০৫:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খুলল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : সহজ হলো পথচলা

  • সবুজ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৮:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩
  • 56

আসসাইফ আশরাফ
অপেক্ষার অবসান। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশের দুয়ার খোলার মধ্য দিয়ে যানজটের নগরী এখন স্বপ্ন, সংযোগ, অগ্রযাত্রায় ঢাকা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই যাতায়াত করা যাবে। আশা করা হচ্ছে, নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করবে, স্বপ্ন পূরণ হবে দুর্ভোগহীন রাজপথের। আজ শনিবার বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটে কাওলা প্রান্তরে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাওলা প্রান্তের টোল প্লাজায় গাড়িপ্রতি ৮০ টাকা করে টোল দিয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফলক উন্মোচন মঞ্চে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রাখা বোতাম চেপে উড়াল সড়কটির উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
উদ্বোধন শেষে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নানা দিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্রিফ করা হয়। এরপর গাড়িবহর নিয়ে প্রথম যাত্রী হিসেবে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সুধী সমাবেশস্থলের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের পর কাওলা প্রান্ত থেকে টোল দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেন তিনি। বিকাল ৩টা ৪৪ মিনিটে দক্ষিণ কাওলা প্রান্ত থেকে ফার্মগেটের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর রওয়ানা হয়। বিকাল ৩টা ৫৮ মিনিটে ফার্মগেট প্রান্তে এসে পৌঁছায়। ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পার হতে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের লেগেছে মাত্র ১৪ মিনিট।
এরপর পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেসময় প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, আজ আমি আপনাদের আরেকটি নতুন উপহার দিচ্ছি। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা শহরে যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এ উড়াল সড়ক। সময় বাঁচবে। মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা পূরণ হবে।
এসময় বিএনপির আন্দোলনের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বাংলাদেশের এত উন্নয়ন কেন হয়েছে? দেশে একটা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা রয়েছে বলেই সেটা হয়েছে। অনেকে এখন গণতন্ত্র উদ্ধার করবে বলেন। তারা কী গণতন্ত্র দিয়েছে, আমরা জানি। এখন আবার অনেকে আন্দোলনের কথা বলে। অনেকেই ভিসানীতি, নিষেধাজ্ঞার কথা বলে। স্পষ্ট করে বলছি- এই মাটি আমাদের। এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি। এসব ভয় আমাদের দেখিয়ে লাভ নেই। তিনি বলেন, আজ যারা আন্দোলনের নামে রোজই আমাদের ক্ষমতা থেকে ফেলে দিচ্ছে, আমি তাদের বলব- মেঘ দেখে করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। ভয়কে জয় করে বাংলাদেশের জনগণ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে। নৌকা সারাজীবন উজান ঠেলেই এগিয়েছে। উজান ঠেলেই এগিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, নৌকা মার্কা ডিজিটাল বাংলাদেশ দিয়েছে। এই নৌকাই স্মার্ট বাংলাদেশ দেবে। আত্মবিশ্বাস রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করলে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। এটা আমরা দেখেছি। তবে তার জন্য স্থিতিশীলতা দরকার।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৭ সময়কালে দেশ ছিল অন্ধকারে। এখন আর সেটা নেই। বাংলাদেশ আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। আমরা যে ওয়াদা দিয়েছি, সেটা একের পর এক পূরণ করে যাচ্ছি। কবি সুকান্তের ভাষায়- ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আজ একটা সাময়িক সমস্যা চলছে। আমাদের ওপর অর্থনৈতিক ধাক্কা এসেছে। এজন্য আমি বলেছি, দেশে কোনো অনাবাদি জমি থাকবে না। নিজের ফসল নিজে ফলাবো। নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করে খাবো। কারও কাছে হাত পাতব না। জাতির পিতা বলতেন, ভিক্ষুকের জাতির উন্নতি হয় না।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, বাংলাদেশকে দাবায়ে রাখা যায় না। মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক উদ্বোধন করলাম। এগুলো সবই জনগণের স্বার্থে। সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি করেছি। আমরা চাই, আমাদের দেশ আরো এগিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার এই স্বাধীন দেশের একটি মানুষও গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। তাদের ঘরবাড়ি করে দিচ্ছি। বেকারদের কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি। সরকারি চাকুরেদের মতো সবার জন্য সর্বজনীন পেনশন চালু করেছি। শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতও যেন আলোকিত হয়, আমরা সে উদ্যোগই নিচ্ছি।

সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেতু সচিব মো. মনজুর হোসেন স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এরপর ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি’ প্রকল্পের বিষয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে প্রকল্পটির বিনিয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি লি গুয়াংজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষুদে সংস্করণ উপহার দেন। এদিকে সুধী সমাবেশে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রতীম ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়েছেন। তীব্র গরম ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা সমাবেশস্থলে স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখেন।

রোববার সকাল ৬টা থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে চলবে গাড়ি : ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে তেজগাঁও (ফার্মগেট) পর্যন্ত ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটারের এ পথে আজ রোববার সকাল ৬টা থেকে সর্বসাধারণের গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। র‌্যাম্পসহ এ পথের মোট দৈর্ঘ্য সাড়ে ২২ কিলোমিটার। তবে আজ সাধারণ যানবাহন চলাচল করবে না।
সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেন বলেন, গতকাল শনিবার উদ্বোধন হলেও যানবাহন চলাচল করবে রোববার সকাল ৬টা থেকে। বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত মোট র‌্যাম্প ১৫টি। এর মধ্যে ১৩টি র‌্যাম্প খুলে দেয়া হয়েছে। বনানী ও মহাখালীর দুটি র‌্যাম্প এখনই খুলছে না।
অন্যদিকে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে গতি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে স্পিড লিমিট নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা থাকলেও শুরুতে আংশিক পথে সর্বোচ্চ গতি হবে ৬০ কিলোমিটার। র‌্যাম্পগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে সমন্বয় করা হচ্ছে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে। আর এ পথে কোনো থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও পথচারী চলাচল করতে পারবে না।
এক্সপ্রেসওয়েতে যেখান থেকে উঠবেন-নামবেন: সেতু বিভাগ জানিয়েছে, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই এক্সপ্রেসওয়ে খোলা থাকবে। উত্তরা থেকে ফার্মগেটগামী গাড়ি তিনটি স্থান থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকতে পারবে। সেগুলো হচ্ছে- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত কাওলা, প্রগতি সরণি (কুড়িল) এবং আর্মি গলফ ক্লাব।

এসব স্থান থেকে ওঠা গাড়ি বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের পাশে নামতে পারবে। অপরদিকে উত্তরাগামী গাড়ি বিজয় সরণি ওভারপাসের উত্তর ও দক্ষিণ লেন এবং বনানী রেলস্টেশনের সামনে থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে পারবে। এসব গাড়ি মহাখালী বাস টার্মিনাল, বনানী, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে নামতে পারবে।
এজন্য এয়ারপোর্টে দুটি, কুড়িলে তিনটি, বনানীতে চারটি, মহাখালীতে তিনটি, বিজয় সরণিতে দুটি ও ফার্মগেটে একটি র‌্যাম্পও রয়েছে। এই ১৫টি র‌্যাম্পের মধ্যে মহাখালী ও বনানী অংশে দুটি র‌্যাম্প আপাতত বন্ধ থাকবে। বাকি ১৩টি র‌্যাম্প দিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে পারবে। তবে যেসব স্থানে গাড়ি নামবে, সেসব পয়েন্টে যানজটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেসব বাহনের চলতে মানা : এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের ক্ষেত্রে মোটরচালিত প্রায় সবধরনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি মিললেও মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা যাবে না। এক্সপ্রেসওয়ে যেই দূরত্বেই চলুক না কেন, প্রত্যেক গাড়িকে সমান টোল পরিশোধ করতে হবে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও হালকা ট্রাককে ৮০, বাস ও মিনিবাস ১৬০, মাঝারি ট্রাক ৩২০ এবং ভারী ট্রাক বা ট্রেইলরে ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে। অর্থাৎ বিজয় সরণি থেকে উঠে মহাখালী নামলেও এই হারে টোল দিতে হবে। আবার বিমানবন্দর গেলেও টোলের হার একই থাকবে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্পের প্রথম চুক্তি সই করা হয় ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি। ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি প্রকল্পের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১৫ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে সংশোধিত চুক্তি সই করে। থাইল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডের ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রকল্পটিতে। তা ছাড়া চায়নাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শোনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক গ্র্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ৩৪ শতাংশ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড ১৫ শতাংশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এ প্রকল্পটি। প্রকল্পের মূল দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার। আর র‌্যাম্পসহ মোট দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮৯৪০ কোটি টাকা ধরা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকায়।

চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সংঘর্ষে ২ জন নিহত

খুলল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : সহজ হলো পথচলা

আপডেট সময় : ০৯:৫৮:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩

আসসাইফ আশরাফ
অপেক্ষার অবসান। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশের দুয়ার খোলার মধ্য দিয়ে যানজটের নগরী এখন স্বপ্ন, সংযোগ, অগ্রযাত্রায় ঢাকা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই যাতায়াত করা যাবে। আশা করা হচ্ছে, নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব করবে, স্বপ্ন পূরণ হবে দুর্ভোগহীন রাজপথের। আজ শনিবার বিকাল ৩টা ৪২ মিনিটে কাওলা প্রান্তরে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাওলা প্রান্তের টোল প্লাজায় গাড়িপ্রতি ৮০ টাকা করে টোল দিয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফলক উন্মোচন মঞ্চে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রাখা বোতাম চেপে উড়াল সড়কটির উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
উদ্বোধন শেষে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নানা দিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্রিফ করা হয়। এরপর গাড়িবহর নিয়ে প্রথম যাত্রী হিসেবে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সুধী সমাবেশস্থলের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের পর কাওলা প্রান্ত থেকে টোল দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেন তিনি। বিকাল ৩টা ৪৪ মিনিটে দক্ষিণ কাওলা প্রান্ত থেকে ফার্মগেটের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর রওয়ানা হয়। বিকাল ৩টা ৫৮ মিনিটে ফার্মগেট প্রান্তে এসে পৌঁছায়। ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পার হতে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের লেগেছে মাত্র ১৪ মিনিট।
এরপর পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেসময় প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, আজ আমি আপনাদের আরেকটি নতুন উপহার দিচ্ছি। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা শহরে যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এ উড়াল সড়ক। সময় বাঁচবে। মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা পূরণ হবে।
এসময় বিএনপির আন্দোলনের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বাংলাদেশের এত উন্নয়ন কেন হয়েছে? দেশে একটা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা রয়েছে বলেই সেটা হয়েছে। অনেকে এখন গণতন্ত্র উদ্ধার করবে বলেন। তারা কী গণতন্ত্র দিয়েছে, আমরা জানি। এখন আবার অনেকে আন্দোলনের কথা বলে। অনেকেই ভিসানীতি, নিষেধাজ্ঞার কথা বলে। স্পষ্ট করে বলছি- এই মাটি আমাদের। এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি। এসব ভয় আমাদের দেখিয়ে লাভ নেই। তিনি বলেন, আজ যারা আন্দোলনের নামে রোজই আমাদের ক্ষমতা থেকে ফেলে দিচ্ছে, আমি তাদের বলব- মেঘ দেখে করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। ভয়কে জয় করে বাংলাদেশের জনগণ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে। নৌকা সারাজীবন উজান ঠেলেই এগিয়েছে। উজান ঠেলেই এগিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, নৌকা মার্কা ডিজিটাল বাংলাদেশ দিয়েছে। এই নৌকাই স্মার্ট বাংলাদেশ দেবে। আত্মবিশ্বাস রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করলে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। এটা আমরা দেখেছি। তবে তার জন্য স্থিতিশীলতা দরকার।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৭ সময়কালে দেশ ছিল অন্ধকারে। এখন আর সেটা নেই। বাংলাদেশ আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। আমরা যে ওয়াদা দিয়েছি, সেটা একের পর এক পূরণ করে যাচ্ছি। কবি সুকান্তের ভাষায়- ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আজ একটা সাময়িক সমস্যা চলছে। আমাদের ওপর অর্থনৈতিক ধাক্কা এসেছে। এজন্য আমি বলেছি, দেশে কোনো অনাবাদি জমি থাকবে না। নিজের ফসল নিজে ফলাবো। নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করে খাবো। কারও কাছে হাত পাতব না। জাতির পিতা বলতেন, ভিক্ষুকের জাতির উন্নতি হয় না।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, বাংলাদেশকে দাবায়ে রাখা যায় না। মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক উদ্বোধন করলাম। এগুলো সবই জনগণের স্বার্থে। সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি করেছি। আমরা চাই, আমাদের দেশ আরো এগিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার এই স্বাধীন দেশের একটি মানুষও গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। তাদের ঘরবাড়ি করে দিচ্ছি। বেকারদের কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি। সরকারি চাকুরেদের মতো সবার জন্য সর্বজনীন পেনশন চালু করেছি। শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতও যেন আলোকিত হয়, আমরা সে উদ্যোগই নিচ্ছি।

সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সেতু সচিব মো. মনজুর হোসেন স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এরপর ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি’ প্রকল্পের বিষয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে প্রকল্পটির বিনিয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি লি গুয়াংজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষুদে সংস্করণ উপহার দেন। এদিকে সুধী সমাবেশে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রতীম ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়েছেন। তীব্র গরম ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা সমাবেশস্থলে স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখেন।

রোববার সকাল ৬টা থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে চলবে গাড়ি : ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে তেজগাঁও (ফার্মগেট) পর্যন্ত ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটারের এ পথে আজ রোববার সকাল ৬টা থেকে সর্বসাধারণের গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। র‌্যাম্পসহ এ পথের মোট দৈর্ঘ্য সাড়ে ২২ কিলোমিটার। তবে আজ সাধারণ যানবাহন চলাচল করবে না।
সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেন বলেন, গতকাল শনিবার উদ্বোধন হলেও যানবাহন চলাচল করবে রোববার সকাল ৬টা থেকে। বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত মোট র‌্যাম্প ১৫টি। এর মধ্যে ১৩টি র‌্যাম্প খুলে দেয়া হয়েছে। বনানী ও মহাখালীর দুটি র‌্যাম্প এখনই খুলছে না।
অন্যদিকে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে গতি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে স্পিড লিমিট নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা থাকলেও শুরুতে আংশিক পথে সর্বোচ্চ গতি হবে ৬০ কিলোমিটার। র‌্যাম্পগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে সমন্বয় করা হচ্ছে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে। আর এ পথে কোনো থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল ও পথচারী চলাচল করতে পারবে না।
এক্সপ্রেসওয়েতে যেখান থেকে উঠবেন-নামবেন: সেতু বিভাগ জানিয়েছে, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই এক্সপ্রেসওয়ে খোলা থাকবে। উত্তরা থেকে ফার্মগেটগামী গাড়ি তিনটি স্থান থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকতে পারবে। সেগুলো হচ্ছে- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত কাওলা, প্রগতি সরণি (কুড়িল) এবং আর্মি গলফ ক্লাব।

এসব স্থান থেকে ওঠা গাড়ি বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের পাশে নামতে পারবে। অপরদিকে উত্তরাগামী গাড়ি বিজয় সরণি ওভারপাসের উত্তর ও দক্ষিণ লেন এবং বনানী রেলস্টেশনের সামনে থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে পারবে। এসব গাড়ি মহাখালী বাস টার্মিনাল, বনানী, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে নামতে পারবে।
এজন্য এয়ারপোর্টে দুটি, কুড়িলে তিনটি, বনানীতে চারটি, মহাখালীতে তিনটি, বিজয় সরণিতে দুটি ও ফার্মগেটে একটি র‌্যাম্পও রয়েছে। এই ১৫টি র‌্যাম্পের মধ্যে মহাখালী ও বনানী অংশে দুটি র‌্যাম্প আপাতত বন্ধ থাকবে। বাকি ১৩টি র‌্যাম্প দিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে পারবে। তবে যেসব স্থানে গাড়ি নামবে, সেসব পয়েন্টে যানজটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেসব বাহনের চলতে মানা : এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের ক্ষেত্রে মোটরচালিত প্রায় সবধরনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি মিললেও মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা যাবে না। এক্সপ্রেসওয়ে যেই দূরত্বেই চলুক না কেন, প্রত্যেক গাড়িকে সমান টোল পরিশোধ করতে হবে। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও হালকা ট্রাককে ৮০, বাস ও মিনিবাস ১৬০, মাঝারি ট্রাক ৩২০ এবং ভারী ট্রাক বা ট্রেইলরে ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে। অর্থাৎ বিজয় সরণি থেকে উঠে মহাখালী নামলেও এই হারে টোল দিতে হবে। আবার বিমানবন্দর গেলেও টোলের হার একই থাকবে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্পের প্রথম চুক্তি সই করা হয় ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি। ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি প্রকল্পের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১৫ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে সংশোধিত চুক্তি সই করে। থাইল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডের ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রকল্পটিতে। তা ছাড়া চায়নাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শোনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক গ্র্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ৩৪ শতাংশ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড ১৫ শতাংশ যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এ প্রকল্পটি। প্রকল্পের মূল দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার। আর র‌্যাম্পসহ মোট দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮৯৪০ কোটি টাকা ধরা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকায়।