ফেনী সরকারি কলেজের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে রেখেছে একটি সিন্ডিকেট দুষ্টচক্র। বেআইনীভাবে স্থাপনা নির্মাণ করে উক্ত জায়গা থেকে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছে ওই চক্র। এই কলেজ কর্তপক্ষ উদাসীন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজ কর্তৃপক্ষ বারবার চেষ্টা করেও ওই জায়গা পুনরুদ্ধার করতে পারছেনা। যুগ যুগ ধরে বেহাত এসব জায়গা উদ্ধারে এবার মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন বর্তমান অধ্যক্ষ সহ সংশ্লিষ্ট ভূমি কমিটিতে থাকা শিক্ষকগণ।
দীর্ঘদিন ঝুপড়ি ঘর আর টিনের ছাউনি থাকলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শহরের জনগুরুত্বপূর্ণ সদর হাসপাতালের পাশেই ইটের গাঁথুনি দিয়ে স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। এনিয়ে উভয়পক্ষকে সাময়িক স্থিতাবস্থা রক্ষার আদেশ দেয়া হলেও আদালতের নিষেধজ্ঞা অমান্য করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি শহরের৷ সদর হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে কলেজের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করেন একটি চক্র। কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণ কাজে বাধা দেয়।
একপর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে শহরের বারাহিপুর এলাকার এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া ও ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর এলাকার বাসিন্দা মনির আহাম্মদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ দেয়া হয়। আদালত গত ২ ফেব্রুয়ারি স্থিতাবস্তার আদেশ দিয়ে সরেজমিন তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন জমা দিতে সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) কে নির্দেশ দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর হাসপাতালের ফটকের পাশে রয়েছে বিসমিল্লাহ মেডিসিন এন্ড সার্জারি শপ। তার পাশে কালো প্লাস্টিক টাঙিয়ে পেছনে নির্মাণ করা হচ্ছে ইটের গাঁথুনি দিয়ে পাকা দোকান ঘর। কয়েকজন শ্রমিক নির্মাণ কাজে ব্যস্ত। দিনে-রাতে সমানতালে নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। দোকানঘর নির্মাণ করছেন সৈয়দনগর এলাকার বাসিন্দা সাহাব উদ্দিন। তাছাড়া আগেথেকেই রয়েছে ছোট-বড় পাকা-আধাপাকা স্থাপনার বেশ কয়েকটি দোকানঘর। এসব দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
কলেজ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১৬৪১শতক ভূমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার ১৯৬২ সালের ২১ জুলাই ফেনী সরকারি কলেজকে হস্তান্তর করে। ১৯৭৯ সালের ১২ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ৮৪২৭নং দলিলে দান করা হয়।
এর প্রেক্ষিতে হাসপাতাল মোড়ের পাশে রয়েছে সি.এস ৮১ খতিয়ানের সাবেক ৪০ দাগের ২৫শতক জায়গা। দীর্ঘদিন ওই জায়গা স্থানীয় একটি চক্র দখলে নেয়। ভূয়া কাগজ তৈরি করে বিভিন্ন সময় বেচাকেনার নামে হাতবদল হয়। ইতিপূর্বে ওই জায়গার উপর পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের কতিপয় নেতাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও দখলদার ও কতিপয় নেতারা বিরোধে জড়ানোয় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
কলেজ সূত্র জানায়, রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নুরুল আজিম ভূঞার নেতৃত্বে ভূমি রক্ষায় একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিতে শিক্ষক পরিষদ সম্পাদক ও সমাজকর্মের সহযোগি অধ্যাপক ফরিদ আলম ভূঞা, গনিতের সহযোগি অধ্যাপক জহির উদ্দিন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন, একই বিভাগের শিক্ষক মামুনুর রশিদ রয়েছেন।
কমিটির সদস্যরা জানান, কলেজের ১৬৪১ শতক জায়গা উদ্ধারে বারবার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের সহযোগিতায় বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার বেহাত হওয়া জায়গা উদ্ধারে সক্রিয় রয়েছেন।
হাসপাতাল মোড়ের দখল হওয়া ২৫ শতক সহ কলেজের জায়গায় অবৈধভাবে নির্মিত দোকানঘরের সম্পত্তি বুঝে পেতে চান অধ্যক্ষ। সম্পদের মালিকানার যাবতীয় কাগজপত্র কলেজের পক্ষে থাকলেও দুষ্টচক্র ভূয়া কাগজপত্র সৃজন করে নাজোহাল করেন। অতীতেও তারা ভূয়া কাগজ দিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করতে আদালতে সময় চেয়ে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে। যার ফলে কলেজের অধ্যক্ষ সহ শিক্ষকরা হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এবার কোনমতে সেই সুযোগ পাবেনা। বরং দখলদারদের কেউ অসাধু প্রক্রিয়ায় পুনরায় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করলে দখলের পুরো সময়ের জায়গার ভাড়া পরিশোধে বাধ্য করা হবে বলেও একাধিক সদস্য হুঁশিয়ারী দেন।
দোকানঘর নির্মাণকারী সাহাব উদ্দিনের দাবী, “কাগজপত্রের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন জায়গাটি তার দখলে রয়েছে। ওই সূত্রে সেখানে দোকান পুননির্মাণ করা হচ্ছে।”
সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) সজীব তালুকদার জানান, “স্থিতিবস্তা আদেশের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। দ্রুতসময়ের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
ফেনী মডেল থানার ওসি মর্ম সিংহ জানান, “আদালতের আদেশের কপি পাইনি। আদালতের আদেশের পরও নির্মাণ কাজ চলার বিষয়টি জানা নেই। এ ধরনের কোন বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছু জানায় নি। খোঁজখবর নিয়ে আইনগত প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার জানান, “শতবর্ষী প্রাচীন এ কলেজের সম্পত্তি রক্ষায় আদালত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাগজপত্র অনুযায়ী হাসপাতাল মোড়ের বিশাল অংশে কলেজের সম্পত্তি রয়েছে। শুনেছি, দখলদাররা ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে। শুধু ২৫ শতক নয়, শিগগিরই ১৬৪১শতক জায়গা বুঝে নেয়া হবে।”
তিনি আরো জানান, “ইতিমধ্যে দুইবার ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বাধা দেয়া হয়েছে। তারা বাধা অমান্য করে কলেজের জায়গা জোরপূর্বক দখল করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।”





















