রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে প্রচন্ড শীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া বয়স্ক ও
শিশুদের ঘরের বাহিরে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। শীতে বিপাকে পড়েছে দিনমজুর ও রিক্সা চালকগণ।
গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় রংপুর বিভাগে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি
সেলসিয়াস সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। কুয়াশা ভেদ করে ভোরে সূর্যের রোদ ছড়ালেও
হাড় কাঁপছে কনকনে তীব্র শীতে। এতে দূর্ভোগে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। কনকনে ঠান্ডায়
বিপর্য়স্থ উত্তরের জনপদ। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে হিমেল হাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ।
গরম কাপড়ের অভাবে শীতে কষ্টে রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর আব্দুস
সালাম বলেন, অনেক ঠান্ডা পড়ছে। কাজে বের হতে পারছি না। গরম কাপড়ও নাই। ঠান্ডায় ঘর থেকেই
বের হওয়া যাচ্ছে না।
রংপুর চিনিকল ৩ বছরেও চালু হয়নি
রংপুর ব্যুরো: গাইবান্ধার একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারি শিল্প কারখানা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার
মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকল। লোকসান কমাতে আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে
উন্নীত করার কথা বলে গত ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের
নিয়ন্ত্রণাধীন ১৫টির মধ্যে যে ছয়টি চিনিকলে মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম
রাষ্ট্রায়ত্ত এ চিনিকলটি। সে সময় ২০২০-২১ বার্ষিক আখ মাড়াই মৌসুম শুরুর সব প্রস্তুতি
স¤পন্ন করেও সর্বোচ্চ মাড়াইক্ষমতা ও বিপুল পরিমাণ জমিতে দন্ডায়মান আখ জমিতে রেখে
একেবারে শেষ মুহূর্তে বন্ধ করার সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ আখচাষি ও শ্রমিক-কর্মচারীরা ব্যাপক
আন্দোলন করে। শ্রমিক আন্দোলন বা চাষিদের করুণ আকুতিকে বৃদ্ধাগুলি দেখিয়ে মাড়াই কার্যক্রম
বন্ধ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিদের। তখন আন্দোলনরত শ্রমিক-
কর্মচারী ও চাষিদের উদ্দেশে দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে
জানানো হয়েছিল, আধুনিকায়নের মাধ্যমে খুব দ্রুতই চালু করা হবে এ চিনিকলসহ সব কয়টি
চিনিকল। প্রায় ১ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা এবং ৫০ হাজার চাষি ছাড়াও
বিভিন্নভাবে স¤পৃক্ত লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা অর্জনের মাধ্যম রংপুর চিনিকলটি চালু হয়নি
তিন বছরেও। বরং এ চিনিকলের স্থায়ী চাকরিজীবীদের একাংশ, গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও নানা প্রয়োজনীয়
মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অন্য চিনিকলে। কাজ হারানো , মজুরি (কানামনা) চুক্তিভিত্তিক
অর্ধসহস্রাধিক শ্রমিকরা এখন পেটের দায়ে ভ্যান-রিক্সা চালনাসহ বিভিন্ন কাজ করে মানবেতর
জীবনযাপন করছে। গত ৩ বছর বন্ধ থাকায় ৩৫ একর আয়তনের কারখানার চত্ত্বর ভরে গেছে জঙ্গলে। এ দৃশ্য
দেখলে মানুষের সরব উপস্থিতির অভাব নিশ্চিত হওয়া যায় খুব সহজে। খোলা আকাশের নিচে অযত্ন-
অবহেলায় পড়ে থাকা আখ পরিবহনের যানবাহনগুলোও ধ্বংসের পথে। কারখানার ভেতরের দৃশ্যটাও একই
রকম। কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতিতে এখন মরিচার রাজত্ব। থমকে আছে জীবিকার
চাকাগুলো। আখচাষি আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিত্যদিনের সমাবেশের চিরচেনা দৃশ্য আর নেই।
হাজারো মানুষের একসময়ের জীবন-জীবিকার কেন্দ্রস্থলের প্রবেশপথ ও মিলে আখ সরবরাহের জন্য শত
শত সারিবদ্ধ গাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণটি এখন গো-চারণভূমি। স্থানীয়রা বলেন, ১৯৫৪ সালে তৎকালীন
রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকুমার গোবিন্দগঞ্জ থানার মহিমাগঞ্জে শুরু হয় রংপুর চিনিকলের
নির্মাণকাজ। ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ বছর পর শেষ হয় মিলটির নির্মাণকাজ। ১৯৫৭-৫৮
মৌসুম থেকেই আখ মাড়াইয়ের মাধ্যমে চিনি উৎপাদন শুরু হয় মিলটিতে। পশ্চিম জার্মানির
বাকাউ-উলফ নামের একটি কো¤পানি থেকে আনা মেশিনে ৩৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠে মিলের
কারখানা ও কার্যালয়। ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রংপুর চিনিকলসহ সব
চিনিকলকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করেন। এ চিনিকলের কর্মকর্তাদের জন্য
আবাসিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। পুকুরসহ রেলওয়ে সাইডিংয়ের জায়গা ৮ একর, সাড়ে ১৪ একর
জায়গায় গড়ে ওঠে ৫০টি ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্র এবং ৮টি সাবজোন। এ ছাড়াও মিলের নিজস্ব খামারের
জমির পরিমাণ ১ হাজার ৮৩২ একর। ১৯৫৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬৩ বছরে ২২ হাজার ৯৮৫ দিনের
মধ্যে ৫ হাজার ৭৩৯ দিন ঘোরে মিলের চাকা। এ সময়কালে ৫৬ লক্ষ ৩৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে
উৎপাদন করা হয় ৪ লক্ষ ২৭ হাজার টন চিনি। রংপুর চিনিকলের ছিল নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা।
এখানকার পাওয়ার হাউসে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হতো।
চিনিকলের আখ পরিবহনের জন্য ছিল নিজস্ব রেলপথ। সেই রেলপথে নিজস্ব রেলের ইঞ্জিন ও মালবাহী
বগি দিয়ে পরিবহন করা হতো আখ, চিনি, চিটাগুড় ও জ্বালানিসহ নানা দ্রব্য। রংপুর চিনিকলকে
কেন্দ্র করে জাঁকজমক ছিল মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন। বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে
মহিমাগঞ্জ। শিক্ষার প্রসারেও অন্যতম ভূমিকা রাখে রংপুর চিনিকল উচ্চ বিদ্যালয়। সবকিছু মিলিয়ে
চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী, আখচাষিসহ অসংখ্য মানুষের আয়-রোজগারের পথ সৃষ্টি করেছিল
রংপুর চিনিকল। চিনিকল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে
তৎকালীন এরশাদ সরকারের শাসনামলে আধুনিকায়নের নামে কর্মকর্তাদের জন্য দামি গাড়ি-বাড়ি,
এ্যাম্বুলেন্স ও কারখানার কিছু সংস্কারের জন্য বিশ্ব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের আওতাধীন চিনিকলগুলোকে। এসব ঋণ এখন গলার কাঁটা
হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনিকলগুলোর। রংপুর চিনিকলের বর্তমানে ৫০০ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত
লোকসানের প্রধান কারণ বিশ্ব ব্যাংকের এ ঋণ বলে অভিযোগ করেছেন তারা। রংপুর চিনিকলের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ইনচার্জ) মাসুমা আকতার জাহান বরেন, চালু অবস্থায় এ চিনিকলের
শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের জন্য বেতনভাতা বাবদ মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা প্রয়োজন
হতো। সরকারি সিদ্ধান্তে মাড়াই বন্ধ হওয়া এ চিনিকলের বিপুল পরিমাণ স¤পদ রক্ষায় বর্তমানে ৭
জন স্থায়ী কর্মকর্তা ও ৭৫ জন অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর বেতনভাতা ১৮ লক্ষ টাকা। রংপুর চিনিকল
শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম স¤পাদক ফারুক হোসেন ফটু বলেন, দেশের কৃষক-
শ্রমিকদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্প বন্ধ করে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত চলছে।
চিনিকলটি বন্ধ হয়ে থাকায় এ জনপদের সব স্তরে অন্ধকার নেমে এসেছে। কৃষক ও শ্রমিকবান্ধব
বর্তমান সরকার অসাধু সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে পুনরায় চিনিকলটি
আধুনিকায়নের মাধ্যমে চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি করেন তিনি। আখচাষি ফেরদৌস আলম
অভিযোগ করে বলেন, রংপুর চিনিকলের চেয়ে অনেক কম মাড়াই ক্ষমতাস¤পন্ন জয়পুরহাট
চিনিকলের আখ জোন এলাকায় আখও উৎপাদন হয় কয়েকগুণ কম। তারপরও ওই মিলটি চালু রেখে ৫০
থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের রংপুর চিনিকলের আখ এবং ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের
শ্যামপুর চিনিকলের আখ জয়পুরহাটে পরিবহন করতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। জয়পুরহাট ও শ্যামপুরের
মধ্যবর্তী স্থানের রংপুর চিনিকলটি চালু রাখলে সরকারকে এই অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হতো না।
চিনিশিল্প রক্ষার পাশাপাশি বন্যা-ভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যন্ত জনপদ
গাইবান্ধার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য দ্রুত রংপুর চিনিকলসহ বন্ধ সব চিনিকল চালু করার জন্য
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন এলাকার কৃষক ও শ্রমিক-
কর্মচারীসহ সব স্তরের মানুষ।


























