গতকাল ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। এই সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে একটি মাইলফলক হতে পারে। পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতার আলোকে এই সম্মেলনের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
পরিসংখ্যানের আলোকে রোহিঙ্গা সংকট
১. শরণার্থীর সংখ্যা: বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে, যাদের মধ্যে ৭৪% নারী ও শিশু। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের পর প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
২. মানবিক সহায়তা: ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের আবেদনকৃত তহবিলের মাত্র ৪৯% পূরণ হয়েছে, যা প্রায় ৮৭৬ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থের অভাবে শরণার্থীদের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।
৩. প্রত্যাবাসন: ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য গৃহীত উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মাত্র ১,০০০ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
৪. স্থানীয় সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব: কক্সবাজারের স্থানীয় সম্প্রদায়ের ৮০% মানুষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ অনুভব করছে।
সম্মেলনের সম্ভাবনা
ড. ইউনুসের আন্তর্জাতিক সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে নিম্নলিখিত সম্ভাবনার দিক উন্মোচন করতে পারে:
প্রথমত, এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা, কূটনীতিক এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পাবে। এটি মিয়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করতে পারে এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার পথ সুগম করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের অর্ধেকেরও কম পাওয়া যাচ্ছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব। এটি শরণার্থীদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করবে।
তৃতীয়ত, মিয়ানমারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা এই সম্মেলনের একটি প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত চাপে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হতে পারে।
চতুর্থত, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি স্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলনে স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের উদ্বেগ ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা যেতে পারে। এতে করে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হবে।
পঞ্চমত, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এতে করে রোহিঙ্গারা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
তবে পাশাপাশি ড. ইউনুসের সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে; নাগরিক সমাজে এই প্রত্যাশাও প্রগাঢ় হচ্ছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি শুধু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যই নয়, বাংলাদেশ এবং পুরো বিশ্বের জন্য একটি মানবিক বিজয়ের সূচনা করতে পারে।
সেইসাথে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট। ড. ইউনুসের আন্তর্জাতিক সম্মেলন এই সংকটের সমাধানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। এই সম্মেলন শুধু একটি আলোচনার মঞ্চ নয়, এটি একটি আশার আলো, যা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।





















