০৮:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আনন্দ মেলার নামে সারা দেশে সক্রিয় বাণিজ্য চক্র

◆ইনডোরে আয়োজনের কথা বলেই নেওয়া হয় অনুমতি
◆ফুটবল মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খোলা জায়গায় বসছে দোকানপাট
◆মেলার অনুমতিতে লোকসানে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা

 

 

 

 

ঈদ-নববর্ষসহ যে কোনো ধরনের জাতীয় উৎসব এলেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তৎপর হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ চক্র। তারা ঈদ আনন্দ ও পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস মেলাসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানের নামে মেলার আয়োজন করছে। চক্রটি স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর প্রভাব বিস্তার করে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মেলার আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে লোকসানের ঘানি টানছেন আশপাশের মার্কেট-শপিংমল ও হাট-বাজারের ব্যবসায়ীরা। আয়োজিত এসব মেলার অধিকাংশই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করেছে। মন্ত্রণালয় থেকে বলা আছে, যেহেতু রমজান চলমান সেহেতু ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিক রাখাসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতেই এসব মেলা ইনডোরে আয়োজনের কথা বলেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

 

 

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এবার খোলা মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতিই দেয়া হয়নি। যারাই মেলা আয়োজন করবে, ইনডোরে আয়োজন করতে হবে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে কখনোই এসব মেলার আয়োজনের অনুমতি নেই। কারণ এটি আইনেই নিষিদ্ধ রয়েছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কোনো রকমের মেলার আয়োজন করা যাবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইনে বলা আছে।
যদিও বাস্তব চিত্র সব আইন ও নিয়মের বিপরীত। খোলা মাঠেই চলছে মেলার আয়োজন। কোথাও মেলা চলছে, কোথাও আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কামরাঙ্গীরচরের দুটি স্পটে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এসব মেলা মূলত ঈদকে ঘিরে পোশাক-কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসানো হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায়ই মেলার দোকান ঘিরে বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। দেখা গেছে, কামরাঙ্গীরচরের কুড়ার ঘাটে সরকারি ৩৪ শয্যা হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে মেলায় আয়োজন করা হয়েছে। তা পরিচালনা করছেন আব্দুল বাতেন তালুকদার। রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটের দক্ষিণ পাশে কাঠপট্টিতে মালিকের কাছ থেকে কিছুদিনের জন্য একটি খোলা জমি ভাড়া নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ওই জমিটি ডেভেলপার নাফিস ও ম্যানেজার আ. মজিদ দেখভাল করেন। তারা অর্থের বিনিময়ে মেলা পরিচালনার জন্য স্থানীয় এক নেতার কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এ দুটি স্থানের একটিতেও নেই জেলা প্রশাসক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা ডিএসসিসির অনুমতি। মানা হচ্ছে না কোনো বিধিবিধান। রসুলপুর ব্রিজ মার্কেট কমিটির নেতাদের বাধা উপেক্ষা করে স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই পরিচালনা করা হচ্ছে এসব মেলা। চলবে ঈদের পরে একসপ্তাহ পর্যন্ত। রাজধানীর উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের আজমপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠের সামনেও খোলা মাঠে মেলা হচ্ছে বলে জানা গেছে। উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের জমজম টাওয়ার সংলগ্ন খালি মাঠে আয়োজন করা হয়েছে ৪৫ দিনব্যাপী দেশীয় জামদানি শিল্পপণ্য ও বৈশাখী বাণিজ্যমেলা-২০২৪। মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বেনারসি মসলিন অ্যান্ড জামদানি সোসাইটি। গত ২৪ মার্চ মেলাটির উদ্বোধন করা হয়।

 

 

মিরপুর-২ এর ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠে রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয়েছে ঈদ আনন্দ ও বৈশাখী মেলা-২০২৪। আয়োজিত ওই মেলার উদ্বোধন করা হয় পয়লা রমজান (১২ মার্চ)। মিরপুর-১ এর দারুস সালাম এলাকার গোলারটেক মাঠেও আয়োজন করা হয়েছে ঈদ বস্ত্র, হস্ত ও কুঠিরশিল্প মেলা-২০২৪। দারুস সালাম থানা সংলগ্ন মাঠে ওই মেলাও উদ্বোধন করা হয় গত ১২ মার্চ। এছাড়াও সাভার, আশুলিয়া, মুন্সীগঞ্জ, লালমনিরহাট, টাঙ্গাইল ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মেলার আয়োজন করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা কালেক্টর ঈদগাঁ মাঠে যে মেলার আয়োজন করা হয়েছে তা নিয়ে স্থানীয় জনমনে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই বলেছেন, এ মাঠে টাঙ্গাইল ফুটবল ফেডারেশন এ মেলা আয়োজন করেছে। ফুটবল ফেডারেশন তো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, আর এ মাঠে এলাকার লোকজন নিয়মিত খেলাধুলা করে। তা থেকে এখন বঞ্চিত। এতে স্থানীয় পুলিশ ও জেলা প্রশাসন কিভাবে মেলা পরিচালনার অনুমোদন দিল তা বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য মেলেনি। বগুড়ার ঠনঠনিয়া মাঠে মেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় গণমাধ্যমের কতিপয় নেতা। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, এতে সম্মতি দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে তারা কেউ তথ্য দিতে রাজি হননি। দেশের অধিকাংশ এলাকার মেলা আয়োজনের অনুমতিতে গলদ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা জানায়, শুধু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষাই নয়, ট্রেড লাইসেন্সসহ মেলা আয়োজনে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রেও গলদ রয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিশেষ করে এসব অনিয়মের ধার ধারে না জেলা প্রশাসন। জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ মেলাই শতভাগ নিয়মবহির্ভূতভাবে আয়োজন করা হয়েছে। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে কেউই কোনো কথা বলে না। আয়োজকরা তাদের প্রচারের ব্যানারে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএমপিসহ সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের অনুমতিক্রমে মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

 

যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত মেলা আয়োজনের অনুমতি পেয়েছে মাত্র দু’-চারটি। অথচ মেলা আয়োজন হয়েছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। খোলা মাঠে মেলার আয়োজন করবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়ার পরই মেলার আয়োজনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ইনডোরে এসব মেলা আয়োজন করতে হবে এবং তথ্য-প্রমাণসহ ইনডোরে আয়োজনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এমনটি বলা আছে মেলা পরিচালনাকারীদের। যদি অনিয়মের মধ্য দিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়, তাহলে অভিযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আয়োজকরা খুবই ধুরন্ধর। তারা সব মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ‘সংলগ্ন মাঠ’ নামে একটি কমন শব্দের ব্যবহার করেন। অথচ সংলগ্ন মাঠ লিখেও মেলা আয়োজনের অনমুতি পাওয়ার কথা নয়। কারণ এবার খোলা মাঠে আয়োজন নিষেধ করা আছে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাঠে তো কোনো সুযোগই নেই।

 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ রেহান উদ্দিন (রপ্তানি-৭ শাখা) দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রমজানে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয় মাথায় রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খোলা মাঠে মেলা আয়োজন আপাতত ঈদ নাগাদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে আইন থাকায় কখনোই এর অনুমতি দেয় না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে যেসব মেলার আয়োজন হচ্ছে বা মন্ত্রণালয়ের কাছে আয়োজনের অনমুতি চাইছে তাদের মধ্য থেকে শুধু যারা ইনডোরে আয়োজন করবেন তাদেরই অনুমতি দেয়া হচ্ছে। যেমন কমিউনিটি সেন্টার, ক্লাব এসব স্থানে যারা আয়োজন করবেন তারাই কেবল অনুমতি পাবেন। জানতে চাইলে, এখন পর্যন্ত ঢাকায় ঠিক কতটি মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে তার সঠিক সংখা জানাতে পারেননি তিনি। তবে তিনি বলেন, খোলা মাঠে যেহেতু অনুমতি আপাতত দেওয়া হচ্ছে না সেহেতু খোলা মাঠে কেউ মেলার আয়োজন করলে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলার আয়োজনের সঠিক তথ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে এসব মেলার অনুমতি দেন জেলা প্রশাসক। সেগুলোর বিষয়ে তিনি ভালো বলতে পারবেন। তবে দেশের কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেলা আয়োজনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা।

 

 

এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলেছেন, বছরের ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন এলাকার মার্কেট শপিংমলের দোকানিরা ঈদ-পূজা ও বৈশাখ ঘিরে বেচাকেনার অপেক্ষায় থাকেন। অথচ দেখা যায় জাতীয় কোন উৎসব এলেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সংঘবদ্ধ চক্র মেলার নামে মার্কেট-শপিংমলের কাছাকাছি খোলা জায়গা টার্গেট করে দোকান বসিয়ে একচেটিয়া বাণিজ্য করে অর্থ লুটে নিচ্ছেন মৌসুমি এ চক্রটি। এতে আর্থিকভাবে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ছেন দোকান মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানান তারা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আনন্দ মেলার নামে সারা দেশে সক্রিয় বাণিজ্য চক্র

আপডেট সময় : ০৪:২২:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ এপ্রিল ২০২৪

◆ইনডোরে আয়োজনের কথা বলেই নেওয়া হয় অনুমতি
◆ফুটবল মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খোলা জায়গায় বসছে দোকানপাট
◆মেলার অনুমতিতে লোকসানে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা

 

 

 

 

ঈদ-নববর্ষসহ যে কোনো ধরনের জাতীয় উৎসব এলেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তৎপর হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ চক্র। তারা ঈদ আনন্দ ও পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস মেলাসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানের নামে মেলার আয়োজন করছে। চক্রটি স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর প্রভাব বিস্তার করে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মেলার আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে লোকসানের ঘানি টানছেন আশপাশের মার্কেট-শপিংমল ও হাট-বাজারের ব্যবসায়ীরা। আয়োজিত এসব মেলার অধিকাংশই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করেছে। মন্ত্রণালয় থেকে বলা আছে, যেহেতু রমজান চলমান সেহেতু ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিক রাখাসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতেই এসব মেলা ইনডোরে আয়োজনের কথা বলেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

 

 

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এবার খোলা মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতিই দেয়া হয়নি। যারাই মেলা আয়োজন করবে, ইনডোরে আয়োজন করতে হবে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে কখনোই এসব মেলার আয়োজনের অনুমতি নেই। কারণ এটি আইনেই নিষিদ্ধ রয়েছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কোনো রকমের মেলার আয়োজন করা যাবে না। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইনে বলা আছে।
যদিও বাস্তব চিত্র সব আইন ও নিয়মের বিপরীত। খোলা মাঠেই চলছে মেলার আয়োজন। কোথাও মেলা চলছে, কোথাও আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কামরাঙ্গীরচরের দুটি স্পটে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এসব মেলা মূলত ঈদকে ঘিরে পোশাক-কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসানো হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায়ই মেলার দোকান ঘিরে বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। দেখা গেছে, কামরাঙ্গীরচরের কুড়ার ঘাটে সরকারি ৩৪ শয্যা হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে মেলায় আয়োজন করা হয়েছে। তা পরিচালনা করছেন আব্দুল বাতেন তালুকদার। রসুলপুর ব্রিজ মার্কেটের দক্ষিণ পাশে কাঠপট্টিতে মালিকের কাছ থেকে কিছুদিনের জন্য একটি খোলা জমি ভাড়া নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ওই জমিটি ডেভেলপার নাফিস ও ম্যানেজার আ. মজিদ দেখভাল করেন। তারা অর্থের বিনিময়ে মেলা পরিচালনার জন্য স্থানীয় এক নেতার কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এ দুটি স্থানের একটিতেও নেই জেলা প্রশাসক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কিংবা ডিএসসিসির অনুমতি। মানা হচ্ছে না কোনো বিধিবিধান। রসুলপুর ব্রিজ মার্কেট কমিটির নেতাদের বাধা উপেক্ষা করে স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই পরিচালনা করা হচ্ছে এসব মেলা। চলবে ঈদের পরে একসপ্তাহ পর্যন্ত। রাজধানীর উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের আজমপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠের সামনেও খোলা মাঠে মেলা হচ্ছে বলে জানা গেছে। উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের জমজম টাওয়ার সংলগ্ন খালি মাঠে আয়োজন করা হয়েছে ৪৫ দিনব্যাপী দেশীয় জামদানি শিল্পপণ্য ও বৈশাখী বাণিজ্যমেলা-২০২৪। মেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বেনারসি মসলিন অ্যান্ড জামদানি সোসাইটি। গত ২৪ মার্চ মেলাটির উদ্বোধন করা হয়।

 

 

মিরপুর-২ এর ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠে রনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয়েছে ঈদ আনন্দ ও বৈশাখী মেলা-২০২৪। আয়োজিত ওই মেলার উদ্বোধন করা হয় পয়লা রমজান (১২ মার্চ)। মিরপুর-১ এর দারুস সালাম এলাকার গোলারটেক মাঠেও আয়োজন করা হয়েছে ঈদ বস্ত্র, হস্ত ও কুঠিরশিল্প মেলা-২০২৪। দারুস সালাম থানা সংলগ্ন মাঠে ওই মেলাও উদ্বোধন করা হয় গত ১২ মার্চ। এছাড়াও সাভার, আশুলিয়া, মুন্সীগঞ্জ, লালমনিরহাট, টাঙ্গাইল ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মেলার আয়োজন করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা কালেক্টর ঈদগাঁ মাঠে যে মেলার আয়োজন করা হয়েছে তা নিয়ে স্থানীয় জনমনে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই বলেছেন, এ মাঠে টাঙ্গাইল ফুটবল ফেডারেশন এ মেলা আয়োজন করেছে। ফুটবল ফেডারেশন তো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, আর এ মাঠে এলাকার লোকজন নিয়মিত খেলাধুলা করে। তা থেকে এখন বঞ্চিত। এতে স্থানীয় পুলিশ ও জেলা প্রশাসন কিভাবে মেলা পরিচালনার অনুমোদন দিল তা বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য মেলেনি। বগুড়ার ঠনঠনিয়া মাঠে মেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় গণমাধ্যমের কতিপয় নেতা। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, এতে সম্মতি দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে তারা কেউ তথ্য দিতে রাজি হননি। দেশের অধিকাংশ এলাকার মেলা আয়োজনের অনুমতিতে গলদ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা জানায়, শুধু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষাই নয়, ট্রেড লাইসেন্সসহ মেলা আয়োজনে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রেও গলদ রয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিশেষ করে এসব অনিয়মের ধার ধারে না জেলা প্রশাসন। জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ মেলাই শতভাগ নিয়মবহির্ভূতভাবে আয়োজন করা হয়েছে। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে কেউই কোনো কথা বলে না। আয়োজকরা তাদের প্রচারের ব্যানারে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএমপিসহ সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের অনুমতিক্রমে মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

 

যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত মেলা আয়োজনের অনুমতি পেয়েছে মাত্র দু’-চারটি। অথচ মেলা আয়োজন হয়েছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। খোলা মাঠে মেলার আয়োজন করবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়ার পরই মেলার আয়োজনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ইনডোরে এসব মেলা আয়োজন করতে হবে এবং তথ্য-প্রমাণসহ ইনডোরে আয়োজনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এমনটি বলা আছে মেলা পরিচালনাকারীদের। যদি অনিয়মের মধ্য দিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়, তাহলে অভিযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আয়োজকরা খুবই ধুরন্ধর। তারা সব মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ‘সংলগ্ন মাঠ’ নামে একটি কমন শব্দের ব্যবহার করেন। অথচ সংলগ্ন মাঠ লিখেও মেলা আয়োজনের অনমুতি পাওয়ার কথা নয়। কারণ এবার খোলা মাঠে আয়োজন নিষেধ করা আছে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাঠে তো কোনো সুযোগই নেই।

 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ রেহান উদ্দিন (রপ্তানি-৭ শাখা) দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রমজানে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয় মাথায় রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খোলা মাঠে মেলা আয়োজন আপাতত ঈদ নাগাদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে আইন থাকায় কখনোই এর অনুমতি দেয় না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে যেসব মেলার আয়োজন হচ্ছে বা মন্ত্রণালয়ের কাছে আয়োজনের অনমুতি চাইছে তাদের মধ্য থেকে শুধু যারা ইনডোরে আয়োজন করবেন তাদেরই অনুমতি দেয়া হচ্ছে। যেমন কমিউনিটি সেন্টার, ক্লাব এসব স্থানে যারা আয়োজন করবেন তারাই কেবল অনুমতি পাবেন। জানতে চাইলে, এখন পর্যন্ত ঢাকায় ঠিক কতটি মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে তার সঠিক সংখা জানাতে পারেননি তিনি। তবে তিনি বলেন, খোলা মাঠে যেহেতু অনুমতি আপাতত দেওয়া হচ্ছে না সেহেতু খোলা মাঠে কেউ মেলার আয়োজন করলে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলার আয়োজনের সঠিক তথ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে এসব মেলার অনুমতি দেন জেলা প্রশাসক। সেগুলোর বিষয়ে তিনি ভালো বলতে পারবেন। তবে দেশের কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেলা আয়োজনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা।

 

 

এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলেছেন, বছরের ১১ মাসই দেশের বিভিন্ন এলাকার মার্কেট শপিংমলের দোকানিরা ঈদ-পূজা ও বৈশাখ ঘিরে বেচাকেনার অপেক্ষায় থাকেন। অথচ দেখা যায় জাতীয় কোন উৎসব এলেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সংঘবদ্ধ চক্র মেলার নামে মার্কেট-শপিংমলের কাছাকাছি খোলা জায়গা টার্গেট করে দোকান বসিয়ে একচেটিয়া বাণিজ্য করে অর্থ লুটে নিচ্ছেন মৌসুমি এ চক্রটি। এতে আর্থিকভাবে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ছেন দোকান মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানান তারা।