➤ কেউই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন নিশ্চিত করতে পারেনি
➤ বড় ধাক্কা খেল কট্টর ডানপন্থিরা, ফ্রান্সের পার্লামেন্ট হতে পারে ঝুলন্ত
➤ কট্টর ডানপন্থিদের পরাজয়ে ফ্রান্সের ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে স্বস্তি, শঙ্কাও কম নয়
ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপে এগিয়ে থাকা উগ্র ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালিকে (আরএন) দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ঠেকিয়ে দিয়েছে বামপন্থি জোট। সর্বশেষ ফলাফল অনুসারে, এই নির্বাচনে বামপন্থিদের জয়জয়কার হয়েছে। বিপরীতে প্রথম ধাপে চমক দেখানো কট্টর ডানপন্থি নেতা মেরি ল পেনের দল অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুসারে, ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপে মেরি ল পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় ধাপের ভোট ল পেনের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জোট গঠিত হওয়ার কারণে ন্যাশনাল র্যালিকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। তবে কোনো দল বা জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
ফরাসি সরকারের দেওয়া তথ্যানুসারে, দেশটির ৫৭৭ আসনের পার্লামেন্টে বামপন্থি ন্যাশনাল পপুলার ফ্রন্ট পেয়েছে ১৮৮ আসন, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উদারপন্থি দল পেয়েছে ১৬১টি আসন। আর পেরি ল পেনের ন্যাশনাল র্যালি দল পেয়েছে ১৪২টি আসন, যা বিগত ৫০ বছরের মধ্যে ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই তিন পক্ষের একসঙ্গে কাজ করারও ইতিহাস নেই। এমন অবস্থায় দেশটি এখন ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পাওয়ার পথে রয়েছে। প্রথম দফার নির্বাচনে আরএনের বিজয়ের পর বিভিন্ন জনমত জরিপে বলা হয়েছিল, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনেও দলটি বিজয়ী হবে।
প্রথম দফা ভোটের পর অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে আসা ন্যাশনাল র্যালিকে নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়েন ফ্রান্সের উদার ও মধ্যপন্থিরা। তাই আরএনকে ঠেকাতে বামপন্থিদের জোট এনপিই ও ম্যাক্রোঁর জোট টুগেদার অ্যালায়েন্সের মধ্যে আপস হয়। আরএনের বিরুদ্ধে পড়া ভোটগুলো যেন একজনই পান, সে জন্য এই দুই জোট মিলে দুই শতাধিক প্রার্থীকে ভোট থেকে সরিয়ে দেন। বাম ও মধ্যপন্থীদের এই কৌশলই কাজে দিয়েছে। আরএন নেতা জরদান বারদেলা ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, তাদের জয় ঠেকাতে ‘অস্বাভাবিক রাজনৈতিক জোট’ করা হয়েছে। ন্যাশনাল র্যালি জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হতেন বারদেলা।
এদিকে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোটে মারিন লো পেনের কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালি (আরএন) জয় পেতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে ফ্রান্সের অনেক মিত্রদেশ। তারা মনে করছে, এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি অন্তত এড়ানো গেছে। ন্যাশনাল র্যালি গতকাল রোববার নির্বাচনে সর্বোচ্চ আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তেমনটা ঘটলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম কোনো কট্টর ডানপন্থী দল ফ্রান্সে সরকার গঠনের সুযোগ পেত। তারা সরকার গঠন করলে দেশটির অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসত। ইতিমধ্যে ফ্রান্সের বেশ কিছু মিত্রদেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীদের সরকার গঠনের আশঙ্কা আপাতত এড়ানো সম্ভব হওয়ায় তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। ইউক্রেনের মিত্রদের আশঙ্কা ছিল, ফ্রান্সে লো পেনের নেতৃত্বাধীন সরকার এলে তারা মস্কোর প্রতি নমনীয় হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর থেকে ফ্রান্সসহ অন্যান্য পশ্চিমা মিত্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করে আসছে কিয়েভ। লো পেন সরকার গঠন করলে এ সহায়তা কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। যদিও সম্প্রতি তাঁর দল রাশিয়াকে ‘হুমকি’ বলে আখ্যা দেয়। ইউরোপে কট্টর ডানপন্থিদের জনপ্রিয়তায় সাময়িক ভাটা পড়েছে, আপাতত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে ন্যাশনাল র্যালির পরাজয়। এখন নতুন সরকার গঠনের কাজটি মোটেই সহজ হবে না। বরং জোট সরকার গঠন দেশটির রাজনৈতিকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কট্টর ডানপন্থিদের পরাজয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, প্যারিসে উদ্দীপনা, মস্কোয় হতাশা, কিয়েভে স্বস্তি। ওয়ারশের খুশি হওয়ার জন্য যথেষ্ট। জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসের বৈদেশিক নীতির মুখপাত্র নিলস স্কিমিড বলেন, ভয়াবহ খারাপ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অস্পষ্টতার মধ্যেই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকলেও রাজনৈতিকভাবে প্রেসিডেন্টের অবস্থান এখন দুর্বল। এর জন্য সরকার গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের দল ফ্রান্সের বাম জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টকে নির্বাচনে জেতায় অভিনন্দন জানিয়েছে। দলটির ভাষ্য, বাম জোট কট্টর ডানপন্থিদের সরকার গঠনের পথ রুখে দিয়েছে। গ্রিসের সোশ্যালিস্ট পাসোক পার্টির প্রধান নিকোস এন্ড্রুলাকিস বলেন, ফ্রান্সের জনগণ কট্টর ডান, বর্ণবাদ ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে একটি দেয়াল তুলে দিয়েছে। ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের মূলনীতি: স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সুরক্ষা করেছে।
লো পেনকে রুখে দেওয়ায় কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোও ফ্রান্সকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন অনেক যুদ্ধ আছে, যেগুলো খুব অল্প দিনের জন্যই স্থায়ী ছিল। কিন্তু এসব যুদ্ধে মানবজাতির ভাগ্য লেখা হয়েছে। ফ্রান্সও এমন একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক কর্মকর্তা একে বড় স্বস্তির বিষয় বলে উল্লেখ করেন। তবে ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মনে করছেন তিনি। উদ্বেগের আরও বড় কারণ, নির্বাচনে তিন পক্ষের কেউই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এই তিন পক্ষের একসঙ্গে কাজ করারও ইতিহাস নেই। এমন অবস্থায় দেশটি এখন ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পাওয়ার পথে রয়েছে।

























