায় লুৎফর রহমান, দোলাপাড়ায় বেলাল হোসেন। এরা প্রতিদিন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা তোলেন। রাতের রাজা হিসেবে পরিচিত ভুট্টু সীমান্তজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের খামারভাতি এলাকা মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। বিএসএফের গুলিতে নিহত জয়নাল আবেদিনের ছেলে আনারুল ইসলাম ও মৃত তছলিম উদ্দিনের ছেলে আলো মিয়ার নেতৃত্বে রাতের বেলায় মাদক পাচার ও বিক্রির কাজ চলে। এছাড়া চলবলা, গোড়ল, দলগ্রাম, ভোটমারী ও কাকিনা এলাকায় কৃষিকাজের নাম করে মানুষ সীমান্ত পারাপার করছে, যাদের অনেকের কাছে দুই দেশের জাতীয় পরিচয়পত্রও রয়েছে। কালীগঞ্জের চাঁপারহাট থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়া বাঁশভর্তি ট্রাকগুলো এখন মাদক পাচারের নিরাপদ বাহন।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক গডফাদার ইব্রাহিম ও হিমাংশুকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও লঘু ধারায় মামলা দিয়ে তাদের ছাড় পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ইব্রাহিম ও মনির নামে দুই লাইনম্যান নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা তুলে প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ব্যবসা সচল রাখেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত তিন মাসে রংপুর বিভাগে ৮৯১টি মামলায় ৬৮১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মাসুদ হোসেন মনে করেন, অধিকাংশ ব্যবসায়ী জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই পেশায় ফিরে যাচ্ছে। তিস্তার চরাঞ্চলকে তারা বর্তমানে প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
হাতিবান্ধা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রমজান আলী ও কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, “সীমান্ত পথে আসা মাদক তিস্তার চর পেরিয়ে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সীমান্তে চোরাচালান রোধে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকসহ কারবারিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।”
রংপুর ব্যুরো: 
























