০২:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মিরপুরে আবারো বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য

➤ওরা দলবেঁধে চলে পাড়া-মহল্লায়
➤চুরি-ছিনতাই-দখল-চাঁদাবাজিতে সিদ্ধহস্ত 
➤নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার বড় ভাইয়েরা
➤স্বস্তিতে নেই বাড়িওয়ালা-হকার-পরিবহন ব্যবসায়ীরা
➤অভিভাবকদের সচেতনতা ও আইন সংশোধনের তাগিদ
রাজধানীর মিরপুরে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না তাদের দৌরাত্ম্য। এরা পাড়া-মহল্লায় চলাফেরা করে দলবেঁধে। সেসব দলের ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। রয়েছে হেয়ার স্টাইল। এলাকায় প্রেমের বিরোধ, মাদক বেচাকেনা, আধিপত্য বিস্তারে চুরি-ছিনতাই, দখল-চাঁদাবাজি ও মারামারি এমনকি খুনোখুনিতেও ওরা সিদ্ধহস্ত। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার কিছু বড় ভাই। হরহামেশাই ইভটিজিংয়ের শিকার কিশোরী-তরুণীরা তাদের দেখলেই আঁতকে ওঠে। এই গ্যাং কালচারের সর্বশেষ শিকার হন মিরপুরের কিশোর গ্যাং রাব্বি গ্রুপের সদস্য ফয়সাল ওরফে রাসেল। সম্প্রতি মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাংয়ের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। তারা হলেন  ইদ্রিস আলী (৪০) ও চাঁদনী (৩০)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর অপরাধ আর কিশোর গ্যাং অপরাধকে আইনত আলাদা করে দেখতে হবে। এতে আইনি সংশোধনী আনতে হবে। ওদের আড্ডাস্থল বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। একইসঙ্গে কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধে পারিবারিকভাবেই সন্তানদের দৈনন্দিন কাজের ওপর অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিশোর অপরাধ দমনে এলাকাভিত্তিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গতকাল সোমবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৮ এপ্রিল ভোরে ইদ্রিস আলী তার স্ত্রী চাঁদনীকে নিয়ে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। পল্লবীর সি ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই এলাকার কিশোর গ্যাং গ্রুপের কবলে পড়েন তারা। এসময় মাদকাসক্ত এক সদস্য তাদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করেছে বলে জানান আহত ইদ্রিসের মা মনোয়ারা বেগম। পরে তিনি তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যান। এর আগে গত ১৬ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এলাকার আধিপত্য বিস্তারে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং সানি গ্রুপের হামলায় খুন হন মো. ফয়সাল ওরফে রাসেল। এ ঘটনায় আহত হন রাশেদ। জানা গেছে, রাসেল হত্যাকাণ্ডে সায়মন ও ইয়াসিন নামে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া রাব্বি, গালকাটা পলাশ, কাল্লু, নাটা শাহীন, মুরাদ, কানা আকাশসহ ১১ জন সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়। তবে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি পুলিশ। নিহত রাসেলের বাবা শাহাদত হোসেন বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় তানজিলার স্বামী আকাশ ও ভাই শাহীন তার নিরপরাধ ছেলেকে খুন করেছে। ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানায়, অনিক গ্রুপ, ভাই গ্রুপ, অপু গ্রুপ, আব্বাস গ্রুপ, নাডা ইসমাইল, হ্যাপি, বগা হৃদয়, ভাস্কর, রবিন, এল কে ডেভিল বা বয়েজ এল কে তালতলা, পটেটো রুবেল, অতুল গ্রুপ, আশিক গ্রুপ, জল্লা মিলন গ্রুপ, রকি, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, মুসা-হারুন গ্রুপ ওরফে ভাই ভাই গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, ইসামিন, ইমন ও জুয়েল গ্রুপ, খলিল গ্রুপ, আড্ডু-মিলন ঢালী গ্রুপ, সুজন-রাসেল গ্রুপ, সুমন-বিপ্লব গ্রুপ, সাগর গ্রুপ, জয় গ্রুপ, রবিউল ওরফে সুটার রবু গ্রুপ, মিরাজ ওরফে ভাগিনা মিরাজ গ্রুপও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মিরপুর-পল্লবী এলাকায়। মিরপুর-পল্লবী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের ৫০০ সদস্য। পল্লবীতে কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের হাল ধরেছে আশিক গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্যরা এতই ভয়ঙ্কর যেÑ তারা তুচ্ছ ঘটনায় যেখানে সেখানে মানুষকে ছুরিকাঘাত করে আহত করছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, জমিদখলে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ভইরা দে গ্রুপের নেতা আশিকসহ তার সদস্যদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। চক্রের গডফাদার মামুন, সজিব , রানা, রানা বাবু ও প্যারিস। এরা হলো মিরপুর-১৩ নাম্বার কিশোর গ্যাংয়ের লিডার। মামুন ওরফে বিআরটিএ মামুন বলে পরিচিত। সে পুলিশকে ম্যানেজ করে তার কার্যক্রম চালিয়ে চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তার সাথে সজীবও রয়েছে। মো. রানা ওরফে রংবাজ রানা, রানা বাবু ও প্যারিসসহ অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য নিয়ে তারা মিরপুর ১৩, ১৪ ও কাফরুল থানা এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিরপুর-১ ও দারুস সালাম এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে মোহাম্মদ খাইরুল, মোহাম্মদ রতন ও মোহাম্মদ জনি। তারা এলাকার যুবলীগ নেতা পরিচয়ে দিয়ে লালন করছে কিশোর গ্যাং গ্রুপের শতাধিক সদস্য। এই তিন চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট মিলে প্রতিদিন ওইসব এলাকার আড়ৎ, কাঁচাবাজর, ফুটপাত ও লেগুনা স্ট্যান্ড, ৩ হাজার অটোরিকশা থেকে গড়ে প্রতিদিন এক লাখ টাকা চাঁদা উঠায়। যা মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা উঠায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং সরব মিরপুর-পল্লবী এলাকায়। গ্যাং সদস্যদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্থানীয় কাউন্সিলর ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের নামও উঠে এসেছে। কোনো কোনো গ্রুপের নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামও। ২০২১ সালে শিশু সন্তানের সামনে শাহিনুদ্দিন নামে এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন কিশোর গ্যাং লিডার সুমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা। সুমন জামিনে এসে এখন ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত দুই সপ্তাহে তার বাহিনীর হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন ৬ জন। খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে এলাকায় চলছে জমি দখলের মচ্ছব। সন্ত্রাসী সহিদুলের নেতৃত্বে বাউনিয়াবাঁধে চলছে আরেকটি কিশোর গ্যাং  গ্রুপ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু মিরপুরই নয়, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সারা দেশে দিন দিন বেড়েই চলছে। কিশোর গ্যাং আতঙ্কে সাধারণ মানুষ এখন দিশাহারা। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির হাত থেকে মানুষ এখন মুক্তি চায়। শুধু তাই নয়, কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে এসব উঠতি যুবকের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহরূপে দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তা বাস্তবায়নে কাজও শুরু করেছে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক জানান, গত ১৭ ও ১৮ মার্চ টানা দু’দিন মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় বিশেষ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যা অব্যাহত রয়েছে।
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিরপুর) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন মোল্লা জানান, কিশোর গ্যাং নির্মূলে মিরপুর-পল্লবী এলাকায় প্রতিদিনই অভিযান চলছে। অনেককেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাবি’র সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শুধু মিরপুরেই নয়, কিশোর গ্যাং এখন দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় সক্রিয়। শিশুদের লালন-পালন করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলো শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য বিষয়ে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। সঠিক ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা তৈরি হচ্ছে। এগুলো প্রশমিত না হওয়ায় তারা নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশেক মাহমুদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন চালাতে হবে, যেন কিশোর গ্যাংয়ের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। ২. আইসিটির সহায়তায় কিশোর গ্যাংয়ের যত অনলাইন গ্রুপ আছে সব চিহ্নিতপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. ‘কিশোর’ অপরাধ আর ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধকে আইনত আলাদা করে দেখতে হবে। ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধের বিচার কিশোর-আদালতের অন্তর্ভুক্ত না করে কিশোর গ্যাং অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মীমাংসা করতে হবে। ৪. ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধের বিচারের জন্য আইনি সংশোধনী আনতে হবে, যাতে করে ‘বড় ভাই’দের বিচার নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পদক্ষেপে সুদৃঢ় সংস্কার আনতে হবে। ও ৫. শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মান উন্নয়নে জোর দিতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে, ক্লাস ফাঁকি রোধে কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলা জারি রাখতে হবে।
জনপ্রিয় সংবাদ

মিরপুরে আবারো বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য

আপডেট সময় : ০৭:৩২:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪
➤ওরা দলবেঁধে চলে পাড়া-মহল্লায়
➤চুরি-ছিনতাই-দখল-চাঁদাবাজিতে সিদ্ধহস্ত 
➤নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার বড় ভাইয়েরা
➤স্বস্তিতে নেই বাড়িওয়ালা-হকার-পরিবহন ব্যবসায়ীরা
➤অভিভাবকদের সচেতনতা ও আইন সংশোধনের তাগিদ
রাজধানীর মিরপুরে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না তাদের দৌরাত্ম্য। এরা পাড়া-মহল্লায় চলাফেরা করে দলবেঁধে। সেসব দলের ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। রয়েছে হেয়ার স্টাইল। এলাকায় প্রেমের বিরোধ, মাদক বেচাকেনা, আধিপত্য বিস্তারে চুরি-ছিনতাই, দখল-চাঁদাবাজি ও মারামারি এমনকি খুনোখুনিতেও ওরা সিদ্ধহস্ত। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার কিছু বড় ভাই। হরহামেশাই ইভটিজিংয়ের শিকার কিশোরী-তরুণীরা তাদের দেখলেই আঁতকে ওঠে। এই গ্যাং কালচারের সর্বশেষ শিকার হন মিরপুরের কিশোর গ্যাং রাব্বি গ্রুপের সদস্য ফয়সাল ওরফে রাসেল। সম্প্রতি মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাংয়ের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী। তারা হলেন  ইদ্রিস আলী (৪০) ও চাঁদনী (৩০)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর অপরাধ আর কিশোর গ্যাং অপরাধকে আইনত আলাদা করে দেখতে হবে। এতে আইনি সংশোধনী আনতে হবে। ওদের আড্ডাস্থল বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। একইসঙ্গে কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধে পারিবারিকভাবেই সন্তানদের দৈনন্দিন কাজের ওপর অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিশোর অপরাধ দমনে এলাকাভিত্তিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গতকাল সোমবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৮ এপ্রিল ভোরে ইদ্রিস আলী তার স্ত্রী চাঁদনীকে নিয়ে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। পল্লবীর সি ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই এলাকার কিশোর গ্যাং গ্রুপের কবলে পড়েন তারা। এসময় মাদকাসক্ত এক সদস্য তাদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করেছে বলে জানান আহত ইদ্রিসের মা মনোয়ারা বেগম। পরে তিনি তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যান। এর আগে গত ১৬ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এলাকার আধিপত্য বিস্তারে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং সানি গ্রুপের হামলায় খুন হন মো. ফয়সাল ওরফে রাসেল। এ ঘটনায় আহত হন রাশেদ। জানা গেছে, রাসেল হত্যাকাণ্ডে সায়মন ও ইয়াসিন নামে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া রাব্বি, গালকাটা পলাশ, কাল্লু, নাটা শাহীন, মুরাদ, কানা আকাশসহ ১১ জন সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়। তবে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি পুলিশ। নিহত রাসেলের বাবা শাহাদত হোসেন বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় তানজিলার স্বামী আকাশ ও ভাই শাহীন তার নিরপরাধ ছেলেকে খুন করেছে। ছেলে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানায়, অনিক গ্রুপ, ভাই গ্রুপ, অপু গ্রুপ, আব্বাস গ্রুপ, নাডা ইসমাইল, হ্যাপি, বগা হৃদয়, ভাস্কর, রবিন, এল কে ডেভিল বা বয়েজ এল কে তালতলা, পটেটো রুবেল, অতুল গ্রুপ, আশিক গ্রুপ, জল্লা মিলন গ্রুপ, রকি, পিন্টু-কাল্লু গ্রুপ, মুসা-হারুন গ্রুপ ওরফে ভাই ভাই গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ, ইসামিন, ইমন ও জুয়েল গ্রুপ, খলিল গ্রুপ, আড্ডু-মিলন ঢালী গ্রুপ, সুজন-রাসেল গ্রুপ, সুমন-বিপ্লব গ্রুপ, সাগর গ্রুপ, জয় গ্রুপ, রবিউল ওরফে সুটার রবু গ্রুপ, মিরাজ ওরফে ভাগিনা মিরাজ গ্রুপও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মিরপুর-পল্লবী এলাকায়। মিরপুর-পল্লবী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৩০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের ৫০০ সদস্য। পল্লবীতে কিশোর গ্যাং ‘ভইরা দে’ গ্রুপের হাল ধরেছে আশিক গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্যরা এতই ভয়ঙ্কর যেÑ তারা তুচ্ছ ঘটনায় যেখানে সেখানে মানুষকে ছুরিকাঘাত করে আহত করছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, জমিদখলে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ভইরা দে গ্রুপের নেতা আশিকসহ তার সদস্যদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। চক্রের গডফাদার মামুন, সজিব , রানা, রানা বাবু ও প্যারিস। এরা হলো মিরপুর-১৩ নাম্বার কিশোর গ্যাংয়ের লিডার। মামুন ওরফে বিআরটিএ মামুন বলে পরিচিত। সে পুলিশকে ম্যানেজ করে তার কার্যক্রম চালিয়ে চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তার সাথে সজীবও রয়েছে। মো. রানা ওরফে রংবাজ রানা, রানা বাবু ও প্যারিসসহ অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য নিয়ে তারা মিরপুর ১৩, ১৪ ও কাফরুল থানা এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিরপুর-১ ও দারুস সালাম এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে মোহাম্মদ খাইরুল, মোহাম্মদ রতন ও মোহাম্মদ জনি। তারা এলাকার যুবলীগ নেতা পরিচয়ে দিয়ে লালন করছে কিশোর গ্যাং গ্রুপের শতাধিক সদস্য। এই তিন চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট মিলে প্রতিদিন ওইসব এলাকার আড়ৎ, কাঁচাবাজর, ফুটপাত ও লেগুনা স্ট্যান্ড, ৩ হাজার অটোরিকশা থেকে গড়ে প্রতিদিন এক লাখ টাকা চাঁদা উঠায়। যা মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা উঠায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং সরব মিরপুর-পল্লবী এলাকায়। গ্যাং সদস্যদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে স্থানীয় কাউন্সিলর ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের নামও উঠে এসেছে। কোনো কোনো গ্রুপের নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামও। ২০২১ সালে শিশু সন্তানের সামনে শাহিনুদ্দিন নামে এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন কিশোর গ্যাং লিডার সুমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা। সুমন জামিনে এসে এখন ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত দুই সপ্তাহে তার বাহিনীর হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন ৬ জন। খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে এলাকায় চলছে জমি দখলের মচ্ছব। সন্ত্রাসী সহিদুলের নেতৃত্বে বাউনিয়াবাঁধে চলছে আরেকটি কিশোর গ্যাং  গ্রুপ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু মিরপুরই নয়, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সারা দেশে দিন দিন বেড়েই চলছে। কিশোর গ্যাং আতঙ্কে সাধারণ মানুষ এখন দিশাহারা। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির হাত থেকে মানুষ এখন মুক্তি চায়। শুধু তাই নয়, কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে এসব উঠতি যুবকের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহরূপে দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তা বাস্তবায়নে কাজও শুরু করেছে পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক জানান, গত ১৭ ও ১৮ মার্চ টানা দু’দিন মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় বিশেষ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যা অব্যাহত রয়েছে।
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিরপুর) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন মোল্লা জানান, কিশোর গ্যাং নির্মূলে মিরপুর-পল্লবী এলাকায় প্রতিদিনই অভিযান চলছে। অনেককেই গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাবি’র সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শুধু মিরপুরেই নয়, কিশোর গ্যাং এখন দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় সক্রিয়। শিশুদের লালন-পালন করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলো শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য বিষয়ে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। সঠিক ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে কিশোরদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা তৈরি হচ্ছে। এগুলো প্রশমিত না হওয়ায় তারা নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশেক মাহমুদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন চালাতে হবে, যেন কিশোর গ্যাংয়ের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। ২. আইসিটির সহায়তায় কিশোর গ্যাংয়ের যত অনলাইন গ্রুপ আছে সব চিহ্নিতপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. ‘কিশোর’ অপরাধ আর ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধকে আইনত আলাদা করে দেখতে হবে। ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধের বিচার কিশোর-আদালতের অন্তর্ভুক্ত না করে কিশোর গ্যাং অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মীমাংসা করতে হবে। ৪. ‘কিশোর গ্যাং’ অপরাধের বিচারের জন্য আইনি সংশোধনী আনতে হবে, যাতে করে ‘বড় ভাই’দের বিচার নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পদক্ষেপে সুদৃঢ় সংস্কার আনতে হবে। ও ৫. শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মান উন্নয়নে জোর দিতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে, ক্লাস ফাঁকি রোধে কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলা জারি রাখতে হবে।