◉ বাড়ছে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ
◉ শৃঙ্খলায় ফিরছে ব্যাংকিং খাত
◉ পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকারের টাস্কফোর্স গঠন
◉ নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ
বিগত সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বিপর্যয় অবস্থায় ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে অর্থনীতি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয়করণের বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে ব্যাংকিং খাতে। ব্যাংকগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে ছিল যে, সাধারণ গ্রাহকরা আমানত হারানোর শঙ্কায় ছিল। এরই মধ্যে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাদের সময়ের গঠিত বেশকিছু ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন করে সতন্ত্র পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বেশিকিছু পণ্যের শুল্ক কমানো ও দেশ থেকে প্রচারকৃত অর্থ ফেরাতে সরকার নতুন ফোর্স গঠন করেছেন। পাশাপাশি গতি বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহে, এতে বাড়ছে দেশের রিজার্ভ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুশাসন ও খেলাপি ঋণই বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা। ব্যাংক খাতে সুশাসন না থাকার কারণে দিনদিন খেলাপি বাড়ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় ঢালাওভাবে ছাড় না দিয়ে পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
দেশের প্রকৃত রিজার্ভের বিষয়ে বাংলাশে ব্যাংকের গর্ভনর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ২০ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ডেফিনেশন অনুযায়ী। গত এক সপ্তাহে ৩০০ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বেড়েছে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ডলারও বাজারে বিক্রি করেনি আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর; বরং প্রতিনিয়ত আমরা ডলার কিনছি রিজার্ভ বাড়াতে। এখন প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন ডলার করে বাজার থেকে কেনা হচ্ছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে রেমিট্যান্সের গতি বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ২২২ কোটি মার্কিন ডলার (২ দশমিক ২২ বিলিয়ন)। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে) ২৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে প্রবাসী আয় এসেছে ২২২ কোটি ১৩ লাখ ডলার। একক মাস হিসাবে আগস্টে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৬২ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৯ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৬০ কোটি ডলার। এছাড়া প্রবাসী আয় আগের মাসের চেয়ে ৩০ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার বেশি এসেছে। গত জুলাই মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার; যা আগের ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী ৫ মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে নিয়ে আসব। পরবর্তী সময়ে এক বছরের মধ্যে সেটা ৪ থেকে ৫ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে।
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের হাত ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার শুরু হয়েছে। এতে সুফলের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের আমানত, ঋণ, লেনদেন ও বিদেশি বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে এস আলমের কব্জা থেকে মুক্ত করা হয় বহুল আলোচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে, যে ব্যাংক একসময় ঋণ ও আমানতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের স্বীকৃতি পেয়েও অনিয়ম ও কেলেঙ্কারিতে নাজুক দশায় পৌঁছে। এসব ব্যাংকে দুর্নীতি কমাতে পাঁচ সদস্যের ছোট পর্ষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০ আগস্ট থেকে মোট আট ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলো হলো ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসালামী ব্যাংক, ইউসিবি, এক্সিম ব্যাংক, এফএসআইবিএল। পর্ষদ পুনর্গঠন হতে পারে- এমন তালিকায় রয়েছে আরো পাঁচ ব্যাংক। এগুলোর মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অন্যতম। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ে অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু দৃশ্যমান হয়েছে। যেমন খেলাপি ঋণের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের পর্ষদগুলোও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। আর তারল্য সমস্যা সমাধান করেছেন গভর্নর। পাচারের অর্থ ফেরত আনতে টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সোয়া চার লাখ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ কতটা সফল, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে বিএফআইইউর সক্ষমতার ওপর। বিএফআইইউকে শক্তিশালী করার জন্য ইউনিটটিকে আরও ক্ষমতা দিতে হবে, নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে এবং সময়ে-সময়ে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে গোপনীয়তা রক্ষা করে জনগণকে তথ্য জানাতে হবে।


























