০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশের অধিকাংশ জেলায় নেই কোনো বনাঞ্চল

➤ বন আছে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম
➤বিশ্বে প্রথম সফল উপকূলীয় বনায়ন উৎপাদনকারী বাংলাদেশ
➤গাছ লাগানোর কর্মসূচি থাকলেও নেই বন সৃজন কর্মসূচি

 

বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেশের বনভূমির একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ রয়েছে। সেই ম্যাপটিতে দেখা গেছে- দেশের অল্প স্থানে বনভূমি আছে, পরিমাণে যা দেশের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। যা সমতল এলাকায় ১৪ দশমিক এক শতাংশ। এই অবস্থায় দেশের বন অধিদপ্তরের সামাজিক বনায়নের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। তবে, উপকূলে বন সৃজন কার্যক্রম থাকলেও সমতলে নেই এ ধরনের কোনো তৎপরতা। অদূর ভবিষ্যতে নতুন বন তৈরির সম্ভাবনাও কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বন অধিদপ্তরের ২০১৯-২০২০ সালের জেলাভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৯০৭ দশমিক ৫২ একর। আর মোট বনভূমির পরিমাণ ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০৯ দশমিক ৩৩ একর। আমরাই সর্বপ্রথম সফল উপকূলীয় বনায়নকারী দেশ। উপকূলীয় চরাঞ্চলে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫২১ বর্গ কি.মি. চর বনায়ন করা হয়েছে। দেশে পাহাড়ি বনের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি বনভূমির পরিমাণ ৬ হাজার ৭০ হাজার হেক্টর যা বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এটির অবস্থান চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের পাহাড়ি এলাকা।

 

 

শাল বনের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ বন মূলত গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় অবস্থিত। তাছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় অল্প কিছু শালবন রয়েছে।

 

 

সুন্দরবন বিশে^র সবচেয়ে বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এ বন অবস্থিত। এর পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর যা দেশের আয়তনের ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ। সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে।

 

 

দেশে ২০১৯ সালে পরিচালিত বন জরিপ ও পরিবীক্ষণে দেখা যায়, সারা দেশের বন ও বনের বাইরে বৃক্ষ সম্পদের ন্যাশনাল গ্রোয়িং স্টকের পরিমাণ ৩৮৪ মিলিয়ন ঘন মিটার। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ বন এলাকার বাইরে অবস্থিত বৃক্ষ সম্পদ থেকে আসে। এতে প্রধান বায়োমাস উৎপাদনকারী তিনটি বৃক্ষ আম, সুন্দরি ও মেহগনি। মাটির ওপরের বৃক্ষ সম্পদ, মাটির নিচের বৃক্ষ সম্পদ এবং মাটির মধ্যে (৩০ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত) সঞ্চিত কার্বনের পরিমাণ ১২৭৬ মিলিয়ন টন। বৃক্ষ ও বনজসম্পদ সামগ্রী সংগ্রহকারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী এবং ৫৪ শতাংশ পরিবার বৃক্ষ ও বন থেকে ওষুধি উপকার পেয়েছে।

 

 

বর্তমানে দেশে বন অধিদপ্তর গাছ লাগানোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর আওতায় সারা দেশে বর্ষা মৌসুমে গাছের চারা রোপণের টার্গেট রেখেছে ৮ কোটি ৩৩ লাখ। তাদের সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম থাকলেও নেই বন সৃজন কার্যক্রম।

 

 

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এণ্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, বন ধ্বংস করা যায়, সৃষ্টি করা যায় না। সামাজিক বনায়নের নামে কিছু গাছ লাগানো যায় এতে বন হয় না। মধুপুরের বন, সুন্দরবন কিংবা বান্দরবানের পাহাড়ের বন এগুলো প্রাকৃতিক বন। এগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং বনবিভাগ যে হিসাব বলছে ১২ শতাংশ আসলে তার চেয়েও কম আছে। আমরা তো জরিপ করিনি তাই হিসাব করে বলতে পারব না। বন মানেই হচ্ছে প্রাকৃতিক বন। এটা প্রকৃতিরই সৃষ্টি। বনের যেন ক্ষতি না হয় সেটা দেখাটাই মানুষের কাজ। কিন্তু বন বিভাগ তৈরি করা হয়েছিল এগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। কিন্তু বন বিভাগ এখন বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। যারা বন ধ্বংস করে তাদের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ জড়িত। এরা মূলত বনখেকো হিসেবে পরিচিত। এরা মিলেমিশে বন ধ্বংস করে। এখন যেটুকু বন আছে সেটুকু রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের সদিচ্ছা দরকার। এতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ দরকার। তাদেরকে দেখভালের দায়িত্বটা দেওয়া দরকার, বনবিভাগকে না। বন বিভাগকে যত ক্ষমতায়িত করবে, তত বন ধ্বংস হবে। এটা গত ৫-৬ দশকে আমাদের অভিজ্ঞতা।

 

 

 

 

প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সমন্বয়ক ও কৃষক দেলোয়ার জাহান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যেটা আমরা বন অধিদপ্তরের ম্যাপে বন দেখছি এগুলো সরকারের অধিগ্রহণে আছে। গৃহস্থ বনও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। কৃষক পরিবারে গৃহস্থ বন থাকতে পারে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কাঠ, প্রয়োজনীয় ফলটা আমরা পাই। গ্রামীণ পরিবারে এমন বন ছিল এখনও কোথাও কোথাও আছে। এছাড়া প্রচুর স্পর্শ না করা ঝোঁপ আছে যেমন বাজার, শশ্মান, গোরস্থান-এগুলোতে বন থাকে যেগুলোতে কোনো কাজ করা করা হয় না। বন বলতে যে সংজ্ঞা বন অধিদপ্তর দিয়েছে সেটা সরকারি বনের। বেসরকারি হিসাবের বনগুলোকে ধরলে সেটা ২০-২৫ শতাংশে ঠেকতে পারে। বন বা জঙ্গল যার আক্ষরিক মানে হচ্ছে মঙ্গল। এখন আমরা ব্যক্তিগত বৃক্ষরোপণের দিকে উৎসাহিত করছি। যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে। প্রকৃতি সব মিলে হয় প্রজাপতি, পাখি, মৌমাছি, গাছ, বন্যপ্রাণি, পশু, সবকিছু মিলেই প্রকৃতি। এগুলো সবকিছুকে বাদ দিয়ে যে যার ইচ্ছেমতো গাছ লাগাচ্ছে। আমরা চাইলে ঢাকা শহরের মধ্যেই ৫-১০ ফুটের মধ্যেই বন গড়ে তুলতে পারি। এমন বন তৈরি করতে পারি যেখান থেকে খাদ্য আসবে, কিন্তু এটা একটা বন। এই নতুন ধারণাগুলো আমাদের সরকারিভাবে প্রমোট করা জরুরি। বন থেকে খাবার আসবে, আবার বনের উপকারিতাও আসবে। বন রক্ষা একা সরকারের ব্যাপার না, এটা সম্মিলিতভাবে সবার উদ্যোগ হতে হবে।

 

 

 

অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বনভূমি বাড়ার সম্ভাবনা কম উল্লেখ করে সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের দেশ সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এর ২৫ মিলিয়ন মানুষ বিদেশ থেকে আয় করে। তাই এই দেশে বন্যভূমি সামলানো খুব কঠিন। সামাজিক বনায়নের নামে দেশে যেটা হয়েছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। টাকা যেটা আসে পরিবেশের নামে সেটা সব আসে সরকারের কাছে। এই টাকার পরিমাণ প্রচুর। সবাই চায় সরকারের কাছে টাকা আসুক। বন করতে পাবলিক খুব একটা আগ্রহী না। আমি গত দেড় বছর ধরে গ্রাম ধরে গবেষণা করছি, তারা যেহেতু দেশের বাইরে থেকে আয় করে তাই কেউ গ্রাম নিয়ে আগ্রহী না। বনায়ন করাতে চাইলে তার রুজির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কোনো বনায়ন কার্যক্রম সফল হবে না যদি না এটা রুজির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

 

 

তিনি বলেন, সবাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাই চায় রাষ্ট্র কি করল? রাষ্ট্রের তো আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নাই। যে কাঠামোর মাধ্যমে আমাদের দেশে বনায়ন হয় আমার মনে হয় না এতে করে দেশে বনায়নের মাত্রা বাড়বে। বাংলাদেশ একটি বিকেন্দ্রিত দেশ। এটা আমরা মানতে চাই না। এই যে গরমে ঢাকায় গাছ লাগানোর কথা উঠল। মানুষ কেন গাছ ঢাকায় লাগাবে? এখানে জমির এত দাম যে, মানুষ গাছ না লাগিয়ে জমিটা বিক্রি করে দিবে। এটাই এখন আমাদের বাস্তবতা।

জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

দেশের অধিকাংশ জেলায় নেই কোনো বনাঞ্চল

আপডেট সময় : ০৭:০৮:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ মে ২০২৪

➤ বন আছে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম
➤বিশ্বে প্রথম সফল উপকূলীয় বনায়ন উৎপাদনকারী বাংলাদেশ
➤গাছ লাগানোর কর্মসূচি থাকলেও নেই বন সৃজন কর্মসূচি

 

বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেশের বনভূমির একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ রয়েছে। সেই ম্যাপটিতে দেখা গেছে- দেশের অল্প স্থানে বনভূমি আছে, পরিমাণে যা দেশের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। যা সমতল এলাকায় ১৪ দশমিক এক শতাংশ। এই অবস্থায় দেশের বন অধিদপ্তরের সামাজিক বনায়নের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। তবে, উপকূলে বন সৃজন কার্যক্রম থাকলেও সমতলে নেই এ ধরনের কোনো তৎপরতা। অদূর ভবিষ্যতে নতুন বন তৈরির সম্ভাবনাও কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বন অধিদপ্তরের ২০১৯-২০২০ সালের জেলাভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৯০৭ দশমিক ৫২ একর। আর মোট বনভূমির পরিমাণ ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০৯ দশমিক ৩৩ একর। আমরাই সর্বপ্রথম সফল উপকূলীয় বনায়নকারী দেশ। উপকূলীয় চরাঞ্চলে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫২১ বর্গ কি.মি. চর বনায়ন করা হয়েছে। দেশে পাহাড়ি বনের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি বনভূমির পরিমাণ ৬ হাজার ৭০ হাজার হেক্টর যা বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এটির অবস্থান চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের পাহাড়ি এলাকা।

 

 

শাল বনের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর যা দেশের আয়তনের শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এ বন মূলত গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় অবস্থিত। তাছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় অল্প কিছু শালবন রয়েছে।

 

 

সুন্দরবন বিশে^র সবচেয়ে বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এ বন অবস্থিত। এর পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর যা দেশের আয়তনের ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ। সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে।

 

 

দেশে ২০১৯ সালে পরিচালিত বন জরিপ ও পরিবীক্ষণে দেখা যায়, সারা দেশের বন ও বনের বাইরে বৃক্ষ সম্পদের ন্যাশনাল গ্রোয়িং স্টকের পরিমাণ ৩৮৪ মিলিয়ন ঘন মিটার। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ বন এলাকার বাইরে অবস্থিত বৃক্ষ সম্পদ থেকে আসে। এতে প্রধান বায়োমাস উৎপাদনকারী তিনটি বৃক্ষ আম, সুন্দরি ও মেহগনি। মাটির ওপরের বৃক্ষ সম্পদ, মাটির নিচের বৃক্ষ সম্পদ এবং মাটির মধ্যে (৩০ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত) সঞ্চিত কার্বনের পরিমাণ ১২৭৬ মিলিয়ন টন। বৃক্ষ ও বনজসম্পদ সামগ্রী সংগ্রহকারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী এবং ৫৪ শতাংশ পরিবার বৃক্ষ ও বন থেকে ওষুধি উপকার পেয়েছে।

 

 

বর্তমানে দেশে বন অধিদপ্তর গাছ লাগানোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর আওতায় সারা দেশে বর্ষা মৌসুমে গাছের চারা রোপণের টার্গেট রেখেছে ৮ কোটি ৩৩ লাখ। তাদের সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম থাকলেও নেই বন সৃজন কার্যক্রম।

 

 

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এণ্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, বন ধ্বংস করা যায়, সৃষ্টি করা যায় না। সামাজিক বনায়নের নামে কিছু গাছ লাগানো যায় এতে বন হয় না। মধুপুরের বন, সুন্দরবন কিংবা বান্দরবানের পাহাড়ের বন এগুলো প্রাকৃতিক বন। এগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং বনবিভাগ যে হিসাব বলছে ১২ শতাংশ আসলে তার চেয়েও কম আছে। আমরা তো জরিপ করিনি তাই হিসাব করে বলতে পারব না। বন মানেই হচ্ছে প্রাকৃতিক বন। এটা প্রকৃতিরই সৃষ্টি। বনের যেন ক্ষতি না হয় সেটা দেখাটাই মানুষের কাজ। কিন্তু বন বিভাগ তৈরি করা হয়েছিল এগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। কিন্তু বন বিভাগ এখন বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। যারা বন ধ্বংস করে তাদের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ জড়িত। এরা মূলত বনখেকো হিসেবে পরিচিত। এরা মিলেমিশে বন ধ্বংস করে। এখন যেটুকু বন আছে সেটুকু রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের সদিচ্ছা দরকার। এতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ দরকার। তাদেরকে দেখভালের দায়িত্বটা দেওয়া দরকার, বনবিভাগকে না। বন বিভাগকে যত ক্ষমতায়িত করবে, তত বন ধ্বংস হবে। এটা গত ৫-৬ দশকে আমাদের অভিজ্ঞতা।

 

 

 

 

প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সমন্বয়ক ও কৃষক দেলোয়ার জাহান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যেটা আমরা বন অধিদপ্তরের ম্যাপে বন দেখছি এগুলো সরকারের অধিগ্রহণে আছে। গৃহস্থ বনও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। কৃষক পরিবারে গৃহস্থ বন থাকতে পারে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কাঠ, প্রয়োজনীয় ফলটা আমরা পাই। গ্রামীণ পরিবারে এমন বন ছিল এখনও কোথাও কোথাও আছে। এছাড়া প্রচুর স্পর্শ না করা ঝোঁপ আছে যেমন বাজার, শশ্মান, গোরস্থান-এগুলোতে বন থাকে যেগুলোতে কোনো কাজ করা করা হয় না। বন বলতে যে সংজ্ঞা বন অধিদপ্তর দিয়েছে সেটা সরকারি বনের। বেসরকারি হিসাবের বনগুলোকে ধরলে সেটা ২০-২৫ শতাংশে ঠেকতে পারে। বন বা জঙ্গল যার আক্ষরিক মানে হচ্ছে মঙ্গল। এখন আমরা ব্যক্তিগত বৃক্ষরোপণের দিকে উৎসাহিত করছি। যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে। প্রকৃতি সব মিলে হয় প্রজাপতি, পাখি, মৌমাছি, গাছ, বন্যপ্রাণি, পশু, সবকিছু মিলেই প্রকৃতি। এগুলো সবকিছুকে বাদ দিয়ে যে যার ইচ্ছেমতো গাছ লাগাচ্ছে। আমরা চাইলে ঢাকা শহরের মধ্যেই ৫-১০ ফুটের মধ্যেই বন গড়ে তুলতে পারি। এমন বন তৈরি করতে পারি যেখান থেকে খাদ্য আসবে, কিন্তু এটা একটা বন। এই নতুন ধারণাগুলো আমাদের সরকারিভাবে প্রমোট করা জরুরি। বন থেকে খাবার আসবে, আবার বনের উপকারিতাও আসবে। বন রক্ষা একা সরকারের ব্যাপার না, এটা সম্মিলিতভাবে সবার উদ্যোগ হতে হবে।

 

 

 

অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বনভূমি বাড়ার সম্ভাবনা কম উল্লেখ করে সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের দেশ সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এর ২৫ মিলিয়ন মানুষ বিদেশ থেকে আয় করে। তাই এই দেশে বন্যভূমি সামলানো খুব কঠিন। সামাজিক বনায়নের নামে দেশে যেটা হয়েছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। টাকা যেটা আসে পরিবেশের নামে সেটা সব আসে সরকারের কাছে। এই টাকার পরিমাণ প্রচুর। সবাই চায় সরকারের কাছে টাকা আসুক। বন করতে পাবলিক খুব একটা আগ্রহী না। আমি গত দেড় বছর ধরে গ্রাম ধরে গবেষণা করছি, তারা যেহেতু দেশের বাইরে থেকে আয় করে তাই কেউ গ্রাম নিয়ে আগ্রহী না। বনায়ন করাতে চাইলে তার রুজির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কোনো বনায়ন কার্যক্রম সফল হবে না যদি না এটা রুজির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।

 

 

তিনি বলেন, সবাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাই চায় রাষ্ট্র কি করল? রাষ্ট্রের তো আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নাই। যে কাঠামোর মাধ্যমে আমাদের দেশে বনায়ন হয় আমার মনে হয় না এতে করে দেশে বনায়নের মাত্রা বাড়বে। বাংলাদেশ একটি বিকেন্দ্রিত দেশ। এটা আমরা মানতে চাই না। এই যে গরমে ঢাকায় গাছ লাগানোর কথা উঠল। মানুষ কেন গাছ ঢাকায় লাগাবে? এখানে জমির এত দাম যে, মানুষ গাছ না লাগিয়ে জমিটা বিক্রি করে দিবে। এটাই এখন আমাদের বাস্তবতা।