০৫:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সম্ভাবনাময় ইলিশ খাতে নানামুখী সংকট

 

➤ইলিশ আহরণে বিশ্ব প্রথম বাংলাদেশ
➤কারেন্ট জালে ধ্বংস হচ্ছে জাটকা
➤নাব্য সংকটে হারাচ্ছে প্রজনন ক্ষেত্র
➤২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন
➤গত ১৫ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%

➤প্রজনন ক্ষেত্র বাড়াতে নদী খনন করে গভীরতা বাড়াতে হবে : অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন, রাবি মৎস্য বিভাগ
➤উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি : প্রকল্প পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর
➤মা-ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে নৌ পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে : নৌ পুলিশের ডিআইজি মোহা. আব্দুল আলীম মাহমুদ

দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত ইলিশ। দেশের জাতীয় এ মাছের মর্যাদা এখন বিশ্বব্যাপী। ইলিশ উৎপাদনে বিশ্ব এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দেশজ অর্থনীতিতেও ইলিশের অবদান অনেক। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন। যা দেশে মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান শতকরা ১১.৬১ ভাগ। দেশের জিডিপিতে এর অবদান শতকরা ১ ভাগের বেশি। গত ১৫ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%। এ খাতে ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তবে বহু সম্ভাবনাময়ের এই ইলিশ খাত নানামুখী সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নদীর নাব্য সংকট ও কারেন্ট জালের মাধ্যমে জাটকা নিধন। তাই ইলিশের ধারাবাহিক উৎপাদন ধরে রাখতে সৃষ্ট সংকট ৫ কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগের উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ হচ্ছে গভীর পানির মাছ। নাব্য সংকটে নদীর গভীরতা এবং অভয়াশ্রম না থাকায় ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে প্রজনন মৌসুমে বাধার মুখে পড়ে ব্যহত হচ্ছে ইলিশ উৎপাদন। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ও বিশে^ শীর্ষস্থান ধরে রাখতে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ শেষ হলেও আরো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৬টি অভয়াশ্রমে দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, সরকারের বাস্তবমুখী কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইলিশ মাছের অবাধ বিচরণক্ষেত্র তৈরি, ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড বলছে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ রক্ষায় ও জাটকা নিধন এবং অবৈধ কারন্টে জালের অবাধ ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব নদীতে এবং হাট-বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধর প্রতিরোধে দু’টি সংস্থার পৃথক অভিযানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং লাখ লাখ টন জাটকা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় সহস্রাধিক জেলেকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে গত ১১ মার্চ শুরু হয়ে ১৭ মার্চে শেষ হয় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ। একই সঙ্গে দেশের ৬টি অঞ্চলে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে মা ইলিশ নিধন প্রতিরোধে গত ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে জেলে পরিবারের মাঝে চাল বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মৎস অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশজ অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান হিসেবে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন। যা দেশে মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান শতকরা ১১.৬১ ভাগ। দেশের জিডিপিতে এর অবদান শতকরা ১ ভাগের বেশি। এ খাতে ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও ভিজিএফের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য (চাল বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিবন্ধিত প্রতিটি জেলে পরিবারকে ১০ কেজি থেকে ৪০ কেজিতে উন্নীতকরণ করা হয়েছে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে বিগত ৮ বছরে ৩৭ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৮৩টি জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিগত ১২ বছরে জাটকা আহরণে বিরত থাকায় ৩৪ লক্ষ ১৪ হাজার ৫৫৪জন জেলে পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ৩১ হাজার ৭০০টি নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকৃত জেলেদের মাঝে ১১ হাজার বৈধ জাল বিতরণ করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও স্বীকৃত।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থানে আছে। এদিকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়াতে বছরে ৪টি ধাপে মোট ৬৫ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় নদীতে নামতে না পেরে অনিবন্ধিত লাখ লাখ জেলে বেকার হয়ে পড়ছে। অপরদিকে চাহিদার তুলনায় জেলে পরিবারে পর্যাপ্ত চাল বিতরণ না থাকায় বিধি উপেক্ষা করেই নানান কৌশলে মাছ ধরতে নদীতে নামছে জেলেরা। শুধু তাই নয়, নদীতে নাব্য সংকট ও অবাধে অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জাটকা এবং মা ইলিশ। এতে ব্যাহত হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন।

মৎস্য গবেষকরা বলছেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নদীতে ছুটে আসে মা ইলিশ। খুঁজে ফিরে গভীরতা। নদীর মোহনায় ও প্রবেশমুখে নাব্যতা সংকটের কারণে প্রজনন ক্ষেত্র হারাচ্ছে মা ইলিশ। নাব্যতা সংকটই এর মূল বাধা। উৎপাদন বাড়াতে নদী খননসহ অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার রোধ করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই বাড়বে ইলিশের উৎপাদন। এতে বিদেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে আরো লাভবান হবে বাংলাদেশ। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড বলছে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ রক্ষায় ও জাটকা নিধন এবং অবৈধ কারন্টে জালের অবাধ ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব নদীতে এবং হাট-বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধন প্রতিরোধে দু’টি সংস্থার পৃথক অভিযানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং লাখ লাখ টন জাটকা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় সহস্রাধিক জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থানে আছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাত যেমন অবদান রাখছে, রপ্তানি বাণিজ্যেও রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপির ২ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ মৎস্য খাতের অবদান। বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে বাংলাদেশের মাছ রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দা সত্ত্বেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৮ শত ৮০ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে দেশের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৭৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

জেলেরা বলছেন, উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করলেই কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার কমে যাবে। কিন্তু যারা উৎপাদন ও বাজারজাত করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে জেলেদের আটক করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। এতে তারা নানান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে নৌ-পুলিশ বলছে, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নদীগুলোতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদন বাড়াতে এবং জাটকা সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে নৌ-পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। নিষিদ্ধ এসব কারেন্ট জালের ব্যবহার রোধে গত ১০ বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল উদ্ধার ও ধ্বংস করা হয়েছে। আশ্বিনে বর্ষার পানি নেমে গেলে নদীসহ অন্যান্য পানির অববাহিকা খাল-বিল, হাওর থেকে এসব জাল দিয়ে দেশীয় প্রজাতির ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন করা হচ্ছে। এ নিয়ে নেই কোনো প্রতিকার বা অভিযান স্থানীয় মৎস্য অফিসের। দেশীয় প্রজাতির মৎস্য নিধনে এখন উপজেলার প্রবাহিত পদ্মা, ভূবনেশ্বর ও আড়িয়াল খাঁ, চৈতার কোলসহ বিভিন্ন খাল-বিলে যথেষ্ট পরিমাণ দেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও নদী-নালা, খাল-বিলে মাছ ডিম ছাড়ায় প্রচুর রেণু-পোনার প্রজনন মৌসুম রয়েছে। ২০০২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরকারের জারি করা মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনের ৫(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কারেন্ট জাল বহন, পরিবহন, মালিক, অধিকারে রাখলে তিনি সবের্বাচ্চ ৩ (তিন) বৎসর পর্যন্ত তবে ১ (এক) বছরের নিচে নয় সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন অথবা সর্বোচ্চ ৫০০০(পাঁচ) হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে অথবা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত হবেন।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের মতে, মৎস সেক্টরে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য রয়েছে। ইলিশ মাছ বাংলাদেশের জাতীয় একটি সম্পদ। শতকরা ৮০ ভাগ ইলিশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। গত ১৫ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%। ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ স্বাদুপানিতে জন্মগ্রহণ করে। এরপর এরা জাটকা হিসেবে ৬-৭ মাস নদীতে থাকে। বর্ষার শুরুতে নদীর পানি যখন ঘোলাটে হতে থাকে তখন তারা নদী ছেড়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়। জীবনচক্রের প্রথম বছর সমুদ্রেই অভিপ্রায়ণ করে পরিপক্কতা লাভ করে। কেভল প্রজননের সময়ে তারা নদীতে ফিরে অভয়য়াশ্রম খুঁজতে থাকে এবং সেখানেই অবস্থান নেয়। ইলিশ মাছ বছরে সর্বোচ্চ ২টি প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত অক্টাবর-নভেম্বর ও দ্বিতীয়ত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস। ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ৭টি নির্দেশনা হচ্ছে- ১. জাটকা ও ডিমওয়ালা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকরণ, ২. বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, ৩. বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জেলে সম্প্রদায়য়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, ৪. ইলিশের আবাসস্থল উন্নয়ন ও পরিবেশগত বিপর্যয় প্রতিরোধ, ৫. ইলিশ জেলেদের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, ৬. ইলিশ ব্যবস্থাপনার তথ্য হালনাগাদকরণ ও ৭. আঞ্চলিক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। তবেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো ও সংরক্ষণ করা বিদেশে বস্তানিসম্ভভ হবে।

মৎস ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানবদেহে আমিষের ৮০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয় মাছ থেকে। অথচ দেশের বহু স্থানেই অবাধে কারেন্ট জাল উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। সেসব জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরছেন। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারেন্ট জাল আটক এবং সংশি¬ষ্ট জেলেদের মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানার খবর আমরা শুনতে পাই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই ক্ষেত্রে যে খামখেয়ালি রয়েছে, তা স্পষ্ট। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই এই জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তারা আরও বলেন, ইলিশ মাছ মূলত গভীর পানির মাছ। এরা প্রজনন মৌসুমে নদীতে এতে অভয়াস্ত্রম খোঁজে। কিন্তু দেশের প্রধান নদীগুলোর প্রবেশমুখে প্রায়ই এরা নানামুখী বাধার মুখে পড়েন। প্রথমত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা সংকট, দীর্ঘদিন ধরে নদীর প্রবেশমুখ ও ভেতরে খনন কাজ না চলার কারণে ইলিশ মাছ তার প্রজননন ক্ষেত্র হারিয়ে ফেলছে। অপরদিকে কারেন্ট জালের কারণেও উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। কারেন্ট জাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি জেলেসমাজের মধ্যে বৈধ জাল ব্যবহার করে জীবিকা উপার্জনের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের জালে মা মাছ, পোনা বা জাটকা ধরা পড়লেও যাতে তারা সেগুলো পরে জলাশয়ে ছেড়ে দেন, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশসহ সবধরনের মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা চলবে। এ বছর নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলেদের ভিজিএফের চাল মার্চ মাসের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তিনি আরো জানান, ভোলার সাত উপজেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন। এদের মধ্যে ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন ৮৯ হাজার ৬০০ জন।

নৌ-পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌ-পুলিশের অভিযানে ১৮ হাজার ৩৩৮ কোটি ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ২৭৫ টাকা মূল্যের অবৈধ কারেন্ট জাল উদ্ধারমূলে জব্দসহ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অধিক। এরমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ২২ সাল পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ অভিযানকালে ১৩৫ কোটি ১৬ লাখ ১৭ হাজার ২২৭ মিটার জাল উদ্ধার, ২ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৬ কেজি জাটকা মাছ, ৯৮০টি নৌ-যান জব্দ ও ৩ হাজার ৯৭৭ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবছর ২২ দিন করে মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ২১৩ হাজার কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার ৪৬১ মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। একই সময় এসব ঘটনায় ৪২ লাখ ৬ হাজার ১৪৬ কেজি মা-ইলিশ, ৯ হাজার ৬০২টি নৌ-যান জব্দ ও ১৫ হাজার ৬২৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
নৌ পুলিশের ডিআইজি মোহাঃ আব্দুল আলীম মাহমুদ জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মা-ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণসহ দেশীয় সকল প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়াতে নৌ পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশের মৎস্য সম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা-মেঘনা নদীতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, জাটকা ও সকল প্রকার সামুদ্রিক মাছের ডিম, লার্ভী ও পোনা রক্ষায় কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জালসহ সকল প্রকার অবৈধ জালের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘কম্বিং অপারেশনের’ এই অভিযান চলবে। নৌ-পুলিশের ডিআইজি বলেন, নৌ পুলিশ দেশের মৎস্য সম্পদ সুরক্ষা ও নৌপথ নিরাপত্তায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধ করার জন্য জাল তৈরির বিভিন্ন কারখানায়ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব ক্রমাগত অভিযান দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, দেশের মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিষিদ্ধকালীন সময়ে মৎস্য শিকার না করা ও মৎস্য শিকারে ব্যবহৃত অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এজন্য সকলকে সচেতন হতে হবে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এ বিষয় নিয়ে গত ১৪ মার্চ নৌ পুলিশের ১১টি অঞ্চলের পুলিশ সুপার ও সকল থানা ফাঁড়ির ইনচার্জদের সাথে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন নবনিযুক্ত নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহা: আবদুল আলীম মাহমুদ।

নৌ পুলিশ প্রধান বলেন, নৌ পুলিশ একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এই ইউনিটে দেশের জন্য কাজ করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নৌ পুলিশে কর্মরত সকলকে নিয়ে নৌপথে নিরাপত্তা ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় নৌপুলিশ নিরলসভাবে কাজ করবে। তিনি উপস্থিত সকলকে আরো দক্ষ ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা প্রদান করেন। গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই মুহুর্তে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা শাখার সহকারী পরিচালক লে. কমান্ডার খন্দকার মুনিফ তকিসহ একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ মাছ এ দেশের একটি জাতীয় সম্পদ। সরকারের নির্দেশনায় ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এর উৎপাদন বাড়াতে এবং জাটকা নিধনে দেশের সমুদ্র থেকে নদী ও এর শাখায় অঞ্চলভিত্তিক কোস্টগার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছেন। যা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে র‌্যাব-১০ এর সহকারী পুলিশ সুপার এম জে সোহেল জানান, নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ সংরক্ষণ ও বিক্রির অভিযোগে গত শনিবার যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তের অভিযান চালায় র‌্যাব-১০ এর একটি দল। এসময় সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাজহারুল ইসলাম ৭টি আড়তদারকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা ও ৫ লাখ টাকা মূল্যের ৫৬৬ কেজি জাটকা মাছ উদ্ধারমূলে জব্দের পর জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিনামূল্যে এতিমখানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইলিশের অভয়াশ্রম গড়ে তোলাসহ সকল প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই সভা-সেমিনার করা হয়েছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নদীতে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হলে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করতে হবে। নদীতে ড্রেজিং করা হলে গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি নদী পাড়ের ভাঙন রোধ করাও সম্ভব হবে। নদী ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আমরা একাধিকবার বৈঠক করে বিষয়গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছি। বর্তমান যে অবস্থা তাতে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে প্রবেশমুখে পলি জমে দ্রুত অভয়াশ্রমগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৩০ বছরে ইলিশের উৎপাদন তলানিতে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে পারে। এবং জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ইয়ামিন হোসেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে নদী খননের বিকল্প নেই। এটা গভীর পানির মাছ। মা ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে প্রবেশকালে নাব্যতা সংকটে এবং কারেন্ট জালের কারণে বাদার মুখে পড়ে প্রজনন ক্ষেত্র হারিয়ে চলে যায়। ইলিশ উৎপাদন কম হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পদ্মা নদীর নব্যতা কম। ইলিশ মাছের একটা ধর্ম হচ্ছে ডিম দিতে আসলে তার উজানমুখি পছন্দ করে। একবার মা ইলিশ ডিম দিতে আসলে যদি তারা বাঁধার সম্মুখিন হয় তাহলে আর দ্বিতীয়বার আর আসে না। এক্ষেত্রে আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা কম থাকায় ব্যহত হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন। যেহেতু ইলিশ প্রথমবার ডিম দিতে আসে তখন তারা উজানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে এক্ষেত্রে ফারাক্কা বাধের দিকে চলে যায়। রাজশাহীর অঞ্চলে পদ্মা নদীর বড় অংশ ভারতের দিকে সেক্ষেত্রে ঐ দিকে চলে যায়। যদি উৎপাদন বাড়তে চায় তাহলে সরকারের যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে নাব্যতার সমস্যা সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদীর গভীরতা বাড়তে হবে। যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় তাহলে আমাদের ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে। এর ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা সম্ভব হবে বলেও জানান এই গবেষক।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাকাতি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

সম্ভাবনাময় ইলিশ খাতে নানামুখী সংকট

আপডেট সময় : ০৮:৪৯:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০২৪

 

➤ইলিশ আহরণে বিশ্ব প্রথম বাংলাদেশ
➤কারেন্ট জালে ধ্বংস হচ্ছে জাটকা
➤নাব্য সংকটে হারাচ্ছে প্রজনন ক্ষেত্র
➤২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন
➤গত ১৫ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%

➤প্রজনন ক্ষেত্র বাড়াতে নদী খনন করে গভীরতা বাড়াতে হবে : অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন, রাবি মৎস্য বিভাগ
➤উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি : প্রকল্প পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর
➤মা-ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে নৌ পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে : নৌ পুলিশের ডিআইজি মোহা. আব্দুল আলীম মাহমুদ

দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত ইলিশ। দেশের জাতীয় এ মাছের মর্যাদা এখন বিশ্বব্যাপী। ইলিশ উৎপাদনে বিশ্ব এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দেশজ অর্থনীতিতেও ইলিশের অবদান অনেক। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন। যা দেশে মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান শতকরা ১১.৬১ ভাগ। দেশের জিডিপিতে এর অবদান শতকরা ১ ভাগের বেশি। গত ১৫ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%। এ খাতে ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তবে বহু সম্ভাবনাময়ের এই ইলিশ খাত নানামুখী সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নদীর নাব্য সংকট ও কারেন্ট জালের মাধ্যমে জাটকা নিধন। তাই ইলিশের ধারাবাহিক উৎপাদন ধরে রাখতে সৃষ্ট সংকট ৫ কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগের উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ হচ্ছে গভীর পানির মাছ। নাব্য সংকটে নদীর গভীরতা এবং অভয়াশ্রম না থাকায় ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে প্রজনন মৌসুমে বাধার মুখে পড়ে ব্যহত হচ্ছে ইলিশ উৎপাদন। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ও বিশে^ শীর্ষস্থান ধরে রাখতে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ শেষ হলেও আরো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৬টি অভয়াশ্রমে দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, সরকারের বাস্তবমুখী কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশ এখন মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইলিশ মাছের অবাধ বিচরণক্ষেত্র তৈরি, ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড বলছে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ রক্ষায় ও জাটকা নিধন এবং অবৈধ কারন্টে জালের অবাধ ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব নদীতে এবং হাট-বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধর প্রতিরোধে দু’টি সংস্থার পৃথক অভিযানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং লাখ লাখ টন জাটকা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় সহস্রাধিক জেলেকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে গত ১১ মার্চ শুরু হয়ে ১৭ মার্চে শেষ হয় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ। একই সঙ্গে দেশের ৬টি অঞ্চলে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে মা ইলিশ নিধন প্রতিরোধে গত ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে জেলে পরিবারের মাঝে চাল বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মৎস অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশজ অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান হিসেবে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫.৭১ লাখ মে. টন। যা দেশে মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান শতকরা ১১.৬১ ভাগ। দেশের জিডিপিতে এর অবদান শতকরা ১ ভাগের বেশি। এ খাতে ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও ভিজিএফের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য (চাল বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিবন্ধিত প্রতিটি জেলে পরিবারকে ১০ কেজি থেকে ৪০ কেজিতে উন্নীতকরণ করা হয়েছে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে বিগত ৮ বছরে ৩৭ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৮৩টি জেলে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিগত ১২ বছরে জাটকা আহরণে বিরত থাকায় ৩৪ লক্ষ ১৪ হাজার ৫৫৪জন জেলে পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ৩১ হাজার ৭০০টি নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকৃত জেলেদের মাঝে ১১ হাজার বৈধ জাল বিতরণ করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও স্বীকৃত।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থানে আছে। এদিকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়াতে বছরে ৪টি ধাপে মোট ৬৫ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় নদীতে নামতে না পেরে অনিবন্ধিত লাখ লাখ জেলে বেকার হয়ে পড়ছে। অপরদিকে চাহিদার তুলনায় জেলে পরিবারে পর্যাপ্ত চাল বিতরণ না থাকায় বিধি উপেক্ষা করেই নানান কৌশলে মাছ ধরতে নদীতে নামছে জেলেরা। শুধু তাই নয়, নদীতে নাব্য সংকট ও অবাধে অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জাটকা এবং মা ইলিশ। এতে ব্যাহত হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন।

মৎস্য গবেষকরা বলছেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নদীতে ছুটে আসে মা ইলিশ। খুঁজে ফিরে গভীরতা। নদীর মোহনায় ও প্রবেশমুখে নাব্যতা সংকটের কারণে প্রজনন ক্ষেত্র হারাচ্ছে মা ইলিশ। নাব্যতা সংকটই এর মূল বাধা। উৎপাদন বাড়াতে নদী খননসহ অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার রোধ করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই বাড়বে ইলিশের উৎপাদন। এতে বিদেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে আরো লাভবান হবে বাংলাদেশ। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড বলছে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ রক্ষায় ও জাটকা নিধন এবং অবৈধ কারন্টে জালের অবাধ ব্যবহার ঠেকাতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব নদীতে এবং হাট-বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধন প্রতিরোধে দু’টি সংস্থার পৃথক অভিযানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং লাখ লাখ টন জাটকা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় সহস্রাধিক জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২তম স্থানে আছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাত যেমন অবদান রাখছে, রপ্তানি বাণিজ্যেও রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপির ২ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ মৎস্য খাতের অবদান। বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে বাংলাদেশের মাছ রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দা সত্ত্বেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৯ হাজার ৮ শত ৮০ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে দেশের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৭৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

জেলেরা বলছেন, উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করলেই কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার কমে যাবে। কিন্তু যারা উৎপাদন ও বাজারজাত করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে জেলেদের আটক করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। এতে তারা নানান সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে নৌ-পুলিশ বলছে, সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নদীগুলোতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছের উৎপাদন বাড়াতে এবং জাটকা সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে নৌ-পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট। নিষিদ্ধ এসব কারেন্ট জালের ব্যবহার রোধে গত ১০ বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল উদ্ধার ও ধ্বংস করা হয়েছে। আশ্বিনে বর্ষার পানি নেমে গেলে নদীসহ অন্যান্য পানির অববাহিকা খাল-বিল, হাওর থেকে এসব জাল দিয়ে দেশীয় প্রজাতির ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন করা হচ্ছে। এ নিয়ে নেই কোনো প্রতিকার বা অভিযান স্থানীয় মৎস্য অফিসের। দেশীয় প্রজাতির মৎস্য নিধনে এখন উপজেলার প্রবাহিত পদ্মা, ভূবনেশ্বর ও আড়িয়াল খাঁ, চৈতার কোলসহ বিভিন্ন খাল-বিলে যথেষ্ট পরিমাণ দেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও নদী-নালা, খাল-বিলে মাছ ডিম ছাড়ায় প্রচুর রেণু-পোনার প্রজনন মৌসুম রয়েছে। ২০০২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরকারের জারি করা মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনের ৫(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কারেন্ট জাল বহন, পরিবহন, মালিক, অধিকারে রাখলে তিনি সবের্বাচ্চ ৩ (তিন) বৎসর পর্যন্ত তবে ১ (এক) বছরের নিচে নয় সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন অথবা সর্বোচ্চ ৫০০০(পাঁচ) হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে অথবা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত হবেন।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের মতে, মৎস সেক্টরে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য রয়েছে। ইলিশ মাছ বাংলাদেশের জাতীয় একটি সম্পদ। শতকরা ৮০ ভাগ ইলিশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। গত ১৫ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১০৫.০%। ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ স্বাদুপানিতে জন্মগ্রহণ করে। এরপর এরা জাটকা হিসেবে ৬-৭ মাস নদীতে থাকে। বর্ষার শুরুতে নদীর পানি যখন ঘোলাটে হতে থাকে তখন তারা নদী ছেড়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়। জীবনচক্রের প্রথম বছর সমুদ্রেই অভিপ্রায়ণ করে পরিপক্কতা লাভ করে। কেভল প্রজননের সময়ে তারা নদীতে ফিরে অভয়য়াশ্রম খুঁজতে থাকে এবং সেখানেই অবস্থান নেয়। ইলিশ মাছ বছরে সর্বোচ্চ ২টি প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত অক্টাবর-নভেম্বর ও দ্বিতীয়ত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস। ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ৭টি নির্দেশনা হচ্ছে- ১. জাটকা ও ডিমওয়ালা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকরণ, ২. বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, ৩. বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জেলে সম্প্রদায়য়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, ৪. ইলিশের আবাসস্থল উন্নয়ন ও পরিবেশগত বিপর্যয় প্রতিরোধ, ৫. ইলিশ জেলেদের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, ৬. ইলিশ ব্যবস্থাপনার তথ্য হালনাগাদকরণ ও ৭. আঞ্চলিক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। তবেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো ও সংরক্ষণ করা বিদেশে বস্তানিসম্ভভ হবে।

মৎস ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানবদেহে আমিষের ৮০ ভাগ চাহিদা পূরণ হয় মাছ থেকে। অথচ দেশের বহু স্থানেই অবাধে কারেন্ট জাল উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। সেসব জাল দিয়ে জেলেরা মাছ ধরছেন। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারেন্ট জাল আটক এবং সংশি¬ষ্ট জেলেদের মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানার খবর আমরা শুনতে পাই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই ক্ষেত্রে যে খামখেয়ালি রয়েছে, তা স্পষ্ট। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই এই জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তারা আরও বলেন, ইলিশ মাছ মূলত গভীর পানির মাছ। এরা প্রজনন মৌসুমে নদীতে এতে অভয়াস্ত্রম খোঁজে। কিন্তু দেশের প্রধান নদীগুলোর প্রবেশমুখে প্রায়ই এরা নানামুখী বাধার মুখে পড়েন। প্রথমত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা সংকট, দীর্ঘদিন ধরে নদীর প্রবেশমুখ ও ভেতরে খনন কাজ না চলার কারণে ইলিশ মাছ তার প্রজননন ক্ষেত্র হারিয়ে ফেলছে। অপরদিকে কারেন্ট জালের কারণেও উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। কারেন্ট জাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি জেলেসমাজের মধ্যে বৈধ জাল ব্যবহার করে জীবিকা উপার্জনের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তাদের জালে মা মাছ, পোনা বা জাটকা ধরা পড়লেও যাতে তারা সেগুলো পরে জলাশয়ে ছেড়ে দেন, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশসহ সবধরনের মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা চলবে। এ বছর নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলেদের ভিজিএফের চাল মার্চ মাসের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তিনি আরো জানান, ভোলার সাত উপজেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন। এদের মধ্যে ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন ৮৯ হাজার ৬০০ জন।

নৌ-পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌ-পুলিশের অভিযানে ১৮ হাজার ৩৩৮ কোটি ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ২৭৫ টাকা মূল্যের অবৈধ কারেন্ট জাল উদ্ধারমূলে জব্দসহ আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অধিক। এরমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ২২ সাল পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ অভিযানকালে ১৩৫ কোটি ১৬ লাখ ১৭ হাজার ২২৭ মিটার জাল উদ্ধার, ২ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৬ কেজি জাটকা মাছ, ৯৮০টি নৌ-যান জব্দ ও ৩ হাজার ৯৭৭ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবছর ২২ দিন করে মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ২১৩ হাজার কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার ৪৬১ মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। একই সময় এসব ঘটনায় ৪২ লাখ ৬ হাজার ১৪৬ কেজি মা-ইলিশ, ৯ হাজার ৬০২টি নৌ-যান জব্দ ও ১৫ হাজার ৬২৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
নৌ পুলিশের ডিআইজি মোহাঃ আব্দুল আলীম মাহমুদ জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মা-ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণসহ দেশীয় সকল প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়াতে নৌ পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশের মৎস্য সম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা-মেঘনা নদীতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, জাটকা ও সকল প্রকার সামুদ্রিক মাছের ডিম, লার্ভী ও পোনা রক্ষায় কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জালসহ সকল প্রকার অবৈধ জালের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘কম্বিং অপারেশনের’ এই অভিযান চলবে। নৌ-পুলিশের ডিআইজি বলেন, নৌ পুলিশ দেশের মৎস্য সম্পদ সুরক্ষা ও নৌপথ নিরাপত্তায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধ করার জন্য জাল তৈরির বিভিন্ন কারখানায়ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব ক্রমাগত অভিযান দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, দেশের মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিষিদ্ধকালীন সময়ে মৎস্য শিকার না করা ও মৎস্য শিকারে ব্যবহৃত অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এজন্য সকলকে সচেতন হতে হবে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এ বিষয় নিয়ে গত ১৪ মার্চ নৌ পুলিশের ১১টি অঞ্চলের পুলিশ সুপার ও সকল থানা ফাঁড়ির ইনচার্জদের সাথে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন নবনিযুক্ত নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহা: আবদুল আলীম মাহমুদ।

নৌ পুলিশ প্রধান বলেন, নৌ পুলিশ একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এই ইউনিটে দেশের জন্য কাজ করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নৌ পুলিশে কর্মরত সকলকে নিয়ে নৌপথে নিরাপত্তা ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় নৌপুলিশ নিরলসভাবে কাজ করবে। তিনি উপস্থিত সকলকে আরো দক্ষ ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা প্রদান করেন। গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই মুহুর্তে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা শাখার সহকারী পরিচালক লে. কমান্ডার খন্দকার মুনিফ তকিসহ একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ মাছ এ দেশের একটি জাতীয় সম্পদ। সরকারের নির্দেশনায় ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এর উৎপাদন বাড়াতে এবং জাটকা নিধনে দেশের সমুদ্র থেকে নদী ও এর শাখায় অঞ্চলভিত্তিক কোস্টগার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছেন। যা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে র‌্যাব-১০ এর সহকারী পুলিশ সুপার এম জে সোহেল জানান, নিষিদ্ধ জাটকা ইলিশ সংরক্ষণ ও বিক্রির অভিযোগে গত শনিবার যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তের অভিযান চালায় র‌্যাব-১০ এর একটি দল। এসময় সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাজহারুল ইসলাম ৭টি আড়তদারকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা ও ৫ লাখ টাকা মূল্যের ৫৬৬ কেজি জাটকা মাছ উদ্ধারমূলে জব্দের পর জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিনামূল্যে এতিমখানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইলিশের অভয়াশ্রম গড়ে তোলাসহ সকল প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই সভা-সেমিনার করা হয়েছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নদীতে অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হলে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করতে হবে। নদীতে ড্রেজিং করা হলে গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি নদী পাড়ের ভাঙন রোধ করাও সম্ভব হবে। নদী ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আমরা একাধিকবার বৈঠক করে বিষয়গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছি। বর্তমান যে অবস্থা তাতে পদ্মা ও মেঘনা নদীতে প্রবেশমুখে পলি জমে দ্রুত অভয়াশ্রমগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৩০ বছরে ইলিশের উৎপাদন তলানিতে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে পারে। এবং জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ইয়ামিন হোসেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে নদী খননের বিকল্প নেই। এটা গভীর পানির মাছ। মা ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে প্রবেশকালে নাব্যতা সংকটে এবং কারেন্ট জালের কারণে বাদার মুখে পড়ে প্রজনন ক্ষেত্র হারিয়ে চলে যায়। ইলিশ উৎপাদন কম হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের পদ্মা নদীর নব্যতা কম। ইলিশ মাছের একটা ধর্ম হচ্ছে ডিম দিতে আসলে তার উজানমুখি পছন্দ করে। একবার মা ইলিশ ডিম দিতে আসলে যদি তারা বাঁধার সম্মুখিন হয় তাহলে আর দ্বিতীয়বার আর আসে না। এক্ষেত্রে আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা কম থাকায় ব্যহত হচ্ছে ইলিশের উৎপাদন। যেহেতু ইলিশ প্রথমবার ডিম দিতে আসে তখন তারা উজানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে এক্ষেত্রে ফারাক্কা বাধের দিকে চলে যায়। রাজশাহীর অঞ্চলে পদ্মা নদীর বড় অংশ ভারতের দিকে সেক্ষেত্রে ঐ দিকে চলে যায়। যদি উৎপাদন বাড়তে চায় তাহলে সরকারের যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে নাব্যতার সমস্যা সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদীর গভীরতা বাড়তে হবে। যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় তাহলে আমাদের ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে। এর ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা সম্ভব হবে বলেও জানান এই গবেষক।