➤ব্যাহত হচ্ছে তৃণমূলের স্বাস্থ্য সেবা ও সচেতনতা কার্যক্রম
➤বন্ধের শঙ্কায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া বহু ক্লিনিক
➤বর্তমানে দেশে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৮
➤আগামী ৫ বছরে আরো ১৮ হাজার ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার টার্গেট
দেশের জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। সমতলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে উপকূলীয় এলাকা, চরাঞ্চল সবখানেই এই ক্লিনিকগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। সব বয়সি সব মানুষের জন্য এই ক্লিনিকগুলো উন্মুক্ত হলেও এখনও পর্যন্ত মূল সেবা গ্রহীতা নারী ও শিশু। তবে, নানা কারণে এই সেবা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সেবাদাতাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি এখনও পূরণ না হওয়ায় এ সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যে কমিউনিটি ক্লিনিক তৃণমূলের মানুষের আশা ভরসার স্থল সেই ক্লিনিক সবগুলো যে খুব সুন্দরভাবে চলছে এমনটি বলার সুযোগ নেই। কোথাও কোথাও নদী ভাঙনের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিক ভেঙে পড়েছে। কোথাও মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সেখানে আর স্টাফরা অফিস করতে পারছেন না। কোথাও বা নির্মানাধীন আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কোথাওবা কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে গিয়ে রোগীরা সবসময় সেবা পায় না। গিয়ে দেখে তালা ঝুলছে। এমন সামান্য কিছু ঘাটতি-অসঙ্গতি থাকলেও কমিউনিটি ক্লিনিক দেশের প্রান্তিক মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে।
এখানে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি)দের অভিযোগ তাদের কোনো পদোন্নতি হয় না। নেই প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুবিধা। তারা বেতন পেতে চান ১১তম গ্রেডে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আয়োজিত ১৯৭৮ সালের আলমা-আটা শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। আলমা আটার ঘোষণা ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার মাধ্যমে ‘২০০০ সনের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য’। কিন্তু ১৯৯৬ সনের সমীক্ষায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ লক্ষ্যের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট বিল সংসদে পাস হয়। ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন (বর্তমানও) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের গিমাডাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধনের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা কার্যক্রমের সূচনা করেন। ১৯৯৮-২০০১ সময়ে ১০ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মিত ও অধিকাংশই চালু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং এ অবস্থা ২০০৮ পর্যন্ত চলে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নদীভাঙ্গন ও অন্যান্য কারণে ৯৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে যায় এবং ১০,৬২৪টি বিদ্যমান থাকে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাপ্রসূত একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কার্যক্রম কমিউনিটি ক্লিনিক যা কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি) অপারেশনাল প্ল্যান এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে নিলেও বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৮-২০০১ সময়ে নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামত, জনবল পদায়ন, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহপূর্বক এবং নতুন নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ক্রমে চালু করা হয়। এটি ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে ৪র্থ সেক্টর সিবিএইচসি অপারেশনাল প্ল্যান ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হয়।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার লাইন ডিরেক্টর ডা. কাইয়ুম তালুকদার দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত আমাদের বর্তমানে ১৪৩১৮টা কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। প্রতিনিয়তই নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হচ্ছে। প্রতিমাসেই ২-৪টা করে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হচ্ছে। এই তথ্য প্রতি মাসে আসে। এপ্রিলের তথ্যটা এখনও হাতে আসেনি। আমাদের এই বছরের জুন পর্যন্ত ১৪৮৯০টি ক্লিনিক চালুর টার্গেট ছিল। কিন্তু সম্ভবত এই বছরে এই টার্গেট পূরণ হবে না। এই কাজটি করে ফিজিক্যাল ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্ট (পিএফডি)। তারা হয়ত এ বছর পারবে না। আগামীতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির টার্গেট পূর্ণ করব এটা আমাদের পরিকল্পনা আছে।
সম্প্রতি এক বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেছেন, প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক ভরসার স্থলে পরিণত হয়েছে। এজন্য জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান কমিউনিটি ক্লিনিকের টেকসই অগ্রযাত্রায় সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত স্টাফরা তাদের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট না। তারা চাকরির উন্নয়ন চান। এ প্রসঙ্গে লাইন ডিরেক্টর ডা. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, ওরা তো রাজস্ব খাতের স্টাফ না। ওরা প্রজেক্টের স্টাফ। ওদের এই জিনিসগুলো পাওয়ার কথা না। আপনার চাকরির শর্ত যা ছিল, আপনি যদি এখন এই শর্ত থেকে বের হয়ে অন্যের শর্তের সঙ্গে তুলনা করতে থাকেন তাহলে তো হলো না। বেসিক জিনিসটা বুঝতে হবে। আমি চাইলেই তো পাব না। তারপরও প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন তাদের কোনো সুযোগ-সুবিধা দেবেন। তাহলে হয়ত পাবে। সেটা উনি চাচ্ছেন, এদেরকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার। সেটার প্রক্রিয়া চলছে। সেটা সমাপ্ত হলে আপনারা জানতে পারবেন।
কমিউনিটি ক্লিনিক সবার জন্যই উন্মুক্ত উল্লেখ করে লাইন ডিরেক্টর ডা. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, বয়স্ক বা শিশু সবাই সেখান থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল কাজটা হচ্ছে মানুষকে স্বাস্থ্যশিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলা। আগে একজন মানুষ অসুস্থ হলে কবিরাজের কাছে যেত, গ্রামের যে পল্লী ডাক্তার তাদের দ্বারা প্রতারিত হত, ভালো চিকিৎসা পেত না, তাদের দ্বারা ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত। এটা যেন না হয়, এটাই হচ্ছে আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য। মানুষকে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া। যাতে মানুষ বুঝতে পারে কোন অসুখ হলে তার কোথায় যাওয়া দরকার, কার কাছে যাওয়া দরকার। কোথায় গেলে ভালো চিকিৎসা পাবে। এই যে রেফারেল লিংক এই লিংকটা আমাদের সিএইচসিপি করে দিবে।
সে জানে কোন অসুখের জন্য কোথায় ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে। সেই রেফারেল লিংকেজ পাওয়ার জন্য তাকে আমরা ট্রেনিং দিয়েছি। সেই অনুযায়ী, আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন তাদেরকে রেফারেল করবে জায়গামতো। যাতে সে ভালোভাবে স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে। এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলেও আমাদের যে উদ্দেশ্য তা ভালোভাবে সফল হবে। কারণ মানুষকে যদি স্বাস্থ্যশিক্ষায় শিক্ষিত না করা যায়, যেমন একটা সময় ছিল মানুষ ইপিআইয়ের ভ্যাকসিন নিতে চাইত না, মনে করত যে ভ্যাকসিন নিলে আমার সন্তান মারা যাবে। অথচ দেখেন মানুষকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দিতে দিতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে মা তার সন্তান হলে নিজেই স্বাস্থ্যকর্মীকে ফোন দেয় আমার সন্তান হয়েছে কবে টিকা দিবে? এইটাই হচ্ছে স্বাস্থ্য শিক্ষার একটা বাস্তব প্রমাণ। সবক্ষেত্রে যেন, আমাদের জনগণের মাঝে স্বাস্থ্যশিক্ষার জ্ঞানটা চলে আসে এটাই আমাদের উদ্দেশ্য।
কমিউনিটি ক্লিনিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর মাধ্যমে তৈরি। সব কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে জনগণের দান করা জমিতে। সরকার ভবন নির্মাণ, সেবাদানকারী নিয়োগ, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সরবরাহ করছে। পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করছে সরকার এবং জনগণ সম্মিলিতভাবে। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল অংশ নিয়ে ১৩-১৭ সদস্যবিশিষ্ট (এর মধ্যে অন্ততপক্ষে ৪ জন নারী) একটি কমিউনিটি গ্রুপ (সিজি) আছে। এই পরিচালনা কমিটির (সিজি) সভাপতি হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার।
























