০১:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খাদের কিনারে ডাক সঞ্চয় ব্যাংক

  • আমানতের টাকা নিয়ে শঙ্কা-ভোগান্তি
  • সঞ্চয় মেয়াদ শেষ হলেও আটকে আছে হিসাবের টাকা
  • নতুন হিসাব খোলার হার কম, টাকা তুলতে বিড়ম্বনা
  • সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত কর্মচারীদের ব্যাপারে
  • কার্যক্রম পরিচালনায় নেই প্রয়োজনীয় লোকবল
  • অটোমেশন করলেও সার্ভার জটিলতায় ভোগান্তি

হিসাব খোলার কার্যক্রম পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত পোস্ট অফিস। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে এসব আর্থিক কাজ পরিচালনায় নানা অসঙ্গতি ও গোঁজামিলের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এতে দারুণভাবে হয়রানির স্বীকার হন গ্রাহকরা। টাকা উত্তোলনে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সঞ্চয়পত্রের টাকা উত্তোলনে চলে ঘুষ বাণিজ্য। আবার কখনো সার্ভার জটিলতার কারণে নিজেদের গচ্ছিত টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা। এর আগে সরকারি নির্দেশনায় নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহকসেবা প্রদানের লক্ষ্যে সব সেবা খাতকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এদিকে তীব্র জনবল সংকটের কারণে তাতে হোঁচট খেয়েছে পোস্ট অফিস পূর্বাঞ্চল। স্থবির হয়ে পড়েছে বিভিন্ন কার্যক্রম। নিজস্ব আয় না থাকায় মেয়াদ পূর্ণ হওয়া হিসাবের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে বেগ পেতে হচ্ছে। ওই অঞ্চলের প্রান্তিক পোস্ট অফিসগুলোতে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর আগে মেয়াদ শেষ হওয়া হিসাবের টাকা আটকে আছে। বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকার সাব-পোস্ট অফিসে দেড় বছর আগে সঞ্চয়পত্রের জন্য ৬ লাখ টাকা রাখেন মাফিয়া বেগম। তবে মাসের পর মাস ঘুরেও এ- সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বরিশাল প্রধান ডাকঘরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কিছুদিন আগে টাকা ফেরত পেয়েছেন। তবে ডাক বিভাগে আর সঞ্চয় করা হয়নি তার। দেড় বছর ধরে আমার টাকা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন ওই অফিসের আলাউদ্দিন সিকদার।
শুধু মাফিয়া বেগম নন, ডাক বিভাগের সেবা নিতে গিয়ে এমন হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সারা দেশের অসংখ্য মানুষ। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে ডাক বিভাগের সুনাম। এছাড়া এর আগে সঞ্চয়ের ৮ কোটি টাকা
আত্মসাতের পর দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে ডাক কতৃপক্ষ। রাজশাহীর চারঘাট পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকেরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সার্ভার জটিলতার কারণে নিজেদের গচ্ছিত অ্যাকাউন্টে রাখা টাকা তুলতে পারছেন না শত শত গ্রাহক। পোস্ট অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচটি অঞ্চলে
ভাগ করে সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫টি জেলা নিয়ে পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চল গঠিত। এখানকার অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ৪ হাজার ১৪৬। কিন্তু বর্তমানে কর্মরতের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। ফলে কেন্দ্রের নেওয়া বিভিন্ন নতুন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছে না এ অঞ্চলের বেশির ভাগ পোস্ট অফিস। সরকারি নির্দেশনায় পোস্ট অফিসগুলোকে অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা হলেও লোকবল সংকটের কারণে বেশির ভাগই ম্যানুয়ালি কাজ করছে। ফলে সঞ্চয়পত্র, ডাক জীবন বীমা কিংবা বিভিন্ন মেয়াদি হিসাব খোলা সম্ভব হচ্ছে না প্রান্তিক অঞ্চলের পোস্ট অফিসগুলোয়। অন্যদিকে প্রতিদিন মেয়াদ পূর্ণ হওয়া হিসাবগুলোর বিপরীতে গ্রাহককে অর্থ পরিশোধের নিয়ম থাকলেও আয় না থাকায় সেটি মেটানোও সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অন্তত ছয় মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া হিসাবের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না
উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের পোস্ট অফিসগুলো। এদিকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ গ্রাহকের অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবুল কালাম নামের এক উপজেলার পোস্টমাস্টার বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন হিসাব ক্লোজ করতে হচ্ছে। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই গ্রাহকদের কয়েক মাস পর তারিখ দিয়ে বলা হচ্ছে, ওইদিন এসে যেন তিনি পাওনা টাকা নিয়ে যান। যদিও আগে প্রতিদিনের নতুন হিসাব ও সঞ্চয়পত্র খোলার অর্থ দিয়েই মেয়াদপূর্ণ হিসাবের দায় মেটানো হতো। এখন প্রতিটি শাখায় নতুন হিসাব খোলা বাবদ আসে কেবল ৫-৭ হাজার টাকার মতো। ফলে কেন্দ্রীয় পোস্ট অফিসের বরাদ্দের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পোস্টমাস্টার জেনারেল
(পূর্বাঞ্চল) বলেন, সারা দেশের পোস্ট অফিসগুলোকে আধুনিকায়নের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে। পোস্ট অফিসগুলোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে সঞ্চয় অধিদপ্তরের ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করে। কিন্তু লোকবলের অভাবে সবগুলো পোস্ট অফিসে সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম সমানভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

টিউশনের নামে প্রতারণার ফাঁদ

খাদের কিনারে ডাক সঞ্চয় ব্যাংক

আপডেট সময় : ০৮:১১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪
  • আমানতের টাকা নিয়ে শঙ্কা-ভোগান্তি
  • সঞ্চয় মেয়াদ শেষ হলেও আটকে আছে হিসাবের টাকা
  • নতুন হিসাব খোলার হার কম, টাকা তুলতে বিড়ম্বনা
  • সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত কর্মচারীদের ব্যাপারে
  • কার্যক্রম পরিচালনায় নেই প্রয়োজনীয় লোকবল
  • অটোমেশন করলেও সার্ভার জটিলতায় ভোগান্তি

হিসাব খোলার কার্যক্রম পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত পোস্ট অফিস। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে এসব আর্থিক কাজ পরিচালনায় নানা অসঙ্গতি ও গোঁজামিলের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এতে দারুণভাবে হয়রানির স্বীকার হন গ্রাহকরা। টাকা উত্তোলনে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সঞ্চয়পত্রের টাকা উত্তোলনে চলে ঘুষ বাণিজ্য। আবার কখনো সার্ভার জটিলতার কারণে নিজেদের গচ্ছিত টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা। এর আগে সরকারি নির্দেশনায় নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহকসেবা প্রদানের লক্ষ্যে সব সেবা খাতকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এদিকে তীব্র জনবল সংকটের কারণে তাতে হোঁচট খেয়েছে পোস্ট অফিস পূর্বাঞ্চল। স্থবির হয়ে পড়েছে বিভিন্ন কার্যক্রম। নিজস্ব আয় না থাকায় মেয়াদ পূর্ণ হওয়া হিসাবের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে বেগ পেতে হচ্ছে। ওই অঞ্চলের প্রান্তিক পোস্ট অফিসগুলোতে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর আগে মেয়াদ শেষ হওয়া হিসাবের টাকা আটকে আছে। বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকার সাব-পোস্ট অফিসে দেড় বছর আগে সঞ্চয়পত্রের জন্য ৬ লাখ টাকা রাখেন মাফিয়া বেগম। তবে মাসের পর মাস ঘুরেও এ- সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বরিশাল প্রধান ডাকঘরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কিছুদিন আগে টাকা ফেরত পেয়েছেন। তবে ডাক বিভাগে আর সঞ্চয় করা হয়নি তার। দেড় বছর ধরে আমার টাকা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন ওই অফিসের আলাউদ্দিন সিকদার।
শুধু মাফিয়া বেগম নন, ডাক বিভাগের সেবা নিতে গিয়ে এমন হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সারা দেশের অসংখ্য মানুষ। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে ডাক বিভাগের সুনাম। এছাড়া এর আগে সঞ্চয়ের ৮ কোটি টাকা
আত্মসাতের পর দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে ডাক কতৃপক্ষ। রাজশাহীর চারঘাট পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকেরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সার্ভার জটিলতার কারণে নিজেদের গচ্ছিত অ্যাকাউন্টে রাখা টাকা তুলতে পারছেন না শত শত গ্রাহক। পোস্ট অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচটি অঞ্চলে
ভাগ করে সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫টি জেলা নিয়ে পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চল গঠিত। এখানকার অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ৪ হাজার ১৪৬। কিন্তু বর্তমানে কর্মরতের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। ফলে কেন্দ্রের নেওয়া বিভিন্ন নতুন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছে না এ অঞ্চলের বেশির ভাগ পোস্ট অফিস। সরকারি নির্দেশনায় পোস্ট অফিসগুলোকে অটোমেশন পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা হলেও লোকবল সংকটের কারণে বেশির ভাগই ম্যানুয়ালি কাজ করছে। ফলে সঞ্চয়পত্র, ডাক জীবন বীমা কিংবা বিভিন্ন মেয়াদি হিসাব খোলা সম্ভব হচ্ছে না প্রান্তিক অঞ্চলের পোস্ট অফিসগুলোয়। অন্যদিকে প্রতিদিন মেয়াদ পূর্ণ হওয়া হিসাবগুলোর বিপরীতে গ্রাহককে অর্থ পরিশোধের নিয়ম থাকলেও আয় না থাকায় সেটি মেটানোও সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অন্তত ছয় মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া হিসাবের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না
উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের পোস্ট অফিসগুলো। এদিকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ গ্রাহকের অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবুল কালাম নামের এক উপজেলার পোস্টমাস্টার বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন হিসাব ক্লোজ করতে হচ্ছে। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই গ্রাহকদের কয়েক মাস পর তারিখ দিয়ে বলা হচ্ছে, ওইদিন এসে যেন তিনি পাওনা টাকা নিয়ে যান। যদিও আগে প্রতিদিনের নতুন হিসাব ও সঞ্চয়পত্র খোলার অর্থ দিয়েই মেয়াদপূর্ণ হিসাবের দায় মেটানো হতো। এখন প্রতিটি শাখায় নতুন হিসাব খোলা বাবদ আসে কেবল ৫-৭ হাজার টাকার মতো। ফলে কেন্দ্রীয় পোস্ট অফিসের বরাদ্দের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পোস্টমাস্টার জেনারেল
(পূর্বাঞ্চল) বলেন, সারা দেশের পোস্ট অফিসগুলোকে আধুনিকায়নের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে। পোস্ট অফিসগুলোর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিপরীতে সঞ্চয় অধিদপ্তরের ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করে। কিন্তু লোকবলের অভাবে সবগুলো পোস্ট অফিসে সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম সমানভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।