✦ ভারত ট্রানজিট পাওয়াতে দেশটির বাংলাদেশ নির্ভরতা বাড়ছে ➺অধ্যাপক ড. সাঈদ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
✦ পুরো বিষয়টাই হচ্ছে একপক্ষীয়, ভারত এককভাবে সুবিধা পাচ্ছে ➺বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্প্রতি ভারত সফরের সময় ভারতের সঙ্গে যে কটি বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের ট্রেন চলাচল বিষয়ক সমঝোতা। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। উঠে আসছে পূর্ববর্তী ট্রানজিটগুলোর প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ছয়টি আন্তসীমান্ত রেলসংযোগ রয়েছে; কিন্তু এই রেলসংযোগ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে ভারতের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ট্রানজিট পাওয়া যাবে। এই রেল ট্রানজিটের অংশ হিসেবেই আগামী মাসের কোনো এক সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের পথ ব্যবহার করে গেদে-দর্শনা থেকে হলদিবাড়ি-চিলাহাটি ক্রসবর্ডার ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্ত একটি পণ্যবাহী ট্রেন পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। বাংলাদেশের কাছ থেকে নৌ এবং সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ট্রানজিট আগেই পেয়েছে ভারত। চট্টগ্রাম, মোংলা বন্দরে খালাস করা পণ্য আটটি নির্ধারিত সড়ক রুট ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিতে পারে ভারত। কয়েক ধরনের ফি ছাড়াও প্রতি কিলোমিটারের জন্য টনপ্রতি ১ টাকা ৮৫ পয়সা ট্যারিফ দেয় ভারত। তবে নৌ এবং সড়ক ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশে আয় উল্লেখযোগ্য নয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো ‘অভ্যন্তরীণ নৌ-ট্রানজিট ও বাণিজ্য’ প্রটোকল স্বাক্ষর হয়। এর আওতায় ভারতীয় নৌযানগুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করতে পারে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৩টি রাজ্যে নিয়মিত পণ্য পরিবহনে বহুমুখী ট্রানজিট ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালে দুদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে একই সঙ্গে নদী ও সড়কপথে বহুমুখী ট্রানজিটের মাধ্যমে ব্যবহার করে কলকাতা ও মুর্শিদাবাদকে অসম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কথা বলা হয়। ভারতের নিজ ভূখণ্ড ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ত্রিপুরা রাজ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নৌপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করে মাত্র ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আগরতলায় পণ্য পৌঁছানো যায়। এ রুটে পণ্য পরিবহনের জন্য টনপ্রতি মাসুল নির্ধারিত হয় ১৯২ টাকা। এছাড়াও নিরাপত্তা ও নৌবন্দর শিপিং মাসুলসহ প্রতি টন পণ্যে বাংলাদেশের আয় ২৭৭ টাকা।
পরবর্তীতে, ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অভ্যন্তরীণ ও তৃতীয় দেশের পণ্য পরিবহনের জন্য দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের রূপরেখা বিষয়ে এসওপি সই হয়। পরীক্ষামূলক চারটি চালানের জন্য স্ক্যানিং, নিরাপত্তা, ডকুমেন্ট প্রসেসিং মাসুল ও বিবিধ প্রশাসনিক চার্জসহ টনপ্রতি সর্বমোট মাসুল নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫৪ টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুইদেশের মধ্যে এমন আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিবেশী দশেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিটে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সাঈদ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, বিষয়টা খুব সহজভাবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিশে^র যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে তাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সংযোগ বাড়াতে হবে। দেশের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য আন্তঃদেশীয় সংযোগ বাড়ানো দরকার। এটা বিশে^ একটি পরিচিত বিষয়। ভারত ট্রানজিট পাওয়াতে তাদের আমাদের প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে। এছাড়াও এটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। একদিনে লাভের অঙ্ক হিসাব করা যাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কি দিচ্ছে বা কি পাচ্ছি আমরা জানতে পারছি না। সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবে। আমরা দিচ্ছি কিন্তু তিস্তার পানি পাচ্ছি না, সীমান্তে হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। ট্রানজিট দেওয়ার সময় বলা হয়, বাংলাদেশ মশুল পাবে, অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবো। কিন্তু কিছ্ইু হচ্ছে না। উল্টো সীমান্ত হত্যা চলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত আমাদের পক্ষ নিচ্ছে না। পুরো বিষয়টায় হচ্ছে একপক্ষীয়, ভারত এককভাবে সুবিধা পাচ্ছে।













