◉গাজাবাসীর জন্য ৫ হাজার ফ্রি ভিসার ঘোষণা কানাডার
◉আইসিসির প্রসিকিউটরকে হুমকি দিয়েছিলেন মোসাদ প্রধান
◉ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক
ফিলিস্তিনের গাজার রাফায় একটি শরণার্থীশিবিরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাল আস-সুলতান এলাকায় তাঁবু দিয়ে গড়ে তোলা ওই শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৩ জন নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ রয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৪৯ জন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য সেখানকার হাসপাতালগুলোর নেই। আহত হয়েছেন প্রায় ২৫০ জন। এদিকে সাত মাস ধরে চলা গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাতে গাজার সর্ব দক্ষিণের রাফায় ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষিত ওই আশ্রয়শিবিরে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। হামলার পর শরণার্থীশিবিরের তাঁবুগুলোয় আগুন ধরে যায়। এতে জীবন্ত পুড়ে মারা যান অনেকে। শিশুদের মরদেহগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে যায়। এদিকে গাজায় সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের হামলায় আরও ৬৬ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ৩৬ হাজার ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮১ হাজার ২৬ জন।
শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় বইছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র তোপের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। এ ঘটনাকে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে অনেক আরব দেশ। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাধ্যতামূলক আদেশ মেনে অবিলম্বে রাফায় অভিযান বন্ধে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বৈশ্বিক সম্প্রদায়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, গাজায় কোনো নিরাপদ স্থান নেই। এই ভয়াবহতা অবশ্যই থামাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য সম্ভাব্য সব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইসরায়েলি হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের এক মুখপাত্র। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ওয়াফাকে তিনি বলেছেন, এই হামলা ইসরায়েলের সীমা অতিক্রমকারী হত্যাযজ্ঞ।
ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গাজায় যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা দেশ মিসর ও কাতার। পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক সরকারগুলোও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হামলার নিশানা করার নিন্দা জানিয়েছে মিসর। দেশটি বলেছে, এটি ইসরায়েলের একটি পদ্ধতিগত নীতির অংশ, যার লক্ষ্য গাজায় মৃত্যু ও ধ্বংসের পরিধি প্রসারিত করা, যাতে উপত্যকাটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
কাতার একে আন্তর্জাতিক আইনের বিপজ্জনক লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে। দেশটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলা চলমান মধ্যস্থতা-প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে। ‘চলমান যুদ্ধাপরাধের’ জন্য ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে জর্ডান। সৌদি আরবও গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান ‘বর্বর ও খুনিদের’ জবাবদিহির আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছেন। বলেছেন, এ জন্য সামর্থ্যের মধ্যে সবকিছু করবেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ার মুসা ফাকি মাহামত বলেছেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। দুই দিন আগে রাফায় সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের আদেশ দিয়ে আইসিজে যে রায় দিয়েছেন, তার অবমাননা করেছে ইসরায়েল। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেন, ‘এ অভিযান বন্ধ করতে হবে। রাফায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নেই।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, রাফায় অভিযান বন্ধে ইসরায়েলকে অবশ্যই আইসিজের আদেশ মেনে চলতে হবে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বায়েরবক বলেছেন, আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইসরায়েলকে অবশ্যই তা মেনে চলতে হবে।
গাজাবাসীর জন্য ৫ হাজার ফ্রি ভিসার ঘোষণা কানাডার :
ফিলিস্তিনিদের জন্য ভিসানীতিতে বিশাল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা। এই ঘোষণা দিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক মিলার বলেছেন, যে সব ফিলিস্তিনি কানাডায় বসবাস করছেন তাদের আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ভিসার পরিমাণ পাঁচগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। অর্থাৎ একটি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় অটোয়া গাজাবাসীর জন্য ভিসার সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার পর্যন্ত করছে। আমরা গাজার অমানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সেখানে বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ একটি নীতিমালার আওতায় গাজাবাসীর জন্য এই সুবিধা দেওয়ার কথা চিন্তা করছে কানাডা সরকার। গাজাবাসীদের ভিসা দিতে ফিলিস্তিন সরকারের সঙ্গে কাজ করছে কানাডার সরকার।
আইসিসির প্রসিকিউটরকে হুমকি দিয়েছিলেন মোসাদ প্রধান :
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতৌ বেনসুদাকে হুমকি দিয়েছিলেন ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান ইয়োসি কোহেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডে একটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত না করতে এই চাপ দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বেশ কয়েক বছর ধরে একাধিক গোপন বৈঠকে কোহেন এই হুমকি দিয়েছিলেন। এসব হুমকির কারণে ২০২১ সালে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বেনসুদা। এই তদন্ত গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ আইসিসির প্রসিকিউটর করিম খান ইসরায়েলি নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং তিন হামাস নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন। সাবেক মোসাদ প্রধানের এই হুমকির কর্মকাণ্ডে ইসরায়েল সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ইসরায়েলি সেনাদের বিচারের মুখোমুখি করতে আইসিসিকে একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তেল আবিব। ফলে এই হুমকি তাদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অপর এক ইসরায়েলি সূত্র দাবি করেছে, এই হুমকির উদ্দেশ্য ছিল বেনসুদাকে তদন্ত না করতে রাজি করানো অথবা তার সহযোগিতা লাভ করা।
ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনা :
গাজায় হামলা চালানোয় প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। গত সোমবার আইরিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন না মানায় ইসরায়েলের ওপর এমন পদক্ষেপের কথা ভাবছেন ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমুন্নত রাখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে স্পষ্ট ঐকমত্য ছিল। রাফাহতে হামলা বন্ধ করতে আইসিজের রায় মেনে না নিলে ইসরায়েলের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর আলোচনা হয়েছে। কিছু মতপার্থক্য থাকলেও বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। এমনকি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনে মদদদাতা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি উত্থাপন করেন কয়েকজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
























