০২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নজরুলের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের এক রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ পাবনা সফরে গিয়ে একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তিনি যেহেতু রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং বিটিভি ও বেতারে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন সেহেতু সেই স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দুটি সমস্যা তার কাছে জানতে চেয়েছিল। প্রথমটি হলো, নজরুল ইসলাম দেখাবার জন্য কবিতার যে খাতাটি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন; রবীন্দ্রনাথ সেই খাতার কবিতা থেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো, নজরুল ইসলাম যেহেতু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি হয়ে উঠছিলেন, সেহেতু তাকে রোধ করার জন্য নিজের ভাতিজির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে পাগল করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি আমি সেই রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় একজন ছাত্রীর কাছে জেনেছিলাম। এ ধরনের ঘটনা এখানেই শেষ নয়, ঢাকার একটি সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক, আমার পারিবারিক আত্মীয়, তিনি যখন জানতে পারলেন আমি নজরুলের ওপর গবেষণা করছি তখন তিনি মহোৎসাহে বললেন, রবীন্দ্রনাথকে তার পছন্দ নয়। কারণ জানতে চাইলে তিনি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মতো উপরোক্ত দুটি বিষয় আমাকে অবহিত করেন। বস্তুত, শৈশবে আমি এসব কথা জেনেছিলাম।

অথচ কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অভীপ্সা ছিল পৃথিবীতে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করলে কেবল রবীন্দ্র কাব্যগীতি গাহন করে জীবন কাটিয়ে দেবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) নজরুলকে মনে করতেন কালের ভাষা যার কাব্যে বাণী পায় সে কবি নয় মহাকবি। বাংলা সাহিত্যের এই দুই মহান কবি পুরুষের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের, গুরু-শিষ্যের মতো। দু-একটি ক্ষেত্রে মতান্তর-মনান্তরে পরিণত ছাড়া জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ সম্পর্কের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে শৈশবে নজরুল জীবনে একটি ঘটনা ঘটে; এ ধরনের ঘটনা বিশ্বসাহিত্যেও বোধ করি বিরল। বিশ্বকবিকে ভালোবাসার ফলে শিশু বিদ্রোহী কবিকে মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়; এই মামলার রায়ে আদালত চলাকালীন তাকে নাকি কয়েক ঘণ্টা আটক থাকতেও হয়েছিল। ঘটনাটি এমন, কবি তখন শিয়ারশোল রাজ হাই স্কুলের ছাত্র। কবির এক স্কুলবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে অপবাদ দিয়ে বলেছিল, বড় লোকের ছেলে, কেবল টাকার জোরে নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। আসলে তার লেখা উঁচু স্তরের নয়। কিশোর কবি তার এ কথায় বাধা দিয়ে বলে, মোটেও নয়, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লেখক। কিন্তু কিশোর কবির কিশোর বন্ধু তার কথায় সম্মত না হওয়ায় বাঁশের লাঠি দিয়ে নজরুল তার মাথায় আঘাত করলেন। আঘাতটি বেশ জোরেই লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত এটি মামলা পর্যন্ত গড়ায়। নজরুল ইসলাম পরবর্তী জীবনে কবি গুরুর প্রতি অভিমানী প্রবন্ধ ‘বড় পিরীতি বালির বাঁধ’-এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইস্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ ধূপ ফুলচন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোক কত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে। এমনকি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্রবিদ্বেষী কোনো একজনের মাথার চাদিতে আজও অক্ষয় হয়ে লেখা আছে এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।’

১৯২০ সালে বাঙালি রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর নজরুল ইসলাম কলকাতায় চলে এসে বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের আশ্রয় থেকে চলে এসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ অফিসে বসবাস শুরু করেন। কবি বন্ধু মুজাফফর আহমদের কাছে আমরা জানতে পারি কবি পল্টন থেকে যে সামান্য সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন তার অধিকাংশ ছিল রবীন্দ্রসংগীতের ‘স্বরলিপি’। কবি যেখানেই যেতেন গানের অনুরোধ পেলেই নিজের গান রেখে রবীন্দ্রনাথের গান শুরু করতেন। সবাই তাকে বলতেন রবীন্দ্রসংগীতের হাফিজ। একজন মানুষের কী করে এত রবীন্দ্রসংগীত মুখস্থ থাকতে পারে এ কথা ভেবেই সবাই আশ্চর্য হতেন।

ভালোবাসাটা কিন্তু আদৌ একপক্ষীয় ছিল না; কবিগুরু এই ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যথাসময়ে। নজরুলের কবিতা পড়ে মুগ্ধ কবি ঠাকুর তাকে দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়েছেন, পরিচিতদের ধরে বলেছেন, একদিন ওকে নিয়ে এসো। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা আছে। নজরুল পল্টন থেকে ফিরে যখন কবি হিসেবে কিছুটা নাম করছিলেন; সেই সময়ে ১৯২০/২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৬ মাস রবীন্দ্রনাথ দেশের বাইরে ছিলেন। অনেকের দাবি ১৯২১ সালের ৪ মে রবীন্দ্রনাথের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবিগুরু নজরুলকে ডেকে তার পাশে বসান। তবে ১৯২২ সালের ১১ জুলাই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে রামমোহন লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তার পাশে বসিয়েছিলেন এটি হয়তো মিথ্যা নয়। কারণ ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতনে যান। রবীন্দ্রনাথ তার স্বভাব অনুসারে নজরুলকে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের শরীর চর্চার শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে বলেন, সেই সঙ্গে তাকেও দিনেন্দ্রনাথের কাছে গানের তালিম নিতে বলেন।

নজরুল যখন হুগলি জেলে বন্দি, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ নামক গীতি নাটিকাটি উৎসর্গ করেন নজরুলের নামে। উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল, ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু।’ তারিখ ১৩২৯ সালে ৯ ফাল্গুন। রবীন্দ্র জীবনে এটিও একটি ব্যতিক্রম ঘটনা, নজরুল জীবনেও। কেননা বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে এই বিরল সৌভাগ্য নজরুলই অর্জন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার পরিবারের বাইরের কবি সাহিত্যিককে খুব বেশি বই উৎসর্গ করেননি।
অনেক দুর্মুখ রবীন্দ্রনাথের ঔপনিবেশিকবাদের পক্ষাবলম্বনের কথা উল্লেখ করেন। তাদের কথার যুক্তি আছে, ১৯১১ সালে তলস্তয় মারা গেলেন, তখন বিশ্বজোড়া তার খ্যাতি, তাছাড়া পুঁজিবাদ এবং ভাববাদীদের গুরু তিনি, নোবেল কমিটির উদ্দেশ্যে এবং মানসিকতার সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না; তবু তাকে পুরস্কার না দিয়ে দেওয়া হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে। কেননা তলস্তয়ের সঙ্গে তাদের কোনো ঔপনিবেশিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ছিল না। তাছাড়া ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নোবেল পাওয়ার জন্য যে নামটি উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন টমাস হার্ডি; কিন্তু হার্ডিও নোবেল না পেয়ে মারা গেলেন। উদ্দেশ্য যে ঔপনিবেশিক শাসকদের ছিল না, তা কিন্তু বলা যায় না; তবে রবীন্দ্রনাথ কতখানি ঔপনিবেশিক হয়ে উঠেছিলেন সেটি দেখবার বিষয়। নজরুল ছিলেন আদ্যান্ত আপসহীন ঔপনিবেশিকবিরোধী, মনে হয় তার জন্মের লক্ষ্যই ছিল এটি। সেই নজরুলকে অকুণ্ঠ সমর্থন রবীন্দ্র মানসিকতার ঔপনিবেশিকবিরোধী হওয়ার আরেকটি প্রমাণ।

নজরুল যখন হুগলি জেলে জেল কর্তৃপক্ষের অসদাচরণের বিরুদ্ধে অনশনব্রত পালন করছিলেন। এই অনশন বিদ্রোহী কবির জীবন সংশয় করে তুলেছিল, এ সময়ে কবিগুরু নজরুলকে টেলিগ্রামে বলেন, Give up hunger strike our literature claims you, আমাদের সাহিত্যে যে নজরুলের প্রয়োজনীয়তা আছে তা রবীন্দ্রনাথ অকুণ্ঠ ভাষায় স্বীকার করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের এ সম্পর্ক বাহ্যিক শ্রদ্ধা নিবেদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। নজরুল বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথকে যেসব কবিতা রচনা করেছেন তা একত্র করলে একটি ভিন্ন গ্রন্থ হতে পারে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নজরুলের কয়েকটি রচনার পরিচিতি এখানে দেওয়া গেল-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘১৪০০ সাল’। এ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ সংশয় প্রকাশ করেন শতাব্দী পেরিয়ে কেউ তার কবিতা পড়বে কি না; কেননা তখন মানুষের রুচি এবং জীবনাভ্যাস পাল্টে যাবে; যদিও প্রকৃতির বিপুল সম্ভারের কথা মনে রেখে আশ্বস্ত হয়েছেন। নজরুল ইসলাম কবিঠাকুরের এই কবিতাটি পড়ে ‘১৪০০ সাল’ শিরোনামেই একটি কবিতা রচনা করেন। কবিতাটি ১৩৩৪ আষাঢ়ে কল্লোল পত্রিকার ‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটি মূলত রবীন্দ্রনাথের কবিতার জবাবি রচনা। অর্থাৎ নজরুল রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে বলছেন, আমরা এখনও মুগ্ধ ভরে তোমার কবিতার অমৃতসুধা পান করছি। তুমি না এলে আমাদের মনোজগত এবং প্রকৃতিজগত অনাবিস্তৃত রয়ে যেত। একটু উদ্ধৃতি দেওয়া যাক- ‘‘হে কবি শাহান-শাহ! তোমারে দেখিনি মোরা, সৃজিয়াছে যে তাজমহল- শ্বেতচন্দনের ফোঁটা কালের কপালে ঝলমল- বিস্ময়ে বিমুগ্ধ মোরা তাই শুধু হেরি যৌবনের অভিশাপ- ‘কেন তুই শতবর্ষ করিলি যে দেরী’ হায় মোরা আজ মোমতাজে দেখিনি, শুধু দেখিতেছি তাজ।’’ [১৪০০ সাল, চক্রবাক : নজরুল রচনাবলি, বাংলা একাডেমি প্রথম প্রকাশ, পৃ: ৫২৫]।

নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অশীতিতম’ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ নামক কবিতা রচনা করেন। এই কবিতায় নজরুল কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ কাব্যের বিষয় করে তোলেন। যেমন- বক্ষে ধরি তুমি- ললাটে চুমিয়া মোরে দানিলে আশিস! দেখেছিল যারা শুধু মোর উগ্র স্বরূপ- অশান্ত রোদন সেথা দেখেছিলে তুমি!

হে প্রেম সুন্দর মম, আমি নাহি জানি কে কত পেয়েছে তব প্রেম রস ধারা। আমি জানি তব প্রেম আমার আগুন নিভায়ে, দিয়াছে সেথা কান্তি অপরূপ! মনে পড়ে বলেছিলে হেসে একদিন, তরবারি দিয়ে তুমি চাচিতেছ দাড়ি! যে জ্যোতি করিতে পারে জ্যোতির্ময় ধারা- সে জ্যোতিরে অগ্নি করি হলে পুচ্ছ কেতু? [অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি : নজরুল রচনাবলি, বা/এ ৩য় খণ্ড পৃ-২১]

নজরুল যেমন ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি কবিতায় তরবারি দিয়ে দাড়ি চাচার কথা বলেছেন, তেমনি আমার ‘কৈফিয়ত’ কবিতাতেও বলেছেন, ‘গুরু কন তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাচা।’ রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে এ ধরনের একটি উক্তি করেছিলেন ভালোবেসে, নজরুল প্রতিভাকে যথার্থ পথে পরিচালিত করার জন্য। রবীন্দ্রনাথ যেমন নজরুলের প্রতি প্রত্যাশা করেছেন নজরুলও তেমন প্রত্যাশা করেছেন। নজরুল মনে করতেন রবীন্দ্রনাথের যে আকাশচুম্বী প্রতিভা, তা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া উচিত। কিশোর রবি কবিতায় নজরুল বলেছেন, হে রবি, তোমারে নারায়ণরূপে এ ভারত পূজা করে, যাইবার আগে, জাগাইয়া তুমি যাও সেই রূপ ধরে।

দৈত্যমুক্ত ব্রজের রাখাল কিশোররা ভয়হীন, খেলুক সর্ব-অভাবমুক্ত হয়ে ব্রজে নিশিদিন। হোক শান্তিনিকেতন এই অশান্তিময় ধরা-চিরতরে দূর হোক তব বরে নিরাশাক্লৈব্য জরা। [কিশোর রবি ও নতুন চাঁদ, নজরুল রচনাবলি বা, এ ও ৩য় খণ্ড পৃ: ২৫]।

 

‘কিশোর রবি’ কবিতায় যেমন নজরুল দৈত্যমুক্ত ভারত দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তেমনি ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, হতাশা ব্যক্ত করেছেন- ‘রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে- সে কর শুধু পুছল না মা অন্ধকারার বন্ধ ঘরে-গগন পথে রবির রথে সাত সারথি হাঁকায় ঘোড়া- মত্যে দানব-মানব পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোড়া।’ নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথকে সর্বদা সূর্যসন্তান মনে করেছেন, সূর্যের অপর নাম ‘রবি’। রবিকে নজরুল সূর্যের সমান্তরাল করে তুলেছেন। সূর্য ছাড়া যেমন পৃথিবীর অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না। ‘রবির জন্ম তিথি’ কবি নজরুল লিখেছেন- ‘রবি শাশ্বত, তার নিত্য প্রকাশ- কবিতা ও গান সুর-নদী হয়ে বয় রবি যদি মরে যায় পৃথিবী কি রয়!’ (রবির জন্ম তিথি ও শেষ সওগাত নজরুল রচনাবলি, ৩য় খণ্ড বা, এ পৃ ৩১৭]।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু সংবাদ শুনেও নজরুল ইসলাম একাধিক কবিতা রচনা করেছিলেন। ‘রবি হারা’ নামের কবিতাটি বিশ্বকবির মৃত্যুর দিনই কলকাতা বেতারে প্রচারিত হয়। এই কবিতায় নজরুল বলেছেন- ভূ-ভারতজুড়ে হিংসা করেছে এই বাঙলার তরে- আকাশের রবি কেমনে আসিল বাংলার কুঁড়েঘরে। এত বড়, এত মহৎ বিশ্ববিজয়ী মহামানব বাংলার দীনহীন আঙিনায় এত পারমোৎসব। (প্রাগুক্ত পৃ. ৫৪১), ‘সালাম অস্ত রবি’ কবিতায় নজরুল বলেছেন, ‘ব্যাস, বাল্মীকি, কালিদাস, খৈয়াম, হাফিজ ও রুমি, আরবের ইমরুল কায়েস যে ছিলে এক সঙ্গে তুমি?’

নজরুল ভিন্ন বিশ্বের অন্য কোনো ভাষার একজন বড় কবি তার পূর্বজ কোনো বড় কবিকে নিয়ে এত বেশি কবিতা রচনা করেননি। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের এই মধুর সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, সামান্য সময়ের জন্য। তার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। তবে দুপক্ষের ভুল-বোঝাবুঝির মধ্যে শনিবারি গোষ্ঠী ইন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে অবশ্য বাংলা সাহিত্য কিছু লাভ হয়েছে ‘বড়র পিরীতি বালির বাধ’-এর মতো শক্তিশালী লেখা নজরুলের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছ। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন- দুজনই আপস-মীমাংসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নজরুল এ সময়ে তার সঞ্চিতা বিশ্বকবিকে উৎসর্গ ছাড়াও তার ‘নাগরিক’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়ে পত্র পাঠিয়েছিলেন। এর জবাবে রবীন্দ্রনাথ লেখেন- ‘কল্যাণ হয়েছে; অনেকদিন পরে তোমার সাড়া পেয়ে মন খুব খুশি হলো। কিছু দাবি করেছ- তোমার দাবি অস্বীকার করা আমার পক্ষে কঠিন। সাহিত্যে পরস্পর খোঁচাখুঁচির প্রাদুর্ভাব কেবল দুঃখকর নয়, আমার কাছে লজ্জাজনক বোধ হয়। তুমি কবি এই প্রাচীন কবি তোমার কাছ থেকে আর কিছু না হোক করুণা দাবি করতে পারে। আকিঞ্চনের কাছে প্রার্থনা করে তাকে লজ্জা দিও না। শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি পাশের জিলায়। কখনো যদি ওই সীমানা পেরিয়ে আমাদের দিকে আসতে পারো, খুশি হব। স্বচক্ষে আমার অবস্থাও দেখে যেতে পারো।’ এই পত্র পেয়ে নজরুল ব্যাকুল হয়ে ‘তীর্থ পথিক’ নামের কবিতা রচনা করেন। এই কবিতায় নজরুল বলেন- ‘হে কবি, হে কবি, অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা। পর্বতসম শত দোষত্রুটি ও চরণে হলো জমা। জানি জানি তার ক্ষমা নাই, দেব, তবু কেন মনে জাগে- তুমি মহর্ষি করিয়াছ ক্ষমা আমি চাহিবার আগে। প্রার্থনা আর, যদি আবার জন্মি এ ধরণীতে, আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে।’ (প্রাগুক্ত : পৃ ৫৪১]

এসব কবিতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাধিক গানও রচনা করেছেন নজরুল ইসলাম। উপযুক্ত গান কবিতা থেকেই নজরুল রবীন্দ্র সম্পর্কের কথা আঁচ করা যায়। যখন ‘শনিবারের চিঠি’ গোষ্ঠী এবং তথাকথিত ঔপনিবেশিক শিক্ষিতজনেরা নজরুলকে খারিজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল তখন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের জন্য বড় পাথেয় ছিলেন।

যে প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন নজরুল ১৩/১৪ বছরের এক বালক, প্রচলিত অর্থে যাকে লেখক বলে নজরুল তখন তা ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার ৭/৮ বছর পর নজরুল ইসলাম লিখতে শুরু করেছেন। তাছাড়া নজরুলের স্ত্রী শ্রীমতি প্রমীলা খুবই ভালো মেয়ে ছিলেন; যিনি রবীন্দ্রনাথের কোনো আত্মীয় ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্যক্তিক সংকীর্ণতা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল মিলেই বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের কালপর্ব পূর্ণ করেছেন।

নারায়ণগঞ্জে জামতলা পঞ্চায়েত কমিটির নির্বাহী পর্ষদের বিশেষ সভা

নজরুলের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ

আপডেট সময় : ০৬:২৯:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৪

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের এক রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ পাবনা সফরে গিয়ে একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তিনি যেহেতু রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং বিটিভি ও বেতারে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন সেহেতু সেই স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দুটি সমস্যা তার কাছে জানতে চেয়েছিল। প্রথমটি হলো, নজরুল ইসলাম দেখাবার জন্য কবিতার যে খাতাটি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন; রবীন্দ্রনাথ সেই খাতার কবিতা থেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো, নজরুল ইসলাম যেহেতু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি হয়ে উঠছিলেন, সেহেতু তাকে রোধ করার জন্য নিজের ভাতিজির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে পাগল করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি আমি সেই রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় একজন ছাত্রীর কাছে জেনেছিলাম। এ ধরনের ঘটনা এখানেই শেষ নয়, ঢাকার একটি সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক, আমার পারিবারিক আত্মীয়, তিনি যখন জানতে পারলেন আমি নজরুলের ওপর গবেষণা করছি তখন তিনি মহোৎসাহে বললেন, রবীন্দ্রনাথকে তার পছন্দ নয়। কারণ জানতে চাইলে তিনি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মতো উপরোক্ত দুটি বিষয় আমাকে অবহিত করেন। বস্তুত, শৈশবে আমি এসব কথা জেনেছিলাম।

অথচ কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অভীপ্সা ছিল পৃথিবীতে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করলে কেবল রবীন্দ্র কাব্যগীতি গাহন করে জীবন কাটিয়ে দেবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) নজরুলকে মনে করতেন কালের ভাষা যার কাব্যে বাণী পায় সে কবি নয় মহাকবি। বাংলা সাহিত্যের এই দুই মহান কবি পুরুষের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের, গুরু-শিষ্যের মতো। দু-একটি ক্ষেত্রে মতান্তর-মনান্তরে পরিণত ছাড়া জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ সম্পর্কের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে শৈশবে নজরুল জীবনে একটি ঘটনা ঘটে; এ ধরনের ঘটনা বিশ্বসাহিত্যেও বোধ করি বিরল। বিশ্বকবিকে ভালোবাসার ফলে শিশু বিদ্রোহী কবিকে মামলায় জড়িয়ে পড়তে হয়; এই মামলার রায়ে আদালত চলাকালীন তাকে নাকি কয়েক ঘণ্টা আটক থাকতেও হয়েছিল। ঘটনাটি এমন, কবি তখন শিয়ারশোল রাজ হাই স্কুলের ছাত্র। কবির এক স্কুলবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে অপবাদ দিয়ে বলেছিল, বড় লোকের ছেলে, কেবল টাকার জোরে নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। আসলে তার লেখা উঁচু স্তরের নয়। কিশোর কবি তার এ কথায় বাধা দিয়ে বলে, মোটেও নয়, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লেখক। কিন্তু কিশোর কবির কিশোর বন্ধু তার কথায় সম্মত না হওয়ায় বাঁশের লাঠি দিয়ে নজরুল তার মাথায় আঘাত করলেন। আঘাতটি বেশ জোরেই লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত এটি মামলা পর্যন্ত গড়ায়। নজরুল ইসলাম পরবর্তী জীবনে কবি গুরুর প্রতি অভিমানী প্রবন্ধ ‘বড় পিরীতি বালির বাঁধ’-এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ‘বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইস্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ ধূপ ফুলচন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোক কত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছে। এমনকি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্রবিদ্বেষী কোনো একজনের মাথার চাদিতে আজও অক্ষয় হয়ে লেখা আছে এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।’

১৯২০ সালে বাঙালি রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর নজরুল ইসলাম কলকাতায় চলে এসে বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের আশ্রয় থেকে চলে এসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ অফিসে বসবাস শুরু করেন। কবি বন্ধু মুজাফফর আহমদের কাছে আমরা জানতে পারি কবি পল্টন থেকে যে সামান্য সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন তার অধিকাংশ ছিল রবীন্দ্রসংগীতের ‘স্বরলিপি’। কবি যেখানেই যেতেন গানের অনুরোধ পেলেই নিজের গান রেখে রবীন্দ্রনাথের গান শুরু করতেন। সবাই তাকে বলতেন রবীন্দ্রসংগীতের হাফিজ। একজন মানুষের কী করে এত রবীন্দ্রসংগীত মুখস্থ থাকতে পারে এ কথা ভেবেই সবাই আশ্চর্য হতেন।

ভালোবাসাটা কিন্তু আদৌ একপক্ষীয় ছিল না; কবিগুরু এই ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যথাসময়ে। নজরুলের কবিতা পড়ে মুগ্ধ কবি ঠাকুর তাকে দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়েছেন, পরিচিতদের ধরে বলেছেন, একদিন ওকে নিয়ে এসো। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা আছে। নজরুল পল্টন থেকে ফিরে যখন কবি হিসেবে কিছুটা নাম করছিলেন; সেই সময়ে ১৯২০/২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৬ মাস রবীন্দ্রনাথ দেশের বাইরে ছিলেন। অনেকের দাবি ১৯২১ সালের ৪ মে রবীন্দ্রনাথের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবিগুরু নজরুলকে ডেকে তার পাশে বসান। তবে ১৯২২ সালের ১১ জুলাই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে রামমোহন লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তার পাশে বসিয়েছিলেন এটি হয়তো মিথ্যা নয়। কারণ ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতনে যান। রবীন্দ্রনাথ তার স্বভাব অনুসারে নজরুলকে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের শরীর চর্চার শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে বলেন, সেই সঙ্গে তাকেও দিনেন্দ্রনাথের কাছে গানের তালিম নিতে বলেন।

নজরুল যখন হুগলি জেলে বন্দি, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বসন্ত’ নামক গীতি নাটিকাটি উৎসর্গ করেন নজরুলের নামে। উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল, ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু।’ তারিখ ১৩২৯ সালে ৯ ফাল্গুন। রবীন্দ্র জীবনে এটিও একটি ব্যতিক্রম ঘটনা, নজরুল জীবনেও। কেননা বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে এই বিরল সৌভাগ্য নজরুলই অর্জন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার পরিবারের বাইরের কবি সাহিত্যিককে খুব বেশি বই উৎসর্গ করেননি।
অনেক দুর্মুখ রবীন্দ্রনাথের ঔপনিবেশিকবাদের পক্ষাবলম্বনের কথা উল্লেখ করেন। তাদের কথার যুক্তি আছে, ১৯১১ সালে তলস্তয় মারা গেলেন, তখন বিশ্বজোড়া তার খ্যাতি, তাছাড়া পুঁজিবাদ এবং ভাববাদীদের গুরু তিনি, নোবেল কমিটির উদ্দেশ্যে এবং মানসিকতার সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না; তবু তাকে পুরস্কার না দিয়ে দেওয়া হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে। কেননা তলস্তয়ের সঙ্গে তাদের কোনো ঔপনিবেশিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ছিল না। তাছাড়া ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নোবেল পাওয়ার জন্য যে নামটি উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন টমাস হার্ডি; কিন্তু হার্ডিও নোবেল না পেয়ে মারা গেলেন। উদ্দেশ্য যে ঔপনিবেশিক শাসকদের ছিল না, তা কিন্তু বলা যায় না; তবে রবীন্দ্রনাথ কতখানি ঔপনিবেশিক হয়ে উঠেছিলেন সেটি দেখবার বিষয়। নজরুল ছিলেন আদ্যান্ত আপসহীন ঔপনিবেশিকবিরোধী, মনে হয় তার জন্মের লক্ষ্যই ছিল এটি। সেই নজরুলকে অকুণ্ঠ সমর্থন রবীন্দ্র মানসিকতার ঔপনিবেশিকবিরোধী হওয়ার আরেকটি প্রমাণ।

নজরুল যখন হুগলি জেলে জেল কর্তৃপক্ষের অসদাচরণের বিরুদ্ধে অনশনব্রত পালন করছিলেন। এই অনশন বিদ্রোহী কবির জীবন সংশয় করে তুলেছিল, এ সময়ে কবিগুরু নজরুলকে টেলিগ্রামে বলেন, Give up hunger strike our literature claims you, আমাদের সাহিত্যে যে নজরুলের প্রয়োজনীয়তা আছে তা রবীন্দ্রনাথ অকুণ্ঠ ভাষায় স্বীকার করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের এ সম্পর্ক বাহ্যিক শ্রদ্ধা নিবেদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। নজরুল বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথকে যেসব কবিতা রচনা করেছেন তা একত্র করলে একটি ভিন্ন গ্রন্থ হতে পারে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নজরুলের কয়েকটি রচনার পরিচিতি এখানে দেওয়া গেল-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘১৪০০ সাল’। এ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ সংশয় প্রকাশ করেন শতাব্দী পেরিয়ে কেউ তার কবিতা পড়বে কি না; কেননা তখন মানুষের রুচি এবং জীবনাভ্যাস পাল্টে যাবে; যদিও প্রকৃতির বিপুল সম্ভারের কথা মনে রেখে আশ্বস্ত হয়েছেন। নজরুল ইসলাম কবিঠাকুরের এই কবিতাটি পড়ে ‘১৪০০ সাল’ শিরোনামেই একটি কবিতা রচনা করেন। কবিতাটি ১৩৩৪ আষাঢ়ে কল্লোল পত্রিকার ‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটি মূলত রবীন্দ্রনাথের কবিতার জবাবি রচনা। অর্থাৎ নজরুল রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে বলছেন, আমরা এখনও মুগ্ধ ভরে তোমার কবিতার অমৃতসুধা পান করছি। তুমি না এলে আমাদের মনোজগত এবং প্রকৃতিজগত অনাবিস্তৃত রয়ে যেত। একটু উদ্ধৃতি দেওয়া যাক- ‘‘হে কবি শাহান-শাহ! তোমারে দেখিনি মোরা, সৃজিয়াছে যে তাজমহল- শ্বেতচন্দনের ফোঁটা কালের কপালে ঝলমল- বিস্ময়ে বিমুগ্ধ মোরা তাই শুধু হেরি যৌবনের অভিশাপ- ‘কেন তুই শতবর্ষ করিলি যে দেরী’ হায় মোরা আজ মোমতাজে দেখিনি, শুধু দেখিতেছি তাজ।’’ [১৪০০ সাল, চক্রবাক : নজরুল রচনাবলি, বাংলা একাডেমি প্রথম প্রকাশ, পৃ: ৫২৫]।

নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অশীতিতম’ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ নামক কবিতা রচনা করেন। এই কবিতায় নজরুল কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ কাব্যের বিষয় করে তোলেন। যেমন- বক্ষে ধরি তুমি- ললাটে চুমিয়া মোরে দানিলে আশিস! দেখেছিল যারা শুধু মোর উগ্র স্বরূপ- অশান্ত রোদন সেথা দেখেছিলে তুমি!

হে প্রেম সুন্দর মম, আমি নাহি জানি কে কত পেয়েছে তব প্রেম রস ধারা। আমি জানি তব প্রেম আমার আগুন নিভায়ে, দিয়াছে সেথা কান্তি অপরূপ! মনে পড়ে বলেছিলে হেসে একদিন, তরবারি দিয়ে তুমি চাচিতেছ দাড়ি! যে জ্যোতি করিতে পারে জ্যোতির্ময় ধারা- সে জ্যোতিরে অগ্নি করি হলে পুচ্ছ কেতু? [অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি : নজরুল রচনাবলি, বা/এ ৩য় খণ্ড পৃ-২১]

নজরুল যেমন ‘অশ্রু-পুষ্পাঞ্জলি কবিতায় তরবারি দিয়ে দাড়ি চাচার কথা বলেছেন, তেমনি আমার ‘কৈফিয়ত’ কবিতাতেও বলেছেন, ‘গুরু কন তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাচা।’ রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে এ ধরনের একটি উক্তি করেছিলেন ভালোবেসে, নজরুল প্রতিভাকে যথার্থ পথে পরিচালিত করার জন্য। রবীন্দ্রনাথ যেমন নজরুলের প্রতি প্রত্যাশা করেছেন নজরুলও তেমন প্রত্যাশা করেছেন। নজরুল মনে করতেন রবীন্দ্রনাথের যে আকাশচুম্বী প্রতিভা, তা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া উচিত। কিশোর রবি কবিতায় নজরুল বলেছেন, হে রবি, তোমারে নারায়ণরূপে এ ভারত পূজা করে, যাইবার আগে, জাগাইয়া তুমি যাও সেই রূপ ধরে।

দৈত্যমুক্ত ব্রজের রাখাল কিশোররা ভয়হীন, খেলুক সর্ব-অভাবমুক্ত হয়ে ব্রজে নিশিদিন। হোক শান্তিনিকেতন এই অশান্তিময় ধরা-চিরতরে দূর হোক তব বরে নিরাশাক্লৈব্য জরা। [কিশোর রবি ও নতুন চাঁদ, নজরুল রচনাবলি বা, এ ও ৩য় খণ্ড পৃ: ২৫]।

 

‘কিশোর রবি’ কবিতায় যেমন নজরুল দৈত্যমুক্ত ভারত দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তেমনি ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, হতাশা ব্যক্ত করেছেন- ‘রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে- সে কর শুধু পুছল না মা অন্ধকারার বন্ধ ঘরে-গগন পথে রবির রথে সাত সারথি হাঁকায় ঘোড়া- মত্যে দানব-মানব পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোড়া।’ নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথকে সর্বদা সূর্যসন্তান মনে করেছেন, সূর্যের অপর নাম ‘রবি’। রবিকে নজরুল সূর্যের সমান্তরাল করে তুলেছেন। সূর্য ছাড়া যেমন পৃথিবীর অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের অস্তিত্বের কথা ভাবা যায় না। ‘রবির জন্ম তিথি’ কবি নজরুল লিখেছেন- ‘রবি শাশ্বত, তার নিত্য প্রকাশ- কবিতা ও গান সুর-নদী হয়ে বয় রবি যদি মরে যায় পৃথিবী কি রয়!’ (রবির জন্ম তিথি ও শেষ সওগাত নজরুল রচনাবলি, ৩য় খণ্ড বা, এ পৃ ৩১৭]।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু সংবাদ শুনেও নজরুল ইসলাম একাধিক কবিতা রচনা করেছিলেন। ‘রবি হারা’ নামের কবিতাটি বিশ্বকবির মৃত্যুর দিনই কলকাতা বেতারে প্রচারিত হয়। এই কবিতায় নজরুল বলেছেন- ভূ-ভারতজুড়ে হিংসা করেছে এই বাঙলার তরে- আকাশের রবি কেমনে আসিল বাংলার কুঁড়েঘরে। এত বড়, এত মহৎ বিশ্ববিজয়ী মহামানব বাংলার দীনহীন আঙিনায় এত পারমোৎসব। (প্রাগুক্ত পৃ. ৫৪১), ‘সালাম অস্ত রবি’ কবিতায় নজরুল বলেছেন, ‘ব্যাস, বাল্মীকি, কালিদাস, খৈয়াম, হাফিজ ও রুমি, আরবের ইমরুল কায়েস যে ছিলে এক সঙ্গে তুমি?’

নজরুল ভিন্ন বিশ্বের অন্য কোনো ভাষার একজন বড় কবি তার পূর্বজ কোনো বড় কবিকে নিয়ে এত বেশি কবিতা রচনা করেননি। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের এই মধুর সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, সামান্য সময়ের জন্য। তার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। তবে দুপক্ষের ভুল-বোঝাবুঝির মধ্যে শনিবারি গোষ্ঠী ইন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে অবশ্য বাংলা সাহিত্য কিছু লাভ হয়েছে ‘বড়র পিরীতি বালির বাধ’-এর মতো শক্তিশালী লেখা নজরুলের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছ। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন- দুজনই আপস-মীমাংসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নজরুল এ সময়ে তার সঞ্চিতা বিশ্বকবিকে উৎসর্গ ছাড়াও তার ‘নাগরিক’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়ে পত্র পাঠিয়েছিলেন। এর জবাবে রবীন্দ্রনাথ লেখেন- ‘কল্যাণ হয়েছে; অনেকদিন পরে তোমার সাড়া পেয়ে মন খুব খুশি হলো। কিছু দাবি করেছ- তোমার দাবি অস্বীকার করা আমার পক্ষে কঠিন। সাহিত্যে পরস্পর খোঁচাখুঁচির প্রাদুর্ভাব কেবল দুঃখকর নয়, আমার কাছে লজ্জাজনক বোধ হয়। তুমি কবি এই প্রাচীন কবি তোমার কাছ থেকে আর কিছু না হোক করুণা দাবি করতে পারে। আকিঞ্চনের কাছে প্রার্থনা করে তাকে লজ্জা দিও না। শুনেছি বর্ধমান অঞ্চলে তোমার জন্ম। আমরা থাকি পাশের জিলায়। কখনো যদি ওই সীমানা পেরিয়ে আমাদের দিকে আসতে পারো, খুশি হব। স্বচক্ষে আমার অবস্থাও দেখে যেতে পারো।’ এই পত্র পেয়ে নজরুল ব্যাকুল হয়ে ‘তীর্থ পথিক’ নামের কবিতা রচনা করেন। এই কবিতায় নজরুল বলেন- ‘হে কবি, হে কবি, অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা। পর্বতসম শত দোষত্রুটি ও চরণে হলো জমা। জানি জানি তার ক্ষমা নাই, দেব, তবু কেন মনে জাগে- তুমি মহর্ষি করিয়াছ ক্ষমা আমি চাহিবার আগে। প্রার্থনা আর, যদি আবার জন্মি এ ধরণীতে, আসি যেন শুধু গাহন করিতে তোমার কাব্য-গীতে।’ (প্রাগুক্ত : পৃ ৫৪১]

এসব কবিতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাধিক গানও রচনা করেছেন নজরুল ইসলাম। উপযুক্ত গান কবিতা থেকেই নজরুল রবীন্দ্র সম্পর্কের কথা আঁচ করা যায়। যখন ‘শনিবারের চিঠি’ গোষ্ঠী এবং তথাকথিত ঔপনিবেশিক শিক্ষিতজনেরা নজরুলকে খারিজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল তখন রবীন্দ্রনাথ নজরুলের জন্য বড় পাথেয় ছিলেন।

যে প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন নজরুল ১৩/১৪ বছরের এক বালক, প্রচলিত অর্থে যাকে লেখক বলে নজরুল তখন তা ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার ৭/৮ বছর পর নজরুল ইসলাম লিখতে শুরু করেছেন। তাছাড়া নজরুলের স্ত্রী শ্রীমতি প্রমীলা খুবই ভালো মেয়ে ছিলেন; যিনি রবীন্দ্রনাথের কোনো আত্মীয় ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ব্যক্তিক সংকীর্ণতা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল মিলেই বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের কালপর্ব পূর্ণ করেছেন।