অটো রাইস মিলের প্রভাবে টিকতে না পেরে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে হাসকিং মিল (চালকল) বন্ধ হয়ে গেছে। টানা লোকসানের কারণে অনেক মিল বন্ধ করে দিয়েছেন মালিক পক্ষ। এ ছাড়া খাদ্য গুদামে সরকারের বেঁধে দেয়া চালের দামের সঙ্গে খোলা বাজারে দামে সমন্বয় না থাকা, অটো চালকলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জ, শ্রমিক সংকটসহ নানাবিধ কারণে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় বন্ধ হচ্ছে চালকল। অনেক চালকল মালিক মূলধন হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার অনেকে টিকতে না পেরে ভাড়া দিয়েছেন কল। কেউ কেউ আবার চাতালগুলোতে চালের পরিবর্তে ধানের চিটা থেকে গুড়া তৈরি করছেন বলে জানিয়েছেন মালিকরা। তাদের দাবি, এসব সমস্যার সমাধান করা না গেলে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী চালকল।
সরজমিন কুমারখালী পৌরসভার এলঙ্গীপাড়া, তেবাড়িয়া, শেরকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি চালকল বন্ধ রয়েছে। কোনোটা ভাড়ায় চলছে। ৪ জন করে দল বেঁধে শ্রমিকরা কাজ করছেন। এ সময় শ্রমিক সীতা রানী (৫৫) জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে এ কাজ করছেন৷ গত ২৫ বছরে মজুরি বাড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। আর চাল বাড়ানো হয়েছে দুই কেজি। এজন্য অনেকেই পেশা বদলিয়েছে। নতুন কেউ আর এ কাজ করে না। আবু বক্কর নামে আরেক শ্রমিক জানান, তারা ৪ জন দল বেঁধে কাজ করেন। ২৫ টাকা মণ চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন তারা। ১০০ মণ ধান শুকিয়ে চাল হলে তারা ২ হাজার ৫০০ টাকা আর ১৮ কেজি চাল পান। তার ভাষ্য, দিনে ৩০ থেকে ৪০ টাকা আর তিন পোয়া চাল পায় শ্রমিকরা। শ্রমিক মর্জিনা খাতুন বলেন, মালিক বেতন বাড়ায় না। তিনি অন্য কাজও পারেন না। এজন্য পেটের দায়ে দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ওই কাজই করেন তিনি। এ সময় তিনি বেতন বাড়ানোর দাবি জানান।
উপজেলা খাদ্য গুদাম কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শস্যভাণ্ডার খ্যাত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় এক সময় ছোট-বড় প্রায় ৫৩টি চালকল বা হাসকিং মিল ছিল। নানা কারণে অধিকাংশই বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে খাদ্যগুদামের নিবন্ধনকৃত ২৮টি চালকল রয়েছে। তার মধ্যে গত অর্থবছরে চুক্তি অনুযায়ী চাল দিতে না পারায় ২২টি কলের নিবন্ধন বাতিল করেছে সরকার। বর্তমানে এসব মিলের পাশাপাশি উপজেলায় ১টি অটো রাইস মিল আছে।
পৌরসভার এলঙ্গী এলাকার মজিদ রাইস মিলের মালিক এমএ উল্লাস জানান, ধানের দাম বেশি, কিন্তু চালের দাম কম। আবার শ্রমিকও পাওয়া যায় না। এজন্য তিনি মাসিক ৬ হাজার টাকায় মিলটি ভাড়া দিয়েছেন। ওই এলাকার হারেজ রাইস মিলের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, খাদ্য গুদামে সরকারের বেঁধে দেয়া চালের দামের সঙ্গে খোলা বাজারের দামের সমন্বয় নেই। চাল দিতে না পারায় তিনি বাতিলের তালিকায় রয়েছেন। মিল না চললেও ডিমান্ড চার্জ দেয়া লাগে। এসব কারণে ১৫ মাস ধরে তার মিলটি বন্ধ রয়েছে। কলমালিক জামির শেখ বলেন, ‘আমাদের ছোট চালকলে ধান কম লাগলেও বেশি দামে ধান কিনতে হয়। শ্রমিক খরচ ও চাল উৎপাদন করতে খরচ বেশি হয়। এজন্য লোকসানে পড়তে হচ্ছে। যার কারণে মিল বন্ধ করে দিয়েছি। হাসকিং মিলগুলো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।’
উপজেলা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মো. এরশাদ আলী জানান, উপজেলায় বর্তমানে ২৮টি চালকল ও একটি অটোমিল রয়েছে। তার মধ্যে গত অর্থবছরে চুক্তি অনুযায়ী চাল দিতে না পারায় ২২টি কল বাতিল ঘোষণা করেছে সরকার। খোলা বাজারের সঙ্গে সরকারের বেঁধে দেয়া দামে সমন্বয়হীনতার কারণে মিল মালিকরা চাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর অটো মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে চালকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।


























