✦গুলি বন্ধ বিষয়ে রিটের রায় আজ
✦ শিক্ষার্থী হত্যায় উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ ও ইইউ:
✦ পরিস্থিতির স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র
দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, যে কোনো মৃত্যু আমাদের সবার জন্যই দুঃখজনক। আমার কোর্টে ইমোশনাল বিষয় অ্যাড্রেস করবো না। আমরা খুব লজ্জিত। হাইকোর্টের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি শেষে আজ বুধবার আবারও শুনানি ও আদেশের জন্য দিন রেখেছেন হাইকোর্ট। এদিন আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও আইনজীবী ব্যারিস্টার অনীক আর হক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম মুনীর, শেখ মোহাম্মদ (এসকে) মোরশেদ ও মোহাম্মদ মেহেদী হাছান চৌধুরী। এছাড়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, নুরুল ইসলাম সুজন, আজহার উল্লাহ ভূইয়া ও শাহ মঞ্জুরুল হক শুনানিতে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা ও কোটাবিরোধী আন্দোলনের ৬ জন সমন্বয়কের ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তির নির্দেশনা চেয়ে এ রিট করা হয়। রিটের শুনানিতে আদালত বলেন, সংবিধান ও আইনে সব বিষয় লেখা আছে। কিন্তু আমরা কেউ সংবিধান, আইন মেনে চলছি না। এসময় আইনজীবী অনীক আর হক নারায়ণগঞ্জে গুলিতে বাসার ছাদে ছয় বছরের শিশু রিয়ার মৃত্যু নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরেন। পরে একপর্যায়ে আদালত বলেন, এসব মৃত্যুই আমাদের সবার জন্যই দুঃখজনক।
অনীক আর হক বলেন, সঠিক। একটা জীবন যখন চলে যায়, তখন কোনো পক্ষ থাকে না। ছয় বছরের শিশু…। এ সময় আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, আমার কোর্টে ইমোশনাল বিষয় অ্যাড্রেস করবো না। আমরা খুব লজ্জিত।
এর আগে গত ২৯ জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি না করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের ওপর আদেশের জন্য গতকাল দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট। ওইদিন আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জহিরুল হক (জেড আই) খান পান্না, ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং ব্যারিস্টার অনীক আর হক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ (এসকে) মোরশেদ ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মেহেদী হাছান। শুনানিতে তাদের সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজাহার উল্লাহ ভুঁইয়া শুনানিতে অংশ নেন। এরপর আদালত এ বিষয়ে আদেশের জন্য গতকাল দিন ঠিক করেছিলেন। এর আগে গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজুর-আল-মতিন এবং আইনুন্নাহার সিদ্দিকা এ রিট করেন। রিটে আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়। এতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি তাজা গুলির ব্যবহার কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং তাজা গুলি ব্যবহার না করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তথাকথিত নিরাপত্তার নামে হেফাজতে নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দ্রুত মুক্তি দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রিটে সে মর্মেও রুল চাওয়া হয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতায় উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ-ইইউ, পরিস্থিতির স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র: বাংলাদেশের চলমান কোটা আন্দোলন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলেছে। তারা আলাদা আলাদা বিবৃতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন বাংলাদেশে চলমান ছাত্র আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন তারা।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরুতে তিনি বাংলাদেশে চলামান ছাত্র আন্দোলনে সব রকম সহিংসতার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং পক্ষপাতিত্বহীন তদন্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এর জন্য যারা দায়ী তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি জানান, নতুন করে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার বিষয়ে তিনি অবহিত এবং শান্তি ও সংযমের জন্য তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ডুজাররিক আরও জানান, বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজারো তরুণ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের গণগ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘের চিহ্ন সম্বলিত সামরিক যানের বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশের ভেতরে জাতিসংঘের চিহ্ন সম্বলিত কোনো যানবাহন আর ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি আমরা পেয়েছি। আমরা এটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এবং আবারও বলতে চাই যে, জাতিসংঘে সেনা ও পুলিশ দিয়ে অবদান রাখা দেশগুলো শুধু তখনই জাতিসংঘ চিহ্নিত এবং জাতিসংঘের চিহ্ন সম্বলিত সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে, যখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের অধীনে তাদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে কোনো ম্যান্ডেটেড কাজ দেওয়া হয়।
এদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের ‘শ্যুট অন সাইট নীতি’ এবং বেআইনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গতকাল মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।
এদিকে, কোটা আন্দোলন ঘিরে অস্থিরতার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। দৈনিক ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখ্য উপ-মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমরা আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছি। এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের অবিচল অবস্থান আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।
ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থার ‘কিছুটা পুনস্থাপনের’ বিষয় অবগত থাকার কথা তুলে ধরে বেদান্ত প্যাটেল বলেন, আমরা ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের পূর্ণ এবং বাধাহীন প্রবেশাধিকারের আহ্বান জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ, পাশাপাশি আমাদের আমেরিকান নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে প্রবেশাধিকার পাবেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রবাসী বাংলাদেশি ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও মানববন্ধন করেছেন। আন্দোলনে হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য লয়েড ডগেটসহ অনেকে।
















