০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নির্মাণ খাতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

  • একযুগে ১৫০০ শ্রমিকের প্রাণহানি 
  • পঙ্গুত্ব বরণে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন অনেকে

দেশে ইমারত নির্মাণ খাতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে দুর্ঘটনা। শ্রমিক মৃত্যুর পাশাপাশি রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ পথচারীরাও। তদারকির অভাবে এই সেক্টরে দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। নির্মাণ শ্রমিকরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। বর্তমানে আইনের ১০ শতাংশও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিক পক্ষ। যেন এসব দেখার কেউ নেই। এর ফলে এই সেক্টরটি নিরাপদ হচ্ছে না। এতে করে নির্মাণ সেক্টরে মৃত্যু মিছিল বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা থাকার পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই দেশে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যেও অসাবধানতা রয়েছে। এ কারণেই এই সেক্টরে প্রতিদিনই শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এ খাতে অনেকেই আহত হয়ে পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে বেঁচে আছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এই দুর্ঘটনা রোধ করতে তদারকি সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) একটু নজরদারি করলে শ্রমিক দুর্ঘটনা কমতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ শিল্প দেশের অর্থনীতির এক তেজি খাত। এ খাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তাসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা শ্রম আইনে বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে সব জায়গায় এ বাধ্যবাধকতা মানা হচ্ছে না। নির্মাণ শ্রমিকদের বাড়ছে এ খাতে হতাহতের সংখ্যা। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে কাজ করছিলেন নির্মাণশ্রমিক আবুল হোসেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় অসাবধানতাবশত ভবন থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবনতি ঘটলে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা মেডিক্যালে আনলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর দক্ষিণখানের গণ-কবরস্থান রোডের ফায়দাবাদ এলাকায় নির্মাণাধীন ১০তলা ভবনে কাজ নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মো. সেলিম মিয়া (২৩) নামের এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে মতিঝিলে ফকিরাপুল জামে মসজিদের নির্মাণাধীন ভবনের সপ্তম তলা থেকে পড়ে আশিকুর রহমান (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

নির্মাণাধীন ওই মসজিদের খাদেম মো. বেলাল বলেন, নিহত শ্রমিক আমাদের মসজিদে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। ঘটনার দিন রাতের দিকে কাজ করার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, পৃথক এসব মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রমিকরা জানান, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখের মতো নির্মাণ শ্রমিক কাজ করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বহুতল ভবনে নির্মাণ শ্রমিকরা অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করে। তাতে কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। শ্রমিকরা আইনি সুরক্ষাও পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি অভাব, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকপক্ষের অবহেলার কারণে এমন ঘটনাগুলো ঘটছে। এতে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে বেঁচে রয়েছেন। হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। ইমারত নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ শিল্প আমাদের অর্থনীতির এক তেজি খাত।

এ খাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তাসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা শ্রম আইনে বলা আছে। নির্দিষ্ট আইন মানা হলে এসব দুর্ঘটনা থেকে রাক্ষা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবহনের পরই রয়েছে নির্মাণ শ্রমিকের অবস্থান। গড়ে প্রতি বছর শতাধিক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৫২ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২২ সালে ১১৮ জন, ২০২১ সালে ১৫৪, ২০২০ সালে ৮৪, ২০১৯ সালে ১৩৪, ২০১৮ সালে ১৬১, ২০১৭ সালে ১৩৪, ২০১৬ সালে ৮৫, ২০১৫ সালে ৬১, ২০১৪ সালে ১০২, ২০১৩ সালে ৯৫, ২০১২ সালে ১১৩ ও ২০১১ সালে ১১১ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া ২০২৩ সালে প্রাণ হারিয়েছেন আরো অন্তত দেড় থেকে দুই শতাধিক শ্রমিক। আহত হয়েছে প্রায় ৩০০ শ্রমিক। এর বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও শ্রমিকদের অসচেতনতার কারণে। এ বিষেয়ে বিলসের উপ-পরিচালক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. ইউসুফ আল মামুন বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ নিরাপত্তার অভাব। কাজের সময় নিরাপত্তার জন্য যে সরঞ্জাম রয়েছে সেটা তারা ব্যবহার করে না। ইমারত নির্মাণের কোম্পানিগুলো মূলত ঠিকাদারদের মাধ্যম শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আর শ্রমিকদের আয় থেকে একটি অংশ নিয়মিতভাবে নিয়ে নেয় ওই ঠিকাদাররা। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে কিংবা পরে হতাহত শ্রমিকদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকারীদের। এছাড়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণের সময় চারিপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে হবে। কিন্তু নির্মাণ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এ খাতে কোনো বিনিয়োগ করে না। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) তথ্যমতে, দেশে এ খাতে নিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শ্রমিক মারা যান নির্মাণস্থলে উঁচু থেকে নিচে পড়ে। প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিকের হাত-পা ভেঙে যায় দুর্ঘটনায়। বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৬০ শতাংশ শ্রমিক বিভিন্ন অঙ্গহানির শিকার হয়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, নির্মাণ শ্রমিক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ দায়ভার নির্মাণাধীন ভবনের মালিকদের। শ্রমিকদের অসচেতনতাও দায়ী। শ্রম আইন মেনে চললে নির্মাণ খাতে প্রতি বছর এত শ্রমিকের মৃত্যু হতো না।

ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত পবিপ্রবি?

নির্মাণ খাতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

আপডেট সময় : ১২:১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ মে ২০২৪
  • একযুগে ১৫০০ শ্রমিকের প্রাণহানি 
  • পঙ্গুত্ব বরণে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন অনেকে

দেশে ইমারত নির্মাণ খাতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে দুর্ঘটনা। শ্রমিক মৃত্যুর পাশাপাশি রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ পথচারীরাও। তদারকির অভাবে এই সেক্টরে দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। নির্মাণ শ্রমিকরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। বর্তমানে আইনের ১০ শতাংশও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিক পক্ষ। যেন এসব দেখার কেউ নেই। এর ফলে এই সেক্টরটি নিরাপদ হচ্ছে না। এতে করে নির্মাণ সেক্টরে মৃত্যু মিছিল বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা থাকার পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই দেশে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যেও অসাবধানতা রয়েছে। এ কারণেই এই সেক্টরে প্রতিদিনই শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এ খাতে অনেকেই আহত হয়ে পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে বেঁচে আছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এই দুর্ঘটনা রোধ করতে তদারকি সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) একটু নজরদারি করলে শ্রমিক দুর্ঘটনা কমতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ শিল্প দেশের অর্থনীতির এক তেজি খাত। এ খাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তাসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা শ্রম আইনে বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে সব জায়গায় এ বাধ্যবাধকতা মানা হচ্ছে না। নির্মাণ শ্রমিকদের বাড়ছে এ খাতে হতাহতের সংখ্যা। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে কাজ করছিলেন নির্মাণশ্রমিক আবুল হোসেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় অসাবধানতাবশত ভবন থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবনতি ঘটলে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা মেডিক্যালে আনলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর দক্ষিণখানের গণ-কবরস্থান রোডের ফায়দাবাদ এলাকায় নির্মাণাধীন ১০তলা ভবনে কাজ নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মো. সেলিম মিয়া (২৩) নামের এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে মতিঝিলে ফকিরাপুল জামে মসজিদের নির্মাণাধীন ভবনের সপ্তম তলা থেকে পড়ে আশিকুর রহমান (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

নির্মাণাধীন ওই মসজিদের খাদেম মো. বেলাল বলেন, নিহত শ্রমিক আমাদের মসজিদে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। ঘটনার দিন রাতের দিকে কাজ করার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন তিনি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, পৃথক এসব মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শ্রমিকরা জানান, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখের মতো নির্মাণ শ্রমিক কাজ করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বহুতল ভবনে নির্মাণ শ্রমিকরা অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করে। তাতে কোনো ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। শ্রমিকরা আইনি সুরক্ষাও পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি অভাব, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকপক্ষের অবহেলার কারণে এমন ঘটনাগুলো ঘটছে। এতে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবারের বোঝা হয়ে বেঁচে রয়েছেন। হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। ইমারত নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ শিল্প আমাদের অর্থনীতির এক তেজি খাত।

এ খাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তাসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা শ্রম আইনে বলা আছে। নির্দিষ্ট আইন মানা হলে এসব দুর্ঘটনা থেকে রাক্ষা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবহনের পরই রয়েছে নির্মাণ শ্রমিকের অবস্থান। গড়ে প্রতি বছর শতাধিক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৫২ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২২ সালে ১১৮ জন, ২০২১ সালে ১৫৪, ২০২০ সালে ৮৪, ২০১৯ সালে ১৩৪, ২০১৮ সালে ১৬১, ২০১৭ সালে ১৩৪, ২০১৬ সালে ৮৫, ২০১৫ সালে ৬১, ২০১৪ সালে ১০২, ২০১৩ সালে ৯৫, ২০১২ সালে ১১৩ ও ২০১১ সালে ১১১ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া ২০২৩ সালে প্রাণ হারিয়েছেন আরো অন্তত দেড় থেকে দুই শতাধিক শ্রমিক। আহত হয়েছে প্রায় ৩০০ শ্রমিক। এর বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও শ্রমিকদের অসচেতনতার কারণে। এ বিষেয়ে বিলসের উপ-পরিচালক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. ইউসুফ আল মামুন বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ নিরাপত্তার অভাব। কাজের সময় নিরাপত্তার জন্য যে সরঞ্জাম রয়েছে সেটা তারা ব্যবহার করে না। ইমারত নির্মাণের কোম্পানিগুলো মূলত ঠিকাদারদের মাধ্যম শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আর শ্রমিকদের আয় থেকে একটি অংশ নিয়মিতভাবে নিয়ে নেয় ওই ঠিকাদাররা। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে কিংবা পরে হতাহত শ্রমিকদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকারীদের। এছাড়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণের সময় চারিপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে হবে। কিন্তু নির্মাণ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এ খাতে কোনো বিনিয়োগ করে না। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) তথ্যমতে, দেশে এ খাতে নিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শ্রমিক মারা যান নির্মাণস্থলে উঁচু থেকে নিচে পড়ে। প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিকের হাত-পা ভেঙে যায় দুর্ঘটনায়। বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৬০ শতাংশ শ্রমিক বিভিন্ন অঙ্গহানির শিকার হয়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, নির্মাণ শ্রমিক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ দায়ভার নির্মাণাধীন ভবনের মালিকদের। শ্রমিকদের অসচেতনতাও দায়ী। শ্রম আইন মেনে চললে নির্মাণ খাতে প্রতি বছর এত শ্রমিকের মৃত্যু হতো না।