নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অস্থির হয়ে উঠেছে প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের দাম। রমজানের বাকি নেই আর দুই মাসও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডালজাতীয় পণ্যের মূল্য। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে প্রায় সব ধরনের ডালের। খুচরা বাজারে এক কেজি মসুর ডাল কিনতে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ১৩৮-১৪০ টাকা। আর মুগ ডালের দাম হয়েছে ১৬৮ টাকা। এলসি খুলতে না পারলে আমদানিনির্ভর ডালের বাজার আরো ঊর্ধ্বে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মুগ ডালের দাম। এদিকে হঠাৎ করেই ভোক্তা পর্যায়ে ডালের বাজার অস্থির হয়ে উঠায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। ডালের এমন চড়া দামের কারণে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তাদের।
ক্রেতারা বলেছেন, মাছ, মাংস দিয়ে খাওয়া তো দূরে কথা বর্তমান সময়ে বাজারের সবকিছুর যে অবস্থা ডাল-ভাত খেয়েও জীবনযাপন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। গরিব মানুষজন ভাতের সঙ্গে ডাল খেয়ে কোনোরকমে জীবন চালিয়ে নিত। কিন্তু হঠাৎ করেই ডালের দাম এমন বেড়ে যাওয়ার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন পাইকারি দোকান ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি কেজি মোটা মসুর ১১০ টাকা এবং চিকন মসুর ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রতি কেজি মোটা মসুর ৯০ টাকা এবং চিকন মসুর ১১৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ডালজাতীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মুগ ডালের দাম। প্রতি কেজি মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি মুগ ডালের দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। এ ছাড়াও ছোলার ডাল ১১০ টাকা যা গত একমাস আগেও ছিল ৯৫ টাকা। সেই হিসাবে দাম বেড়েছে ১০টাকা। একই সময় কেজিতে ১০টাকা বেড়েছে ডাবলির দামও।
মোসার্স বিসমিল্লাহ্ স্টোরের মো. রাসেল বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আস্তে আস্তে দাম বেড়েছে। নির্বাচনের কারণে সরকারের অভিযান কার্যক্রম বন্ধ ছিল যার কারণে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। সামনে রমজান সরকারের উচিত এখন থেকে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত বন্ধ করা। আর পাশাপাশি গত এক মাসে ডালের দাম অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেড়েছে মুগ ডালের দাম। কারণ হিসেবে তারা বলছেন ডলারের দাম বৃদ্ধি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভারত হয়ে ডাল আসায় এর দাম বেড়েছে।
হাজী মিজান এন্টারপ্রাইজের সালাহ উদ্দিন বলেন, আমরা আগে যে পণ্যে ১০০ টাকা চালান খাটাতাম এখন ঠিক ঐ পণ্যে ১৫০ চালান খাটাতে হচ্ছে। যদি দিনদিন এভাবে চলতে থাকে তাহলে সাধারাণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। আমাদের অনুরোধ এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারিভাবেই বেশি দামের কারণে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। আড়ত থেকে অতিরিক্ত দামে ডাল কিনে আনতে হচ্ছে, সেই কারণে গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা বেশি দামে ডাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের হালিম ব্যবসায়ী আকাশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে ডাল ৯০ টাকা দিয়ে নিতাম তা এখন ১১০ টাকা। প্রতিদিন দাম বাড়তেছে বাজার করতে এসে পড়তে হয় বিপাকে। আমরা প্রতিদিন বাজার করি সেই হিসাব করে টাকা নিয়ে আসি কিন্তু হিসেব মিলে না। দোকানদারের সঙ্গে প্রতিদিন কথা-কাটাকাটি করতে হচ্ছে যার কারণ হচ্ছে প্রতিদিন দামের পরির্বতন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের বাজারে মসুর, মুগ, মটর, ছোলা, মাষকলাই ও খেসারিসহ ৭-৮ ধরনের ডাল বিক্রি হয়। দেশে বর্তমানে ডালের বার্ষিক চাহিদা ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হয়। আর ১৫-১৬ লাখ টনের চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মটর ডাল আমদানি হয়েছে মাত্র ৭৪ হাজার ২৫২ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ২ লাখ ৭১ হাজার টন। এই সময়ে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার টন; যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল বছর ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরের এই সময়ে ১৫ হাজার ৩৮ টন ছোলা আমদানি হলেও এবার আমদানি হয়েছে ৩৭ হাজার ৬৯৪ টন।
ডালের দাম বৃদ্ধির কথা বলছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি এই সংস্থাটির গত মঙ্গলবারের বাজার মনিটরিংয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে প্রতি কেজি মুগ ডাল ১২৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা এবং এক মাস আগে ছিল ৯৫ থেকে ১৩৫ টাকা। এছাড়া অ্যাংকর ডাল বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে একই দাম ছিল, এক মাস আগে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা ছিল।
স/মিফা


























