❖ এখনো বিভিন্ন সড়কে রয়েছে বহু ঝুঁকিপূর্ণ সেতু
❖ চলছে ভারী যানবাহন, আতঙ্কে যাতায়াতকারীরা
❖ সর্তকীকরণ নোটিশ টাঙিয়েই দায় সারছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ
❖ ২০২১ সালের এক পরিসংখ্যানে ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডি’ ক্যাটাগরির সেতুর সংখ্যা ৭৬৫ টি
বরগুনার আমতলীতে বউভাতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে হলদিয়া ইউনিয়নে হলদিয়ার হাট ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ভেঙে বিয়ের যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস পরে কনেপক্ষের ৯ জনের মৃত্যুর হয়। গত শনিবার দুপুরে লোহার ব্রিজ ভেঙে মাইক্রোবাস ও অটোগাড়ি চাওড়া নদীতে পড়ে এঘটনা ঘটে। এলাকাবাসীর দাবি, ঠিকাদারের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এর আগে গতবছরও সেতু ভেঙে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে পৃথক দুই স্থানে। গতবছর ৮ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় বালুবাহী একটি ট্রাক নিয়ে বেইলি সেতু ভেঙে ডোবার পানিতে পড়ে। এ সময় ট্রাকটি তলিয়ে গিয়ে আহত হন চালকসহ ট্রাকের চার আরোহী। এর আগে ২২ আগস্ট সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর কাটাগাং বেইলি সেতু ভেঙে পড়ে ট্রাকের চালক ও হেলপারের মৃত্যু হয়।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েক হাজার ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালর্ভাট। এসব সেতু দীর্ঘদিনেও সংস্কার না হওয়া ভোগান্তিতে পড়ছেন যাতায়াতকারীরা। এছাড়াও অনেক সেতু দিয়ে পারপার হচ্ছে ভাড়ি যানবাহন। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ শুধুমাত্র সর্তকীকরণ নোটিশ টাঙিয়েই দায় সাড়ছে। গত শনিবারে ঘটনায়ও সেতুটিতে ছিলো সর্তকীকরণ নোটিশ। এরপরও কিভাবে ওই সেতুতে মাইক্রোবাস উঠলো তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
বিগত কয়েক বছরে দেশের মহাসড়কগুলোতে অধিকাংশ সেতু ও কালভার্ট পুনঃনির্মাণ করেছে সরকার। এছাড়াও দেশজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন কয়েক হাজার সেতু। গত ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব কালে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহামুদ আলী জানান, বিগত ১৫ বছরে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮০৭ মিটার নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া মধ্যমেয়াদি কর্ম পরিকল্পনায় আগামী তিন বছরে পল্লি সেক্টরে ৬৯ হাজার মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ এবং ১৩ হাজার মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর পরিমাণ কতটি। তা জানে না খোদ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরই। দেশে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু কতগুলো জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, সেভাবে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। নিয়মিত আমরা সেতু সংস্কারের কাজ করছি। মহসড়কগুলোতে সেভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু নেই, নতুন বা সংস্কার করা হয়েছে।
বরগুনার ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, ওই সেতুটি মাইক্রোবাস চলাচলের উপযোগি ছিলো না। তারপরও মাইক্রোবাস কিভাবে উঠলো।
জাইকার সহায়তায় সওজ দেশে সেতুর অবস্থা নিরূপণের জন্য জরিপ কার্যক্রম শুরু করে ১৯৯৯ সালের দিকে। তবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। এ সময়ে সেতু কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত এবং জরিপের জন্য পাঁচটি ম্যানুয়াল তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার জেরে জাইকার বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা বাংলাদেশ ছেড়ে যান। পরবর্তী সময়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের দিয়ে জরিপের কাজটি সম্পন্নের চেষ্টা করা হয়। তবে জনবলস্বল্পতার কারণে কাজটি আর বেশিদূর এগোয়নি। ২০২১ সালে ফের বাংলাদেশে এসে সেতু-কালভার্টের জরিপের কাজ শুরু করেন জাইকার বিশেষজ্ঞরা।
দেশের কোন সেতু কী অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে একটি সফটওয়্যার চালু করে সওজ। জাইকার সহায়তায়, আওতাধীন সেতুগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হয় ‘ব্রিজ মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা বিএমএমএস নামের এই সফটওয়্যারে। তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ১৮ হাজার ২৫৮টি সেতুর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে সংস্থাটি। ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয় এসব সেতুকে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা সেতুর সংখ্যা ১২ হাজার ৩৩১। এ সেতুগুলো ভালো অবস্থায় রয়েছে। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ২ হাজার ৩৪১টি সেতু। এগুলো সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে ‘মেজর এলিমেন্টাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে। এ ধরনের সেতুর সংখ্যা ২ হাজার ৮২১। আর ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে ‘মেজর স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে। সওজ অধিদপ্তরের নেটওয়ার্কে থাকা ‘ডি’ ক্যাটাগরির সেতুর সংখ্যা ৭৬৫।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, আমাদের দেশে উন্নয়ন কাজে বড় গলদ হলো পুরাতন প্রকল্পগুলো আছে সেগুলোর সংস্কার না করে নতুন প্রকল্পে আগ্রহ বেশি। একটা পুরাতন সেতু আরও ১০ লক্ষ টাকা খরচ করে আরও কিছু সময় চালু রাখা যেতো, সেটা না করে দুই কোটি টাকার একটা নতুন সেতু নির্মাণে হাত দেওয়া হয়। নতুন প্রকল্প আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়েই সেতুগুলো পার হন বাধ্য হয়ে। যেকোনো সময় আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

























