০৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস আজ

আজ মঙ্গলবার, ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ৪৮ বছর আগে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মারণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ওই দিন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকণ্ঠ দিল্লির মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী সেদিন ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও এর বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সেই সাহসী উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস্য হয়ে আছে আজো।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গঙ্গার উৎস থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত বহু বাঁধ আর কৃত্রিম খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে ভারত। শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়, কানপুরের গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদুয়ারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এ ছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চার শ’ পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বি ত হচ্ছে। উপমহাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী ভূপেন হাজারিকার একটি গান আজো ভারতীয় পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষকে আন্দোলিত করে, অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি গেয়েছেন :
জানা যায়, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারতবিরোধী নানা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। বেলা ২টায় হাজার হাজার মানুষের স্রোত জেলার গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত যাপনের জন্য সে দিনের মতো শেষ হয়। মাঠেই রাত যাপন করার পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এই লংমার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী যখন বত্তৃতা করছিলেন তখন এক নয়া জাগরণ সৃষ্টি করে। মাঠের আশপাশে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। প্রতিবাদী জনতার মধ্য থেকে হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে ‘লও লও লও সালাম-মওলানা ভাসানী; সিকিম নয়, ভুটান নয়-এ দেশ মোদের বাংলাদেশ।’ আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এরকম নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লংমার্চ সমাপ্ত হলেও সেদিন জনতার ভয়ে ভীত ভারতীয়রা সীমান্তে অনেক সৈন্য মোতায়েন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। ওই লংমার্চ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও স্থান পায়। এতে মওলানা ভাসানী এশিয়ার অন্যতম ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
প্রতিবেশী দেশ হয়েও ভারতের একতরফা ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অ ল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অ ল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা আজ পানির অভাবে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। উত্তর-পশ্চিমা লসহ দক্ষিণা লের অন্তত ৩০টি নদী আজো বিলুপ্তির পথে। অন্য দিকে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বরেন্দ্র অ লের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অ লে এখন পানির স্তর স্থান ভেদে ১৫০ থেকে ১৭০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। আর নগরীতে অন্তত ৭০ থেকে ৯০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোপূর্বে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হলেও কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। এ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহীর পদ্মা নদীর সেই অপরূপ যৌবন ও সৌন্দর্য আর নেই। এ ছাড়া জেলার বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীতে পদ্মার শাখা নদীতেও একই চিত্র বিদ্যমান। রাজশাহীর পদ্মা নদীর বুকে বিশাল বিশাল বালুচর পড়েছে। সেখানে ঘুড়ি উড়ানো হচ্ছে, গরুর গাড়ি চলছে। ফল ও ফসলের আবাদ হচ্ছে। হেঁটেই এখন নদী পার হওয়া যায়। পদ্মার মূল নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেক দূরে (সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার) সরে গেছে। বছরের পর বছর ধরে পদ্মার একই চিত্র অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে দেশের বৃহৎ এ অ লটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। মরুকরণ দেখা দেবে। অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চের প্রস্তুতির সময় বিশ্ব নেতাদের এ সম্পর্কে অবহিত করে বার্তা পাঠান। তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড, চীনের নেতা মাও সেতুং, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন প্রমুখের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে ভারতের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির ব্যাপারে সহযোগিতা কামনা করেন। এ ছাড়া মওলানা ভাসানী জনসভা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশে এরই মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা সরেজমিনে দেখতে আসার আহ্বান জানান।
স্থানীয়রা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে দেশের উত্তরা লসহ বৃহৎ একটি অংশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আগ্রাসী ভারতের এক গুঁয়েমি ও অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের কারণে বাংলাদেশ আজ চরম ক্ষতির শিকার। এর ফলে এই অ লের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ জিইয়ে রয়েছে। এক দশক আগে থেকে দাবি উঠেছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। জানা গেছে, ফারাক্কা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প কারখানাসহ সব কিছুতেই মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। এসব ক্ষতির বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখনো নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশ’ আয়োজিত সাধারণ সভায় একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়। ওই ঘোষণাপত্রের একটি অংশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সমীক্ষার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে এ ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে আরো বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নদী গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে চলেছে।
এ ব্যাপারে নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের পানিপ্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমা লের গঙ্গা-পদ্মা ছাড়াও অন্যান্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় অতি আসন্ন। ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এনামুল হক বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ভারত সরকার বাংলাদেশকে পানি দেবে বলে মনে হয় না। কারণ এতদিনেও তারা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানির প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দেয়নি। এ দিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে বর্তমানে পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে। এই অ লের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট আরো তীব্র হচ্ছে। এতে এই অ লের মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানিসহ সেচের পানি নিয়ে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়ছে।

ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস আজ

আপডেট সময় : ০২:৪৯:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪

আজ মঙ্গলবার, ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ৪৮ বছর আগে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মারণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ওই দিন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকণ্ঠ দিল্লির মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী সেদিন ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও এর বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সেই সাহসী উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস্য হয়ে আছে আজো।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গঙ্গার উৎস থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত বহু বাঁধ আর কৃত্রিম খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে ভারত। শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়, কানপুরের গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদুয়ারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এ ছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চার শ’ পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বি ত হচ্ছে। উপমহাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী ভূপেন হাজারিকার একটি গান আজো ভারতীয় পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষকে আন্দোলিত করে, অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি গেয়েছেন :
জানা যায়, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারতবিরোধী নানা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। বেলা ২টায় হাজার হাজার মানুষের স্রোত জেলার গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত যাপনের জন্য সে দিনের মতো শেষ হয়। মাঠেই রাত যাপন করার পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এই লংমার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী যখন বত্তৃতা করছিলেন তখন এক নয়া জাগরণ সৃষ্টি করে। মাঠের আশপাশে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। প্রতিবাদী জনতার মধ্য থেকে হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে ‘লও লও লও সালাম-মওলানা ভাসানী; সিকিম নয়, ভুটান নয়-এ দেশ মোদের বাংলাদেশ।’ আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এরকম নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লংমার্চ সমাপ্ত হলেও সেদিন জনতার ভয়ে ভীত ভারতীয়রা সীমান্তে অনেক সৈন্য মোতায়েন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। ওই লংমার্চ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও স্থান পায়। এতে মওলানা ভাসানী এশিয়ার অন্যতম ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
প্রতিবেশী দেশ হয়েও ভারতের একতরফা ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অ ল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অ ল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা আজ পানির অভাবে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। উত্তর-পশ্চিমা লসহ দক্ষিণা লের অন্তত ৩০টি নদী আজো বিলুপ্তির পথে। অন্য দিকে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বরেন্দ্র অ লের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অ লে এখন পানির স্তর স্থান ভেদে ১৫০ থেকে ১৭০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। আর নগরীতে অন্তত ৭০ থেকে ৯০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোপূর্বে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হলেও কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। এ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহীর পদ্মা নদীর সেই অপরূপ যৌবন ও সৌন্দর্য আর নেই। এ ছাড়া জেলার বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীতে পদ্মার শাখা নদীতেও একই চিত্র বিদ্যমান। রাজশাহীর পদ্মা নদীর বুকে বিশাল বিশাল বালুচর পড়েছে। সেখানে ঘুড়ি উড়ানো হচ্ছে, গরুর গাড়ি চলছে। ফল ও ফসলের আবাদ হচ্ছে। হেঁটেই এখন নদী পার হওয়া যায়। পদ্মার মূল নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেক দূরে (সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার) সরে গেছে। বছরের পর বছর ধরে পদ্মার একই চিত্র অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে দেশের বৃহৎ এ অ লটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। মরুকরণ দেখা দেবে। অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চের প্রস্তুতির সময় বিশ্ব নেতাদের এ সম্পর্কে অবহিত করে বার্তা পাঠান। তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড, চীনের নেতা মাও সেতুং, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন প্রমুখের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে ভারতের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির ব্যাপারে সহযোগিতা কামনা করেন। এ ছাড়া মওলানা ভাসানী জনসভা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশে এরই মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা সরেজমিনে দেখতে আসার আহ্বান জানান।
স্থানীয়রা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে দেশের উত্তরা লসহ বৃহৎ একটি অংশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আগ্রাসী ভারতের এক গুঁয়েমি ও অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের কারণে বাংলাদেশ আজ চরম ক্ষতির শিকার। এর ফলে এই অ লের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ জিইয়ে রয়েছে। এক দশক আগে থেকে দাবি উঠেছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। জানা গেছে, ফারাক্কা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প কারখানাসহ সব কিছুতেই মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। এসব ক্ষতির বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখনো নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশ’ আয়োজিত সাধারণ সভায় একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়। ওই ঘোষণাপত্রের একটি অংশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সমীক্ষার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে এ ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে আরো বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নদী গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে চলেছে।
এ ব্যাপারে নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের পানিপ্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমা লের গঙ্গা-পদ্মা ছাড়াও অন্যান্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় অতি আসন্ন। ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এনামুল হক বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ভারত সরকার বাংলাদেশকে পানি দেবে বলে মনে হয় না। কারণ এতদিনেও তারা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানির প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দেয়নি। এ দিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে বর্তমানে পানি সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে। এই অ লের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট আরো তীব্র হচ্ছে। এতে এই অ লের মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পানিসহ সেচের পানি নিয়ে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়ছে।