10:44 pm, Friday, 19 June 2026

পতাকা কেনার সামর্থ্য নেই, পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ালো শিশু আবির!

বিশ্বকাপ ফুটবলের জোয়ারে ভাসছে পুরো দেশ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের পতাকা-জার্সিতে সয়লাব। প্রিয় দলের সমর্থনে যখন মেতেছে সবাই, ঠিক তখনই ঝিনাইদহে দেখা গেল এক ভিন্নধর্মী ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র। চড়া দামে পতাকা কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল লিওনেল মেসির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার টানেই প্লাস্টিকের পরিত্যক্ত পলিথিন জোড়া দিয়ে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকা বানিয়ে বাড়ির উঠোনে উড়িয়েছে ১১ বছর বয়সী শিশু আবির হোসেন।
আবির ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের গ্রিল ফ্যাক্টরি শ্রমিক আলিউল ইসলামের ছেলে এবং উজির আলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র।
প্রতিবেশি কামরুজ্জামান লিটন জানান, বিশ্বকাপ শুরু হতেই আবিরের বন্ধু ও প্রতিবেশীরা যার যার মতো জার্সি আর পতাকা কিনে বাড়ি সাজাতে শুরু করে। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে আবিরের বাবার পক্ষে ছেলের এই আবদার মেটানো সম্ভব ছিল না। তবে দমে যায়নি আবির। মনের তাগিদেই সে বাড়ির পাশে পড়ে থাকা পলিথিন কুড়িয়ে, সুতা দিয়ে সেলাই করে নিখুঁতভাবে তৈরি করে আর্জেন্টিনার একটি পতাকা। এরপর সেটি বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে ঘরের সামনে টাঙিয়ে দেয়।
পলিথিনের তৈরি সেই পতাকার ছবি স্থানীয় এক ফুটবলপ্রেমীর মাধ্যমে পৌঁছায় ‘আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহ’র হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। পলিথিনের পতাকায় লুকিয়ে থাকা এই বিশাল আবেগ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ক্লাবের সদস্যরা।
খবর পেয়ে আবিরের বাড়িতে ছুটে যান আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন, জিকু হাসান, শাহজাহান নবীন ও সামিউল হক সামিসহ বেশ কয়েকজন সদস্য। তারা আবিরের বানানো পলিথিনের পতাকাটি সসম্মানে নামিয়ে তার হাতে তুলে দেন আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল আসল জার্সি, একটি নতুন ফুটবল এবং একটি বড় পতাকা।
হঠাৎ করে স্বপ্নের মতো এসব উপহার পেয়ে আনন্দের অতিশয্যে কেঁদে ফেলে শিশু আবির। তার সেই আনন্দ অশ্রু ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে।
আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম বলেন, “সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ছেলের জন্য জার্সি-পতাকা কেনা বিলাসিতা ছিল। শহরের ভাইয়েরা এসে যখন আমার ছেলের হাতে এগুলো তুলে দিল, ওর মুখের সেই হাসি আমি ভুলব না। খুশিতে ও সারারাত নতুন জার্সি পরে, ফুটবল বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছে।”
নতুন জার্সি গায়ে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে আবির জানায়: “আমি মেসির অনেক বড় ভক্ত। আব্বুর কাছে ১০ নম্বর জার্সি চেয়েছিলাম, কিন্তু টাকা ছিল না বলে আব্বু দিতে পারেনি। তাই পলিথিন দিয়েই পতাকা বানিয়েছিলাম। এখন নতুন জার্সি আর ফুটবল পেয়ে আমি অনেক খুশি। এবার আর্জেন্টিনা ও মেসিই বিশ্বকাপ জিতবে।”
ঝিনাইদহ আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের অ্যাডমিন সাংবাদিক শাহজাহান নবীন এবং শাহীনুর রহমান লিটন জানান, বর্তমান যুগে যখন শিশুরা মোবাইল গেমসে আসক্ত, তখন ফুটবলের প্রতি আবিরের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা সত্যিই বিরল। এই ছোট্ট শিশুর আবেগ ও ফুটবলপ্রেমকে সম্মান জানাতেই তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন তার মুখে হাসি ফোটাতে।
ডিজিটাল আসক্তির এই যুগে আবিরের মতো মাঠের ফুটবলকে ভালোবাসাই আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতীক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

seventeen + 19 =

About Author Information

রাবিতে র‍্যাগিংয়ের ভিডিও করায় প্রক্টরের সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধর

পতাকা কেনার সামর্থ্য নেই, পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ালো শিশু আবির!

Update Time : ০৯:৩৫:৫৬ pm, Friday, ১৯ জুন ২০২৬
বিশ্বকাপ ফুটবলের জোয়ারে ভাসছে পুরো দেশ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের পতাকা-জার্সিতে সয়লাব। প্রিয় দলের সমর্থনে যখন মেতেছে সবাই, ঠিক তখনই ঝিনাইদহে দেখা গেল এক ভিন্নধর্মী ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র। চড়া দামে পতাকা কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল লিওনেল মেসির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার টানেই প্লাস্টিকের পরিত্যক্ত পলিথিন জোড়া দিয়ে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকা বানিয়ে বাড়ির উঠোনে উড়িয়েছে ১১ বছর বয়সী শিশু আবির হোসেন।
আবির ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের গ্রিল ফ্যাক্টরি শ্রমিক আলিউল ইসলামের ছেলে এবং উজির আলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র।
প্রতিবেশি কামরুজ্জামান লিটন জানান, বিশ্বকাপ শুরু হতেই আবিরের বন্ধু ও প্রতিবেশীরা যার যার মতো জার্সি আর পতাকা কিনে বাড়ি সাজাতে শুরু করে। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে আবিরের বাবার পক্ষে ছেলের এই আবদার মেটানো সম্ভব ছিল না। তবে দমে যায়নি আবির। মনের তাগিদেই সে বাড়ির পাশে পড়ে থাকা পলিথিন কুড়িয়ে, সুতা দিয়ে সেলাই করে নিখুঁতভাবে তৈরি করে আর্জেন্টিনার একটি পতাকা। এরপর সেটি বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে ঘরের সামনে টাঙিয়ে দেয়।
পলিথিনের তৈরি সেই পতাকার ছবি স্থানীয় এক ফুটবলপ্রেমীর মাধ্যমে পৌঁছায় ‘আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহ’র হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। পলিথিনের পতাকায় লুকিয়ে থাকা এই বিশাল আবেগ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ক্লাবের সদস্যরা।
খবর পেয়ে আবিরের বাড়িতে ছুটে যান আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন, জিকু হাসান, শাহজাহান নবীন ও সামিউল হক সামিসহ বেশ কয়েকজন সদস্য। তারা আবিরের বানানো পলিথিনের পতাকাটি সসম্মানে নামিয়ে তার হাতে তুলে দেন আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল আসল জার্সি, একটি নতুন ফুটবল এবং একটি বড় পতাকা।
হঠাৎ করে স্বপ্নের মতো এসব উপহার পেয়ে আনন্দের অতিশয্যে কেঁদে ফেলে শিশু আবির। তার সেই আনন্দ অশ্রু ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে।
আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম বলেন, “সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ছেলের জন্য জার্সি-পতাকা কেনা বিলাসিতা ছিল। শহরের ভাইয়েরা এসে যখন আমার ছেলের হাতে এগুলো তুলে দিল, ওর মুখের সেই হাসি আমি ভুলব না। খুশিতে ও সারারাত নতুন জার্সি পরে, ফুটবল বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছে।”
নতুন জার্সি গায়ে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে আবির জানায়: “আমি মেসির অনেক বড় ভক্ত। আব্বুর কাছে ১০ নম্বর জার্সি চেয়েছিলাম, কিন্তু টাকা ছিল না বলে আব্বু দিতে পারেনি। তাই পলিথিন দিয়েই পতাকা বানিয়েছিলাম। এখন নতুন জার্সি আর ফুটবল পেয়ে আমি অনেক খুশি। এবার আর্জেন্টিনা ও মেসিই বিশ্বকাপ জিতবে।”
ঝিনাইদহ আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের অ্যাডমিন সাংবাদিক শাহজাহান নবীন এবং শাহীনুর রহমান লিটন জানান, বর্তমান যুগে যখন শিশুরা মোবাইল গেমসে আসক্ত, তখন ফুটবলের প্রতি আবিরের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা সত্যিই বিরল। এই ছোট্ট শিশুর আবেগ ও ফুটবলপ্রেমকে সম্মান জানাতেই তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন তার মুখে হাসি ফোটাতে।
ডিজিটাল আসক্তির এই যুগে আবিরের মতো মাঠের ফুটবলকে ভালোবাসাই আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতীক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শু/সবা