- প্রশ্নবিদ্ধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
- পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার
- ৯ কলেজ, সমন্বয়কদের ডাকেও সাড়া নেই
- সপ্তাহব্যাপী ছাত্র সংহতি পালন করবে সংগঠনগুলো
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর কলেজগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়েছে চরম পর্যায়ে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষ, প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনায় সংকট ঘনিভূত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্বগ্রহণের পর থেকেই নানামহলের দাবি চাপে পড়তে হচ্ছে বিপ্লবত্তোর সরকারকে। দাবির এসব চাপ প্রতিনিয়ত সড়ক পর্যন্ত গড়াচ্ছে। ফলে প্রায়দিনই কেউ না কেউ সড়ক অবরোধ করছেন। তবে চলতি মাসে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সড়ক অবরোধ ও সংখ্যালঘু ইস্যু ছাড়াও ইউনূস সরকারের জন্য বড় চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা। ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজ, ডা. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ ৩৭ কলেজ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইল (বুটেক্স) ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পথচারীসহ আহত হয়েছেন অনেক। এমনকি এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েও হামলার ঘটনার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল যৎসামান্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা না থাকায়।
সবশেষ ডিএমআরসি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিতের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত রোববার পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এলাকায় কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় রাজধানীর ৩৫টি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ৩৫ কলেজের শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এছাড়াও ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ও নজরুল কলেজেও ভাঙচুর চালায় তারা। এছাড়াও সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল এন্ড কলেজে হামলা ভাঙচুর চালায়। ৩৫ কলেজের শিক্ষার্থীরা এইদিন সুপার সানডে হিসেবে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছিল। পরদিন সোমবার সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়ে যাত্রাবার্ড়-ডেমরা এলাকায় ডিএমআরসি কলেজে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এঘটনাকে কেন্দ্র করে ৭ কলেজ, ডিএমআরসি ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় যাত্রাবড়ী এলাকা। এদিন ৭ কলেজ শিক্ষার্থীরা মেগা মানডে হিসেবে প্রচারণা চালিয়েছিল।
তবে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কলেজগুলোর কর্তৃপক্ষ। ডিএমআরসি অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন বলেন, হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখেনি। তিনি বলেন, সকাল থেকেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু হামলার সময় তারা দূরে থেকে পরিস্থিতি দেখেছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
আর সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাকলী মুখোপাধ্যায় বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পুতুলের মতো। আমরা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমাদের ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই টাকা দিয়েও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠা যাবে না। ডকুমেন্টস যেগুলো নষ্ট হয়েছে টাকার মূল্যে নিরূপণ হবে না।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, শত চেষ্টা ও বসে সমাধান করার আহ্বান জানানোর পরও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়ানো থেকে আটকানো গেলো না। শিক্ষার্থীদের অ্যাগ্রেসিভনেস ও প্রস্তুতি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও স্ট্রিক্ট অ্যাকশনে যায়নি। কোনো প্রকার অ্যাকশনে গেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তপাত হতো। সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। একত্রে দেশ গড়ার সময়ে সংঘর্ষের মতো নিন্দনীয় কাজে জড়ানো দুঃখজনক। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে সররকারকে। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের সংঘাতের পেছনে কোনও ধরনের ইন্ধন থাকলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্ধ ঘোষাণা করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দীসহ ৭ কলেজকে। এছাড়াও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সেন্ট গ্রেগরি ও ডিএমআরসি। এরআগে সোমবার রাতে সংঘর্ষে জড়ানো ৩ কলেজের শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। তবে বৈঠকে সাড়া দেয়নি কলেজগুলো।
এর আগে সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসে সমন্বয়করা। বৈঠক শেষে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন ঠেকাতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলমান অস্থিরতা নিরসনের লক্ষ্যে আগামী এক সপ্তাহব্যাপী ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘ছাত্র সংহতি সপ্তাহ’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এদিন দেশব্যাপী চলমান আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব নিরসনের লক্ষ্যে ১৯টি ছাত্র সংগঠনের নেতারা ওই বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন। সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসুদ, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের (নুর) সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের (রেজা কিবরিয়া) আহ্বায়ক মোল্লা রহমাতুল্লাহ, ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কাউসার আহমাদ, স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দিন মুহাম্মদ খালিদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিশের সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মশিউর রহমান রিচার্ড, ইনকিলাব মঞ্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ফাতিমা তাসনিম জুমা, কওমী ছাত্র ফোরামের নুর হোসাইন, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদে আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াহেদ, জাতীয় ছাত্র সমাজের (জাফর) মো. মেহেদি হাচান, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিশের সেক্রেটারি আশিকুর রহমান জাকারিয়া, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল মুনতাসির মাহমুদ, জাতীয় ছাত্র সমাজের (পার্থ) সাইফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


























