⚫ উল্টোপথে-অলিগলিতেও চলছে দ্রুতগতিতে
⚫ গত বছরে দুর্ঘটনায় নিহত ২১০, আহত ১২৯
⚫ নির্বিকার পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন লাখ লাখ মোটরসাইকেল চালক। সুযোগ পেলেই যখন ইচ্ছে উঠে যাচ্ছেন ফুটপাতে, কখনও বা চলছেন উল্টোপথে। এতে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। ফলে প্রতিনিয়ত সড়কে আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। ফুটপাতে উঠে যাওয়া মোটরসাইকেল চালকদের হর্ন বাজানোর শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন পথচারীরা। কেউ প্রতিবাদ করলেই ঘটছে হাতাহাতি-গালমন্দের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনের তথ্যমতে, গত বছরে শুধুমাত্র মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১০ জন। আর আহত হয়েছেন ১২৯ জন। এতে অনেকেই এখনো বিছানায় দুর্ঘটনার যন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করছেন। তাদের নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্বজন-পরিবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে ফুটপাতের নকশা পরিবর্তন করে মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ’কে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। এমন বাস্তবতায় সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন। তবে তারা শুধু তৎপর নিরীহ সাধারণ চালকদের ওপর। গতকাল শুক্রবার সরেজমিন ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনেও আসন্ন ঈদের কেনাকাটার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কগুলোতে যানবাহনের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রধান সড়কগুলোর অনেক স্থানে তীব্র যানজট থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ফুটপাতে উঠে গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছেন মোটরসাইকেলের চালকরা। কখনো কখনো মূল সড়ক ছেড়ে অলিগলিতেও ঢুকে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে। বাংলামোটর মোড় থেকে সড়কের পূর্বপ্রান্তের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে কারওয়ানবাজারে যাচ্ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টাফ বিশ^জিৎ দত্ত। তিনি বলেন, প্রধান সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল থাকায় কিছুটা যানজট লেগে যায়। এসময় আমি বোরাক টাওয়ার অতিক্রমকালেই দেখি একটি মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে হর্ন বাজিয়ে দ্রুতগতিতে কারওয়ানবাজার থেকে বাংলামোটর মোড় দিয়ে আসছে। তখন আমি মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করার চেষ্টা করলে চালক আমার উপর দিয়েই উঠিয়ে দেবে বলে হুঙ্কার দেয়। মোটরসাইকেলের পেছনের আরোহীও একই সুরে বলেন, ভাই ভুল হয়েছে, তাড়া আছে, একটু সরে দাঁড়ান। এরপর ওই ফুটপাত দিয়ে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একের পর এক মোটরসাইকেল যার যার গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকেন। পরে বিষয়টি বাংলামোটর ও কারওয়ানবাজার মোড়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে জানালেও তারা নির্বিকার ছিলেন। কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। পরে নিরুপায় হয়ে মোটরসাইকেল চালকদের প্রতি মনে মনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রীয়া ব্যক্ত করে কর্মস্থলে চলে যাই। উল্টোপথে চলতেও আইনের কোনো তোয়াক্কাই করেন না চালকরা। পথচারীরা বলেন, মোটরসাইকেল চালকদের যন্ত্রণায় স্কুলের বাচ্চারাও ঠিকমতো রাস্তা পার হতে পারে না।
জেব্রাক্রসিং কিংবা ফুটপাত কোনো কিছুই তারা ছাড়ছেন না। রাস্তায় একটু জ্যাম দেখলেই মোটরসাইকেল নিয়ে ফুটপাতে উঠে যান। এতে আমাদের চলাচলে সমস্যায় পড়তে হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখলেও না দেখার ভান করে জরুরি কাজের কথা বলেন তারা। আবার কখনো ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা পরিচয় দিয়ে দ্রুত কেটে পড়েন বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল চালকরা। মোটরসাইকেল চালকদের প্রতি এমন অসংখ্য অভিযোগ ভুক্তভোগী ফুটপাত ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পাড়া-মহল্লা ও অলিগলির পথচারীদের। দিনের বেলায় অনিবন্ধিত রাইড শেয়ারিং ও পাঠাও ব্যবহার করা হলেও ইফতারের পর সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হেলমেট ছাড়া পাড়া-মহল্লা দাবড়ে বেড়ায় কিশোর-তরুণ-যুবারা। এদের থাকে না মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট। হর্ন বাজিয়ে বিকট শব্দে পাড়া-মহল্লায় অবাধ বিচরণ করছেন মোটরসাইকেল চালকরা। নিউমার্কেট থেকে নবাবগঞ্জ সেকশন রুটে চলে শত শত মোটরসাইকেল। প্রতিটি মোটরসাইকেলে চালকসহ ৩ জন থাকেন। দুজন যাত্রীর কাছ থেকে চালক ভাড়াবাবদ আদায় করেন ৬০ টাকা করে ১২০ টাকা। কখনো চাহিদার কারণে ভাড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। চলার পথে দুর্ঘটনাও ঘটায় চালকরা। কেউ প্রতিবাদ করলেই মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রীরা জোটবদ্ধ হয়ে উল্টো হামলা চালায়। এদিকে আমির হোসেনসহ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ভাই সড়কে চলতে গিয়ে ট্রাফিকের বিধি-বিধান থাকলেও কেউই সেই নিয়ম মানেন না। সবাই শটকার্ট পথ খুঁজে। একজনের দেখা দেখি অন্যরাও উল্টোপথে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করে। ফুটপাতে উঠে গলিপথেও ঢুকে পড়ে। এতে অনেক সময় কেউ না কেউ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। মোটরসাইকেল দেখে অনেক পথচারীও বিরক্তবোধ করেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গতবছর সারা দেশে মোট ৬ হাজার ৫২৪টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৫৩২টি। এরমধ্যে রাজধানী ঢাকা শহরে ৩০১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে চলতি বছরের শুধু ফেব্রুয়ারিতে ১৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২১০ জন নিহত এবং ১২৯ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মোটরসাইকেল নিবন্ধনেও লাগাম টানতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ফুটপাতে যেন মোটরসাইকেল উঠতে না পারে, সেজন্য নকশাগত পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া এন্ট্রি ও এক্সিটে বার দিতে হবে, যেন ফুটপাতে মোটরসাইকেল প্রবেশ করতে বা বের হতে না পারে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কে মোটরসাইকেল সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভভ হবে না। বরং দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলিস্তান ট্রাফিক বক্সে দায়িত্বরত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ঈদের কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। যানজট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ফুটপাতের হকার নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য সড়ক থেকে উঠিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া কোনো গণপরিবহন দীর্ঘসময় এক স্টপেজে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সার্জেন্ট দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালে জ্যামে পড়লে একসঙ্গে অনেকগুলো মোটরসাইকেল এসে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যে, আমরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাই না। একজন-দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যখন ২০-৩০টি মোটরসাইকেল একসঙ্গে হয়ে যায় তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও অনেক সময় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আবার এলাকাভিত্তিক দলীয় নেতা- বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাইক চালানোর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই ট্রাফিক নিয়ম মানেন না। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গেলেও উপর মহলের চাপে ছেড়ে দিতে হয়। উল্টোপথে চলাচল করা তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ওয়ারী জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) এস এম শামীম বলেন, ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে পবিত্র মাহে রমজান মাসজুড়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলাকার যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশও কাজ করছেন। মোটরসাইকেলসহ যেকোন যানবাহনের অবাধ বিচরণ রোধে এবং যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা প্রদানসহ আইন প্রয়োগেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফ ইমাম বলেন, ঢাকা মহানগরীতে যানজট সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ও নির্বিঘ্নে যান চলাচল নিশ্চিত করতে হলে ট্রাফিক আইন মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী, চালক এবং পথচারীর দায়িত্ব-কর্তব্য সংক্রান্ত লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম ও পথসভার মাধ্যমে প্রচারণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ট্রাফিক ওয়ারী বিভাগ।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইন্টার সেকশন ও শেষ মুহূর্তে অযাচিত ট্রাফিক কনজেশন তৈরি হয়। তাই ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে অফিস ছুটির সময় অর্থাৎ সাড়ে তিনটা হতে বা এর কাছাকাছি সময় হতে অফিস অথবা কর্মস্থল থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাড়াহুড়ো করে কর্তব্যস্থল হতে বাড়ি ফেরার সময় ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল পরিহার করে গতিসীমা মেনে গাড়ি চালান। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করে ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি না করতে নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ রইল। এছাড়াও রমজানের প্রথম থেকেই অনাকাক্সিক্ষত পার্কিং, ফুটপাতে উঠে যাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে ও উল্টোপথে গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ।


























