চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক ব্রিকফিল্ডে সরকারী রিজার্ভ ফরেষ্টের জ্বালানী কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব চলছে। রিজার্ভ ফরেষ্টের ছোট বড় গাছ কেটে জ্বালানী কাঠ হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে ইটভাটায়। এতে বন বিভাগের অসংখ্য পাহাড় ন্যাড়া হয়ে তার সবুজ বনবনানির চেহারা হারিয়ে জিরে রুপ হারাতে বসেছে।
সরকার বনাঞ্চলের কাঠ যাতে ইটভাটায় জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার না হয়, সেইজন্য কয়লা পোড়ানোর বিষয়ে আইন করলেও চট্টগ্রামের ব্রিকফিল্ড গুলোতে তা মানা হচ্ছেনা। তবে গুটিকয়েক ব্রিকফিল্ডের ভাটির সামনে কয়েকশত কেজি কয়লা স্যাম্পল হিসাবে রেখে বেশীর ভাগ ব্রিকফিল্ডে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। চট্টগ্রামের ব্রিকফিল্ডের রাজধানী খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর, ইসলামপুর ইউনিয়নসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার ব্রিকফিল্ড ঘুরে দেখা গেছে এমন ভয়াবহ চিত্র। গত দুই মাসে এসব ব্রিকফিল্ডে কোটি কোটি মেট্টিক টন কাঠ পোড়ানো হয়েছে দেদারসে। আগামী আরো চার মাসে আরো কোটি কোটি মেট্টিক টন কাঠ পোড়ানোর জন্য সব ধরনের আয়োজন চলছে। সরকারী রিজার্ভ ফরেষ্টের কাঠ অবাধে ইটভাটায় পোড়ানো হলেও বন বিভাগ এই খাত থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা তা পাচ্ছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে। সংঘবদ্ধ চোরাই কাঠ ব্যবসায়িরা ইট পোড়ানোর মওসুম শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে সরকারী রিজার্ভ ফরেষ্টের গাছ কেটে জ্বালানী কাঠ মজুদ করে নির্দিষ্ট ডিপোতে। এছাড়া আশেপাশের ব্যক্তি মালিকানাধীন গাছ বাগান থেকেও গাছ সংগ্রহ করে মজুদ করে নির্দিষ্ট ডিপোতে। বিভিন্ন এলাকার বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা- কর্মচারিদের ম্যানেজ করে চোরাই কাঠ পাচারকারিরা ট্রাক, চাঁদের গাড়ীসহ বিভিন্ন পরিবহণের মাধ্যমে এসব কাঠ কন্ট্রাক করা ব্রিকফিল্ড গুলোতে পৌঁছে দিচ্ছে কাঠ ব্যবসায়িরা। কোন কোন এলাকায় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের চাপে পড়ে এসব জ্বালানী কাঠের বন বিভাগের পারমিট নেওয়া হলেও বেশীর ভাগ কাঠ চোরাই পথে পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন ব্রিকফিল্ডের মালিকদের কাছে। প্রতিটি ব্রিকফিল্ডের ইটভাটার চারিদিকে মজুদ করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানী কাঠ। কম সময়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানী কাঠ ভাটায় দেয়ার জন্য ভাটার প্লার্টফর্মের কাছেই এসব কাঠ মজুদ রাখা হয়েছে বলে ইটভাটার শ্রমিকরা জানিয়েছেন। এছাড়া ব্রিকফিল্ডের খোলা জায়গায় মজুদ করা আছে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানী কাঠ। ইটভাটায় রাত – দিন সমানে জ্বলছে কাঠ। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, পটিয়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার সাথে লাগানো। ফলে চট্টগ্রাম বন বিভাগ নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বন বিভাগের রিজার্ভ ফরেষ্ট থেকে চোরাই পথে আসছে জ্বালানী কাঠ। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অর্ধ শতাধিক ব্রিক ফিল্ডে অবাধে জ্বালানো হচ্ছে কাঠ। পাশ্ববর্তী বান্দরবান জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে রাতের আঁধারে ট্রাকভর্তি কাঠ সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার ব্রিকফিল্ডে আনা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলাটি রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাখে লাগানো। সরকারী বিধি মালায় রয়েছে বন বিভাগের রিজার্ভ ফরেষ্টের তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকার আশেপাশে কোন ধরনের ব্রিকফিল্ড গড়ে তোলা যাবে না। সরকারী এই বিধি নিষেধকে উপেক্ষা করা রাঙ্গুনিয়ায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে শতাধিক ব্রিকফিল্ড। এর মধ্যে প্রায় ৭০ টি ব্রিকফিল্ড গড়ে উঠেছে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানাগর, ইসলামপুর ও দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নে। রাজানগর ইউনিয়নের চট্টগ্রাম – রাঙ্গামাটি সড়কের দুইপাশে রানীরহাট ও গাবতল এলাকায় অবৈধ ভাবে একটির পাশে আরেকটি ব্রিকফিল্ড গড়ে তুলে পরিবেশ বিপর্যয় হলেও প্রশাসন বরাবরের মতো নীরব। বছরের পর বছর ধরে এসব ব্রিকফিল্ডে ইট পোড়ানো হচ্ছে কোন রকমের বাঁধা বিপত্তি ছাড়াই। সারসারি ব্রিকফিল্ড গড়ে উঠায় চট্টগ্রামে রানীরহাটকে ব্রিকফিল্ডের রাজধানী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে স্থানীয়দের কাছে। একইভাবে রাউজান উপজেলার উত্তর রাউজান চট্টগ্রাম – রাঙ্গামাটি সড়কের দুইপাশে গড়ে উঠেছে সারি সারি ব্রিকফিল্ড। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, বাঁশখালী, নগরীর আশেপাশের এলাকাসহ প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে কম বেশী ব্রিকফিল্ড। এসব ব্রিকফিল্ডের বেশীর ভাগে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে জ্বালানী কাঠ। তবে গুটিকয়েক ব্রিকফিল্ডে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে কয়লা। এসব ব্রিকফিল্ড পরিপূর্ণ ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ বান্ধব ব্রিকফিল্ড হিসাবে।
চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন ব্রিকফিল্ড মালিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানী কাঠ সরবরাহের সাথে জড়িত রয়েছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সিণ্ডিকেট। এলাকার প্রভাবশালী এই সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে জ্বালানী কাঠের ব্যবসা। শত শত কোটি টাকার বানিজ্যকে ঘিরে রয়েছে ব্রিকফিল্ডে জ্বালানী কাঠ সরবরাহের মহোৎসব। এই শক্তিশারী সিণ্ডিকেটের ইচ্ছে মাফিক দামেই অনেক ব্রিকফিল্ড মালিককে জ্বালানী কাঠ কিনে ইটভাটায় ব্যবহার করতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছর ইটভাটার জ্বালানী কাঠের দাম বাড়তে থাকায় ইট পোড়ানোর জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হয় ইটভাটার মালিকদের। ফলে প্রতিবছর ইটভাটায় দাম বাড়ে সব ধরনের ইটের। একই ভাবে চলতি মওসুমেও ইটভাটায় নতুন ভাবে তৈরি ইটের দাম কম বেশী বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রিঝার্ভ ফরেষ্টের জ্বালানী কাঠ যাতে,অবৈধ পথে আসতে না পারে, তার জন্য বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ব্রিকফিল্ডে গিয়ে বন বিভাগ অভিযান করার নিয়ম না থাকায় বন বিভাগ একা এই অভিযান করতে পারেনা। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ব্রিকফিল্ডে অভিযান চালানোর উদ্যোগের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কাজ চলছে। সড়ক ও নদী পথে বন বিভাগ কড়া নজরদারি রেখে কাজ করছে। বনাঞ্চলের পরিবেশ ঠিক রাখতে অবৈধ ভাবে কাঠ পাচার রোধে বন বিভাগের সাথে সকলকে সচেতনতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে।





















